বিশ্বব্যাপী একইদিনে ঈদ ও রোজা, ওআইসির সিদ্ধান্তের সাথে আলেমদের দ্বিমত

প্রকাশ | ১১ মে ২০১৯, ১৩:২৬ | আপডেট: ১১ মে ২০১৯, ১৩:৩৯

মাজহার খন্দকার

প্রতি বছর রোজা ও ঈদ এলেই তার সময় ও দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সাধারণত দেখা যায় যেদিন সৌদি আরবে রোজা ও ঈদ হচ্ছে বাংলাদেশে তার পরদিন ঈদ ও রোজা হয়। আবার দেশের কয়েকটি জায়গায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ পালন করেন দেশের কিছু সংখ্যক মানুষ। এবিষয়টি নিয়ে দেশের আলেম সমাজের মাঝে অনেক বিতর্ক হলেও কোনো সমাধান এখনও আসেনি। এমনকি ২০১৭ সালে দুই পক্ষের ১৫ জন করে সমান সংখ্যক আলেম ও বিশেষজ্ঞ নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিতর্কের আয়োজন করেও তার কোনো কুল কিনারা করতে পারেনি।

যারা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে একইদিনে রোজা ও ঈদ করছেন তারা মূলত একটি বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই রোজা ও ঈদ পালন শুরু করেন। তবে তাদের সেই বিশ্বাস বর্তমান এই বিজ্ঞানের যুগে বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে বলেই দাবি তাদের।

সুরেশ্বর দরবারের অনুসারী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের কিছু জায়গায় সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে অনেক আগে থেকেই কয়েকটি গ্রামের মানুষ রোজা ও ঈদ করে আসছেন।

এবিষয়ে সুরেশ্বর দরবারের বর্তমান গদীনশীল পীর সৈয়্যেদ নুরে আখতার হোসাইন আহমদনুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি আরটিভি অনলাইনকে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আমরা ঈদ ও রোজা পালন শুরু করি আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে।

তিনি বলেন, সুরেশ্বর দরবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ সুফী সৈয়্যেদ আহমদ আলী সাহেব এই প্রথা শুরু করেন। তিনি দেখলেন যে উপমাহাদেশে সঠিক সময়ে রোজা ও ঈদের চাঁদের খবর পৌঁছে না। তিনি গবেষণা ও বিচার বিশ্লেষণ করে যেদিন রোজা ও ঈদ পালন শুরু করলেন পরবর্তীতে দেখা গেলো সেদিনের সাথে সৌদি আরবের রোজা ও ঈদ উদযাপনের তারিখ মিলে যায়। কারণ যারা সেসময় হজে যেতেন তারা দেশে এসে দেখলেন যে তারা সৌদি আরবে যেদিন কোরবানির ঈদ করেছেন সুরেশ্বর দরবারও সেদিন ঈদ করেছে। এ থেকে মানুষের আস্থা বিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। আর উপমহাদেশের অনেক বড় আলেম ছিলেন সৈয়্যেদ আহমদ আলী সাহেবের ছাত্র। এক পর্যায়ে তারাও এর সাথে একাত্বতা ঘোষণা করেন।

সুরেশ্বর পীর বলেন, দাদার পর আমার বাবার অনুসারীরাও একইভাবে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে যখন থেকে আমার ওপর এই দায়িত্ব আসে, আমি মনে করলাম মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য এবিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছা দরকার। তাই আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখা কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একইদিনে রোজা ও ঈদ করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করি।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এই কথাটি সঠিক নয়, আমরা মনে করি পৃথিবীর যেখানেই চাঁদ দেখা যাবে তার খবরের ভিত্তিতে ঈদ ও রোজা পালন শুরু হবে। যেহেতু একদিনে বিশ্বব্যাপী জুমআ আদায় করা হয়। সেহেতু একইদিনে ঈদ ও রোজা পালন সম্ভব। আর এবিষয়ে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশানের (ওআইসি) একটি সিদ্ধান্ত আছে, যার বাস্তবায়ন আমরা চাই।

