logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

দুলালের মদদেই ভয়ানক সন্ত্রাসী রিফাত হত্যা মামলার দুই আসামি

মনির হোসেন কামাল, বরগুনা প্রতিনিধি
|  ০২ জুলাই ২০১৯, ০৫:৪৫ | আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৯, ০৬:১০
দুলাল ফরাজী
দুলাল ফরাজী

ছেলেদের বখাটেপনায় বাবার ছিল প্রত্যক্ষ সমর্থন। কাউকে কুপিয়ে জখম অথবা মারধর কিংবা লাঞ্ছিতের খবরে শাসন তো দুরে থাক বরং সন্তানদের হেন অপকর্মে নিজেকে গর্বিত পিতা মনে করতেন। বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি দুই সহোদর রিফাত ও রিশান রিফাত ও রিশান বাবা দুলাল ফরাজী সম্পর্কে এমন তথ্যই দিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। দিনভর অনুসন্ধানে দুলাল সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল ফরাজীর পৈত্রিক বাড়ি সদর উপজেলার ৬ নং বুড়িরচর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বরগুনা পৌরসভায় চার নং ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি সড়কে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেন। সেখানেই পর্যায়ক্রমে জন্ম ও বেড়ে ওঠা রিফাত-রিশানের। বড় ছেলে রিফাত কিশোর বয়স থেকেই বখাটে স্বভাবের ছিল। মাধ্যমিকের স্তর অতিক্রমের আগেই পড়াশোনা সাঙ্গ হয় তার। ছোট ছেলে রিশান বরগুনা সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের ২য় বর্ষে অধ্যায়নরত। পড়াশোনায় মেধাবী হলেও বড় ভাইয়ের আঁচড় লাগে রিশানের। এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ‘বড় ভাই’ হওয়ার নেশায় পেয়ে বসে উভয়কে। ‘বড় ভাই’ হওয়ার মিশনে কারণে অকারণে অথবা তুচ্ছ কোনও ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে লাঞ্ছিত করতে থাকে। এরইমধ্যে রিফাত শরীফ হত্যায় মূল অভিযুক্ত এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাকদব্যবসায়ী নয়ন বন্ডের সাথে রিফাত ফরাজীর সখ্যতা গড়ে ওঠে।

২০১৭ সালের দিকে তৈরি হয় বন্ডের ০০৭ গ্রুপ। গ্রুপে সহযোগীদের পাশাপাশি যুক্ত হয় বেশ কিছু উঠতি তরুণ। এলাকায় নতুন কোনও তরুণের আকস্মিক আগমন ঘটলে তাকে বাধ্য করা হয় গ্রুপের সদস্য হতে। মাদকব্যবসায়ী নয়নের সাথে সখ্যতায় যোগ হয় নতুন মাত্রা। মাদকের সাথে জড়িয়ে পরে রিফাত। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। গ্রুপ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন সহোদরদের নেতৃত্বে কলেজে ও বিভিন্ন মেসে হানা দিয়ে ও ছাত্রদের মোবাইল জিম্মি করে অর্থ আদায় চলে। আর এসব অপকর্মের নালিশ আসলে বাবা দুলাল ফরাজী প্রথমে স্বীকারই করতেন না। তিনি বলতেন তার ছেলেরা এমন কর্ম করতেই পারে না। পরে প্রমাণ মিললেও সাফাই গাইতেন ছেলেদের পক্ষে। কেজি স্কুল এলাকার বেশ কয়েকটি মেসের ছাত্ররা জানায়, রিফাত রিশানের কাজই ছিল নিয়মিত ম্যাচে হানা দিয়ে মোবাইল ও ল্যাপটপ কেড়ে নেয়া। মেস মালিকদের বিষয়টি জানালে তারা রিফাতের বাবা দুলাল ফরাজীকে ডেকে পাঠাতেন। সবসময়ই দুলাল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ছেলেদের সাফাই গাইতেন।

শহরের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা আজীম মোল্লা জানান, মাস খানেক আগে দীঘির পাড় এলাকার তার একটি মেস থেকে ১৪টি মোবাইল ও একটি ল্যাপটপ কেড়ে নেয় রিফাত বাহিনী। বিষয়টি বাবা দুলাল ফরাজীকে জানালে তিনি এর পক্ষে প্রমাণ চান। প্রমাণ দিলেও তিনি ছেলেদের পক্ষাবলম্বন করে নির্লিপ্ত থাকেন। পরে আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে একটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়। আজিম বলেন, ‘ওদের বাবা দুলালের কারণেই আজ ছেলেদের এই দশা, ছেলেদের শাসন তো দূরে থাক, পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতেন। এমনকি লেলিয়ে দিয়ে অভিযোগকারীকে অপদস্থও করতেন। ক্রোক এলাকার জাকির হোসেন বলেন, এই এলাকার এমন কোনও ছাত্রদের মেস নেই যেখানে হানা দেয়নি দুলালের ছেলেরা। আমি বেশ কয়েকবার মোবাইল উদ্ধারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। দুলাল ফরাজীর আশকারায় তার ছেলেদের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে আজ এত বড় ঘটনার জন্ম হয়েছে।

ধানসিঁড়ি সড়কের রিফাত রিশানের বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী কয়েকজনের সাথে কথা হয়। সড়কের দক্ষিণ প্রান্তের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘দুলাল কোনও কাজকর্ম করত না। ছেলেদের দিয়ে এসব করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সে টাকায় সে চলত। যে কারণে ছেলেদের ব্যাপারে কেউ নালিশ নিয়ে গেলে তাঁতে উল্টো ছেলেদের সামনেই ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হতো। ওর ছেলেদের অত্যাচারে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিল।

ফেরার পথে কথা হয় একজন নারীর সঙ্গে । দুলাল ফরাজী ও তার ছেলেদের সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, তিনি দুলাল ফরাজির বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। ছেলেদের বিরুদ্ধে নালিশ এলে রিফাত ও রিশানকে বকাঝকা করতেন মা রেশমা বেগম। দুলাল ফরাজি তখন ছেলেদের পক্ষ নিয়ে উল্টো তার স্ত্রীকে মারধর করতো। দুলাল ফরাজী ছেলেদের অপকর্মের পক্ষ নেয়ার কারণ ছিল তার ছেলেরা ‘কামাইয়ের পুত’।

অভিভাবকদের এমন নৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কে কথা হয় বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি এডভোকেট মো. আনিসুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, পারিবারিক অনুশাসন না থাকলে বেশীরভাগ সন্তানই বখাটে হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পরে। রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা প্রমাণ করেছে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় কতটা নিম্নগামী। এ ঘটনার জড়িতদের অনেক অভিভাবকই ছেলেদের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। ঘটনাটি থেকে সব অভিভাবকের শিক্ষা নেয়া উচিৎ।

জিএ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়