• ঢাকা বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬

বেড়েছে অগ্নিনির্বাপণ পণ্যের চাহিদা, চড়া দামের অভিযোগ

মিথুন চৌধুরী, আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট
|  ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৩৮
এফ আর টাওয়ারে আগুনের পর রাজধানীর বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহ করেছে রাজউক ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা। এতে অনেকটা নড়েচড়েই বসেছেন ভবন মালিক ও সংশ্লিষ্টরা। ফলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, বহুতল ভবনসহ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে। এতে করে হঠাৎ এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে কয়েকগুণ।

whirpool
রাজধানীর নবাবপুর ফায়ার ফাইটিং ইকুইপমেন্ট বিক্রেতা ও আমদানিকারকের সাথে কথা বলে জানা যায়, চাহিদা অনুযায়ী মজুত না থাকায় তাদের পণ্য সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে অনেক অসাধু বিক্রেতা বেশি দামে পণ্যগুলো বিক্রি করছেন।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অগ্নিনির্বাপক পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা সিওটু গ্যাস ফায়ার এক্সটিংগুইশার। যা ১ কেজি থেকে ২৫ কেজির ট্রলি পাওয়া যায়। যা ৬শ’ থেকে ২২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আগে যা পাওয়া যেত ৫শ’ থেকে ১৬ হাজার টাকায়। ৫ কেজি এবিসি এন্ড ই ড্রাই পাউডার পাওয়া যাচ্ছে ১৬৫০ টাকায়, যা আগে পাওয়া যেত ৮শ টাকায়। ফায়ার বল আগে পাওয়া যেত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৩শ’ থেকে ৫ হাজার টাকায়। ফায়ার বুট বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৮শ’ টাকা, পুরো ভবনের অটো এলার্ম সিস্টেম করা হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫লাখ টাকা, ফাস্ট এইড বক্স ৩৫০ থেকে ১২ হাজার টাকা, লাইফ জ্যাকেট ৪০০ টাকা, ফায়ার জ্যাকেট ১৪ হাজার টাকা।

এছাড়া গ্যাস মাস্ক, বেসিক স্মোর্ক এলার্ম, ইমারজেন্সি এলইড লাইট, এক্সিট লাইট, ফায়ার এলার্ম বেল, ফায়ার অটো ডোর, ইয়ার মাফ, ফায়ার বেস্টার হ্যান্ড গ্লাবস, কটন হ্যান্ড গ্লাবস, ফায়ার হুক, ফায়ার বিটার, ফায়ার বেলচা, ফায়ার বাকেট, বাকেট স্টান্ড, ফায়ার বালতি ও ফায়ার গ্লাসের বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে।

কেএস ইন্টারন্যাশনাল সিনিয়র সেলস ম্যানেজার রিয়াজ আহমেদ রিয়াজ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, মূলত আগে আমাদের বেচাকেনা হতো গার্মেন্টস খাতে। কিন্তু এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ভবনগুলো অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে তদারকি বেড়ে যাওয়ার পর, গেল কয়েকদিন ধরে বেচাকেনা বেড়েছে। অনেকেই আসছেন ফায়ার অগ্নি নির্বাপণের বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে। অনেক অফিস ও বাসা বাড়ি থেকে এসব পণ্যের অর্ডার আসছে।

অগ্নি নির্বাপণের দাম কেমন জানতে চাইলে শাহিন ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক শাহিন আরটিভি অনলাইনকে জানান, অগ্নিনির্বাপণের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে; ভবনের উচ্চতা, আয়তন, ডিটেকশন ও প্রটেকশনের সিস্টেমের ওপর দাম নির্ভর করে। চাহিদা বাড়ার কারণে দামও বেড়েছে। ডিটেকশন সিস্টেম ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রটেকশনের জন্য এক্সটিংগুইশারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে হঠাৎ করে পণ্যেল চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক আমদানিকারক পণ্যের দাম বাড়িয়ে তুলছে।