ওআইসি ফিকহ একাডেমি তার স্থায়ী সদস্যদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিশ্বের যে কোনো দেশে চাঁদ উঠলেই স্থানীয় সময় অনুযায়ী একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন করা হবে। কিন্তু ওআইসির সদস্য হলেও সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে কার্যকর হয়নি। এবিষয়ে ওআইসি ফিকহ একাডেমির বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইয়েদ আব্দুল্লাহ্ আল-মারূফ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, বিশ্বব্যাপী একইদিনে ঈদ ও রোজা করার বিষয়ে আলেম সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে যে বিতর্কের আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে উপযুক্ত প্রমাণ দেখানোর পরেও সরকার অজানা কারণে ওআইসির সিদ্ধান্ত মানতে অপারগতা প্রকাশ করে।

তিনি বলেন, হাদিসে এসেছে তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো ও চাঁদ দেখে রোজা ছাড়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট জায়গার কথা বলা হয়নি। এখন বিজ্ঞানের যুগ। চাঁদ কখন উঠবে তার খবর আগে থেকেই জানা যায়। যদি কুরআন শরিফ পড়তে চশমার সাহায্য নেয়া যায়। তাহলে চাঁদ দেখতে দূরবীনের সাহায্য নিলে অসুবিধা কোথায়।

তবে এসব যুক্তির সাথে দেশের অধিকাংশ আলেমগণই একমত নন। তারা বলছেন, সহিহ হাদিস দ্বারা একথা প্রমাণ করা যায় না যে, একই দিনে সারাবিশ্ব ঈদ ও রোজা রাখবে। এসম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ছাড়। তবে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে মাসের হিসাব ৩০ দিনে পূর্ণ করে নাও।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮১০)।

এছাড়া সিহাহ সিত্তার কোনো হাদিসে একথা প্রমাণ করা যায় না যে, সারাবিশ্ব একই দিনে রোজা ও ঈদ করবে।

এ সম্পর্কে শায়খুল হাদিস ও মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, তিরমিজি শরিফে পরিস্কার লিখা আছে প্রত্যেক শহরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময় অনুযায়ী তারা ঈদ পালন করবে।

হাদিসটির বর্ণনায় তিনি বলেন, সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে খলিফাতুল মুসলিম আমির মুয়াবিয়া (রা.) এর কাছে গেলেন মদিনার দূত কুরায়েব। তখন দামেস্কে রমজানের চাঁদ দেখা যায়। জুমআ’র রাতে সেই চাঁদ দেখা যায়। এরপর মাস শেষে যখন মদিনায় তিনি ফিরলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)তার কাছে চাঁদ দেখা সম্পর্কে জানতে চান। তিনি বলেন, আমরা জুমআ’র রাতে চাঁদ দেখি। তিনি জানতে চান, তুমি নিজে দেখেছ? কুরায়েব বললেন যে না, অন্যরা দেখেছেন এবং মুয়াবিয়াও রোজা রেখেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন আমরা চাঁদ দেখেছি শনিবার। তোমার কথায় আমরা রোজা ভাঙবো না। আমরা ৩০টি রোজাই রাখবো। কুরায়েব বললেন, মুয়াবিয়া তো খলিফাতুল মুসলিমিন তিনি যেভাবে রোজা রাখলেন সেভাবে কি হবে না? আব্বাস (রা.) বললেন যে না, হবে না। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা নিজ চোখে চাঁদ দেখে রোজা রাখো ও রোজা ছাড়।

মুফতি দিলাওয়ার হোসেন বলেন, দুরবীন বা যন্ত্রের সাহায্যে চাঁদ দেখে রোজা বা ঈদ করা যাবে না। চাঁদ যখন যে ভূখন্ডের মানুষ দেখবে তখন তারা রোজা ও ঈদ করবে।

মাওলানা ফাজরুল্লাহ খান বলেন, এটি সামষ্টিক ঘোষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এ বিষয়ে ঘোষণা দেবে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান। যারা এই কাজটি করছেন তা শুদ্ধ নয়। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে ঈদ বা রোজা পালন ইবাদতের কোনো আদেশ হতে পারে না, কোথাও বলাও হয়নি।

আলেমগণ মনে করেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজস্ব শাস্ত্রীয় পরিমণ্ডলে চাঁদের হিসাব শুরু করেন। কিন্তু দ্বীনী বিষয়গুলোতে যেহেতু শরীয়তের হুকুম মান্য করতে হয়, তাই সেই বিষয়গুলোকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাইরে রাখাই উত্তম।

এমকে