logo
  • ঢাকা শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

মুহাম্মদ আলীর জন্মদিনে বাংলার মুহাম্মদ আলীর স্মৃতিচারণ

‘সাংবাদিকদের ছবি তুলতে বাধা দিচ্ছিলেন আলী, তাই ভয় পেয়েছিলাম’

muhammad ali bangladesh, abdul halim boxer, rtv online
মুহাম্মদ আলীর সঙ্গে আব্দুল হালিম

বাংলাদেশে ক্রীড়া বিশ্বের অনেক নক্ষত্রের আগমন ঘটেছে। ইমরান খান-শচিন টেন্ডুলকাদেরতো ঘরের সন্তানই মনে করা হয়। ক্রিকেটের অসংখ্য তারকা এসে খেলেছেন। ফুটবল বিশ্বের তারকাদের তারকা জিনেদিন জিদান, লিওনেল মেসি থেকে জুলিও সিজারদেরও কাছ থেকে দেখেছে ক্রীড়া প্রেমীরা। চার দশক আগে ঢাকা মাতিয়েছিলেন দ্য গ্রেটেস্ট মুহাম্মদ আলী। স্মৃতিচারণের অবশ্য বিশেষ কারণ রয়েছে। ১৭ জানুয়ারি আলীর ৭৯তম জন্মদিন। ১৯৪২ সালের এই দিনে জন্ম নেন তিনি। ২০১৬ সালের ৩ জুন অ্যারিজনার একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তার।

১৯৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামের (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) চারপাশটা ছিল উৎসব মুখর। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে উপস্থিত হচ্ছিলেন অনেকেই। সেখানেই দেখা দুই মুহাম্মদ আলীর। একজনের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকিতে। অপরজন জন্মেছিলেন পুরান ঢাকায়।

সর্বকালের সেরা বক্সার আলীর সঙ্গে আব্দুল হালিমের নাম যোগ করার প্রধান কারণ ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক পদকটি এসেছিল এই বক্সারের হাত ধরেই। ১৯৭৭ সালে জাকার্তা এশিয়ান অ্যামেচার বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ব্রোঞ্জ জিতে ফিরেছিলেন মাতৃভূমিতে। জাতীয় পতাকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম উত্তোলন করার নায়ক ছিলেন তিনিই।

কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা তথা বক্সারের সঙ্গে ঢাকা স্টেডিয়ামে তোলা একটি ছবি নিয়ে গল্প শুনিয়েছেন বাংলার মুহাম্মদ আলী খ্যাত আব্দুল হালিম।

আরটিভি নিউজ: কেমন ছিল আপনার ছোটবেলা?

আব্দুল হালিম: আমার জন্ম নয়া বাজারের একটি ঢাকাইয়া পরিবারে। ফরিদাবাদে বেড়ে ওঠা। যুদ্ধের সময় আমিও মরে যেতে পারতাম। আমি চেষ্টা করেছি অবদান রাখার জন্য। আল্লাহ আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। স্বাধীন দেশ উপহার পেয়েছি। সুযোগ ছিল দেশের জন্য কিছু করার। দেশের হয়ে প্রথম পদক নিয়ে ফিরেছিলাম।’

মুহাম্মদ আলী আগমনের পোস্টার

আরটিভি নিউজ: বক্সিংয়ের শুরুটা হলো কীভাবে?

আব্দুল হালিম: বাবা ছোট বয়সে কলকাতা চলে যান। এক সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে শরীর চর্চা করতেন। শুনেছি তিনি নাকি সেখানে কুস্তিও (রেসলিং) করতেন। ১৯৬৭-১৯৬৮ সালের দিকে আমি তখন কিশোর। বাবা নিয়ে গেলেন কায়দে আজম ফিজিকাল ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে, পরে এর নাম রাখা হয় নবযুগ। বাবার ইচ্ছা ছিল রেসলিং করবো। তখন যুগ ছিল ক্যাসিয়াস ক্লের, যিনি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে মুহাম্মদ আলী হিসেবে পুরো বিশ্বের কাছে নিজেকে পরিচিত করিয়েছিলেন। আমি ছিলাম তার সবচেয়ে বড় ভক্ত। তাইতো বাবাকে বললাম বক্সিং করতে চাই। প্রথমে বাবা রাগ করলেও পরে আমাকে স্বাধীনতা দেন।’

আরটিভি নিউজ: বক্সিংয়ের গুরু কে ছিলেন?

আব্দুল হালিম: আমার জীবনে প্রথম ও শেষ কোচ ছিলেন পিতৃতুল্য এমএ মতিন। অনেকের কাছ থেকে পরামর্শ পেয়েছি। তবে তার জন্যই আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলাম।

বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদক গ্রহণ করছেন আব্দুল হালিম

আরটিভি নিউজ: প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আব্দুল হালিম: ১৯৭৭ সালের মার্চে থাইল্যান্ড কিংস কাপে অংশ নিয়েছিলাম। যা ছিল আমার প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। আমার উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ১ ইঞ্চি। সাধারণত বক্সাররা অনেক লম্বা হয়। আমি ফ্লাইওয়েটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম। দেশেতো অনেককে নক-আউট করেছি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গিয়ে ভুল বুঝতে পারলাম। ওই টুর্নামেন্টে উগান্ডার কোচ ছিলেন। তার কাছ থেকে পরামর্শ পেলাম। বুঝলাম ফ্লাইওয়েট নয় আমার লড়তে হবে লাইট ফ্লাইওয়েটে।