ক্রেতা সেজে এফকে করপোরেশনে ৫ কেজি এবিসি এন্ড ই ড্রাই পাউডারের দাম জানতে চাইলে আরটিভি অনলাইনকে তিনি বলেন, ১৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাকে পুনরায় বলা হয় গত মাসেই তো ৭শ করে নেয়া হয়েছে। প্রতিউত্তরে তিনি বলেন, বাজারে মালের চাহিদা বেশি। এলসি করে মাল আনতে আরও তিন মাস লাগবে। এখন ১৫শ রাখা যাবে সর্বনিম্ন।

শামা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সেলস ম্যানেজার লিটন পাটোয়ারী আরটিভি অনলাইনকে বলেন, গত ১০ বছরে এতো চাহিদা দেখিনি। আমাদের কাছে প্রতিদিন অসংখ্য ফোন আসছে বিভিন্ন প্রোডাক্টের জন্য। কিন্তু স্টক না থাকায় ৮০ ভাগ লোককে প্রোডাক্ট দিতে পারছি না।  চাহিদা যত বেড়েছে, সেই অনুপাতে স্টকে মালামাল নেই, এই কারণে দামও বেড়েছে। এছাড়া এসব পণ্য স্থাপনের জন্য দক্ষ জনবলও প্রয়োজন।

তবে অনেক ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ফায়ার এক্সটিংগুইশার বল বাজারে যা বিক্রি হচ্ছে তা আসলে অনেক ক্ষেত্রে আগুন নেভাতে সক্ষম হয় না। গুনগত মান না হলে এ পণ্য অগ্নি নিরাপত্তায় তেমন কোন কাজে আসবে না। এ পণ্য অনেকে সামাজিক মাধ্যম দেখে কিনছেন। এ সুযোগে নিম্নমানের বল বাজারে ছেয়ে গেছে।

বাজারে পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফায়ার ফাইটিং ইকুইপমেন্ট বিজনেস ওর্নাস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মো. নিয়াজ আলী চিশতী আরটিভি অনলাইনকে বলেন, শুধু বহুতল ভবন নয়, সব ভবনেই আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে ফায়ার ইকুইপমেন্ট পণ্যের চাহিদা বাড়ে। গার্মেন্টস খাতে ফায়ার ইকুইপমেন্ট ব্যবহার হলেও বহুতল ভবনও বাসাবাড়িতে তেমন ব্যবহার হচ্ছে না। সম্প্রতি আগুনের ঘটনায় সরকারের নানামুখী ব্যবস্থার পর মানুষ এসব পন্য কিনছেন। এরমধ্যে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছে। সরকারের নিয়ম নীতি না থাকায় আমাদের সমিতির বাহিরে অনেকেই পণ্যগুলো বিক্রি করায় আমরা সেসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ২২ শতাংশ থেকে ১শ শতাংশ সরকারের টেক্স দিয়ে পণ্য আমদানি করতে হয়। কিন্তু গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা বিনা শুল্কে পণ্য আমাদানী করে। যা আমরা রাজস্ব বোর্ড ও বাণিজ্যমন্ত্রণ্যালয়কে জানিয়েছি। যদি শুল্কের পরিমাণ কমে তাহলে দাম হাতার নাগালে চলে আসবে।

নিয়াজ আলী চিশতী আরও বলেন, শুধু বহুতল ভবন নয়, সব ভবনেই আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। বড় কয়েকটি ঘটনায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। ছোট ভবনগুলোর ক্ষেত্রেও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা জরুরি। তবে একটি বিষয় জরুরি, শুধু ফায়ার এক্সটিংগুইশার কিনলেই সমাধান হবে না। কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা দরকার, ব্যবহার পদ্ধতিও জানার প্রয়োজন রয়েছে।

গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জন নিহত ও ৭০ জন আহত হয়। এছাড়া পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ৬৯ জন মারা যান।

এমসি/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়