logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৭

শরীয়তপুরের অধিকাংশ ইটভাটা লোকালয়ে (ভিডিও)

মো. ইব্রাহীম হোসাইন, শরীয়তপুর
|  ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:৪৬ | আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৫
শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলায় ৬০টি ইটভাটা থাকলেও এর মধ্যে ৩০ ভাগ রয়েছে চূড়ান্ত অনুমোদন বিহীন। আর অধিকাংশ ইটভাটাই পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম না মেনে লোকালয়ের ১০০ মিটার থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়সহ হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। 

জানা যায়, শরীয়তপুরে ৫৯টি ইটভাটার মধ্যে শরীয়তপুর সদরে ২১টি, নড়িয়ায় ১০টি, জাজিরায় ১২টি, ভেদরগঞ্জে ৬টি, ডামুড্যায় ৩টি ও গোসাইরহাটে ৭টি। 

ইটভাটায় জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের ফলে জমি হারাচ্ছে তার উর্বরা শক্তি। যার প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষাসহ পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।

এদিকে ইট পোড়ানোর ভরা মৌসুমে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমে যায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। ভাটার কালো ধোয়ায় শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধরাই বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন হাঁপানি, এলার্জি, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন রোগে।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের চর কোটাপাড়া এলাকার মোহাম্মদ ব্রিক ফিল্ডে সরজমিনে গিয়ে দেখায় যায়, লোকালয় থেকে সর্বোচ্চ ১০০ মিটারের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে এটি। এছাড়া ইটভাটাটির ৫০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে ৩ নম্বর চর কোটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। চরম হুমকির মুখে রয়েছে এসব শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য। তাছাড়া ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে প্রায় দশটি পানের বরজ, ধান ক্ষেতসহ ফসলি জমি এবং বাড়ি-ঘর।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রহিমা খাতুন বলেন, ‘কিছুদিন আগে এই ভাটা নির্মাণের সময় স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে নেয়া হয়েছে ইট বালুসহ বিভিন্ন মালামাল। তখন ধুলায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, স্কুলে ক্লাস করাতো দূরে থাক, সেখানে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে গিয়েছিল। সারাদিন বিদ্যালয়ের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়েছে। অনেক বলেও কোনও সমাধান পাইনি। 
সামনে আবার এই রাস্তা দিয়ে শুরু হবে ইট ও মাটি নেয়া আনা। তখন কিভাবে ক্লাস করব সেই চিন্তায় দিন কাটছে আমাদের’। 

চর কোটাপাড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানায়, তাদের বাড়ি থেকে অল্পকিছু দূরেই একটি ইটভাটা। এই ভাটার ধোঁয়ার কারণে বাড়ির আম, জাম ও নারকেল গাছসহ সব ধরনের ফলের গাছে ফল ধরা কমে গেছে। 

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ইটভাটার অনুমোদন পাওয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর তদন্ত পূর্বক ছাড়পত্র প্রদান করে। এর পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইটভাটা চালু করার সনদ প্রদান করা হয়। পরিবেশ আইন অনুযায়ী জনবসতি এলাকায় কোনও ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

জনবসতি এলাকায় ইটভাটা 
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার লাউখোলা বাজারের পাশে ফসলি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৬টি ইটভাটা করা হয়েছে। ইটভাটা গুলো হলো- পদ্মা ব্রিক ফিল্ড, যমুনা ব্রিক ফিল্ড, বিসমিল্লাহ ম্যানুফ্যাকচারিং, এবিকে ব্রিক, বিবিটি ব্রিক, জেবিএম ব্রিক ও সম্পূর্ণ অনুমোদন বিহীন নতুন ভাটা ভাণ্ডারী ব্রিক্স বা ভিবিএম। 

সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের ২০০ মিটার জায়গার মধ্যে ৩টি ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটা ৩টি হলো, এলআরবি ব্রিক, এমকেএম ব্রিক ও আরবিএম ব্রিক। রুদ্রকর নীল মনি উচ্চ বিদ্যালয়, রুদ্রকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালার বাজার সংলগ্ন মাত্র ২০০ গজ স্থানের মধ্যে এই ইটভাটা গুলো স্থাপন করা হয়েছে। 

রুদ্রকর নীলমনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা জলিলুর রহমান বলেন, জনবসতি এলাকায় ইটভাটা করার অনুমতি স্থানীয় প্রশাসন কিভাবে দিয়েছে আমাদের বোধগম্য নয়। ইটভাটার কারণে বিদ্যালয় ও বাজারের সমস্যা হচ্ছে। 

ইটভাটা মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মোস্তফা বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে ইটভাটা স্থাপন করা হয়। যে সকল ভাটার অনুমোদন নেই তারা আমাদের সমিতির হতে পারে না। যদি কেউ বিনা অনুমতিতে ভাটা নির্মাণ করে সেটা প্রশাসনের দেখার বিষয়। 

ফসলি জমির ও নদীর তীরের মাটি কাটা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ঠিকাদারের মাধ্যমে মাটি ক্রয় করি, কারও জমি থেকে সরাসরি মাটি কেটে আনি না। 

তিনি আরও বলেন, তালিকা ভুক্ত যে সকল ইটভাটা রয়েছে এর মধ্যে প্রায় ৩০ ভাগ ভাটাই তাদের নিজস্ব ক্ষমতা বলে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হচ্ছে।

নড়িয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রোকনুজ্জামান বলেন, শরীয়তপুরে যতগুলো ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে তার একটিও কোনও প্রকার নিয়ম মেনে করা হয়নি। প্রতিটি ইটভাটাই তৈরি করা হয়েছে একেবারে লোকালয়ের ভেতরে। 

সিভিল সার্জন মো. খলিলুর রহমান বলেন, ইদানীং যত্রতত্র তৈরি করা হচ্ছে ইটভাটা। এমনকি আবাসিক এলাকার মধ্যে একেবারে শহরের কাছেই গড়ে উঠছে এসব ভাটা। এতে ভাটার যে কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে তাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক আকারে প্রভাব ফেলছে। এই কালো ধোঁয়ার মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মন অক্সাইডসহ আরও ক্ষতিকর যে সমস্ত পদার্থগুলো রয়েছে তা মানুষের শরীরের মধ্যে ঢুকে বিভিন্ন ধরনের রোগের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে প্রবেশ করে অনেক ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। 

জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের বলেন, যে সকল ভাটা যথাযথ নিয়ম না মেনে ভাটা পরিচালনা করছেন, দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে। এছাড়া অবৈধ ভাটাগুলো সিলগালা করব। প্রয়োজনে সেগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হবে।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর পাঠক প্রিয়