বক্সার হালিমের পদক ও ম্যাগাজিনের কাভারে তার ছবি

আরটিভি নিউজ: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম আন্তর্জাতিক পদক এসেছিল আপনার হাত ধরেই। কেমন ছিল তখনকার পরিস্থিতি

আব্দুল হালিম: দেশে এসে তৎকালীন কর্মকর্তাদের বোঝাতে কষ্ট হয়। ক্যাটাগরি পরিবর্তন করায় তারা আমার উপর ভরসা রাখতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সক্ষম হলাম। একই বছর অক্টোবরে যাত্রা শুরু করলাম বক্সিংয়ে এশিয়ার সর্বোচ্চ আসরে। রপ্ত করেছিলাম প্রিয় তারকা আলীর স্টাইল। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে দেই। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল ইন্দোনেশিয়া। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত স্বাগতিকদের পক্ষে যায়। মাত্র ১ পয়েন্টের জন্য ফাইনালে পৌঁছতে পারিনি। ফলে ব্রোঞ্জ নিয়েই ফিরতে হয় দেশে।

বাংলাদেশের পতাকা হাতে মুহাম্মদ আলী

আরটিভি নিউজ :মুহাম্মদ আলীকে কাছ থেকে দেখার অনুভূতি কেমন ছিল?

আব্দুল হালিম: দেশে আমি তখন অনেক বড় তারকা। পরের বছর পাঁচ দিনের সফরে এলেন মুহাম্মদ আলী। প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করতে সেভেন স্টার গ্রুপের পক্ষ থেকে নিয়ে আসা হলো তাকে। ঢাকায় পা রাখার দিন কয়েক আগেই লিয়ন স্পিংকসের কাছে ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপের টাইটেল হারান আলী। তাই গুঞ্জন ছিল ঢাকায় আসবেন না তিনি। তবে আলী এসেছিলেন।

তখন সাপ্তাহিক বন্ধ ছিল রোববার। সেই অনুযায়ী ইভেন্ট রাখা হয়েছিল রোববার দিন। আমি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হলেও সামনে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। চারিদিকে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। আমাকে স্টেজের সামনে আসতে বলছিলেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। তারাই আমাকে উপড়ে উঠিয়ে দিলেন। তবে আমাকে বাধা দেয়া হলো নিরাপত্তাকর্মীদের পক্ষ থেকে। তবে সাংবাদিকরাই তাদের কাছে প্রতিবাদ করলেন।

আব্দুল হালিমের সাম্প্রতিক ছবি

আরটিভি নিউজ: মুহাম্মদ আলীর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সেই মুহূর্তটি জানতে চাই?

আব্দুল হালিম: স্টেজে ওঠার পর সাংবাদিকরা তাকে বলছিলেন আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য। তাকে বললাম, আমি একজন বক্সার। হঠাৎ করে রেগে গেলেন। সাংবাদিকদের ছবি না তুলতে ইশারা করছিলেন। আমিও পরিস্থিতি বুঝে উঠছিলাম না। এমন কি ভুল করলাম আমি। অনেকটা ভয় পেয়ে গেলাম। আমার গলা ধরে মুখে ঘুষি মারার ভঙিতে ছবি তুলতে পোজ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ছবি তোলা হলো।

বিশ্বের নানা প্রান্তে অনেকেই আলীর সঙ্গে ছবি তুলেছেন। তবে আমার সঙ্গে বক্সার আলীর ছবি আছে। আমার ওই ছবিটা তোলা হয়েছিল যখন তিনি একজন তারকা বক্সার হিসেবেই ঢাকায় এসেছিলেন।

আরটিভি নিউজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ব্লু, বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির (বিএসপিএ) বর্ষসেরা পুরস্কার, ২০০৪ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন। বিশেষ প্রাপ্তি কোনটি?

আব্দুল হালিম: প্রতিটি পুরস্কার আমার জন্য বিশেষ। এশিয়ান পর্যায়ে পদক অর্জন করার পর আইডলের কাছাকাছি যেতে পেরেছি। প্রচুর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এগুলো সব কিছুই জীবনের সেরা প্রাপ্তি। আমার সন্তানরা আমাকে বক্সিং করতে দেখেনি। কারণ তখন কোনও ভিডিও করা হতো না। কিছু ছবি আছে আমার কাছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বিশেষ ছবিটি তুলেছিলেন ফটোসাংবাদিক শামসুল ইসলাম আলমাজী।

আরটিভি নিউজ: মুহাম্মদ আলীর জন্মদিনে আপনার বার্তা

আব্দুল হালিম: ‘রোম সাম্রাজ্যে রাজারা বিনোদনের জন্য বন্দিদের আমৃত্যু লড়াই দেখতেন। কালের বিবর্তনে তার নাম হয় বক্সিং। এই বক্সিংকে এক নান্দনিক খেলা হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন একজন। পরিচয় করিয়ে দেন ছন্দে, শিল্পে, নৈপুণ্যে ও গতিতে। বক্সিংকে মানুষের মনে স্থান করে দেয়ার জাদুকর হলেন মুহাম্মদ আলী- যাকে সবাই আলী নামে চেনেন। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুষ্টিযোদ্ধার মুকুট নিজের করে নিয়েছেন। বিশ্ব অলিম্পিক তাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ হিসেবে। আজ এই গ্রেটের জন্মদিনে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা এবং জন্মদিন শুভেচ্ছা।’

ওয়াই/পি

RTV Drama
RTVPLUS