• ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

ইয়াবা ব্যবসা: জনপ্রতিনিধিসহ সাত আত্মসমর্পণকারী ২০০ কোটি টাকার মালিক!

শাহীন শাহ, টেকনাফ
|  ০২ মার্চ ২০১৯, ১৩:২৮ | আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ১৪:৫০
গেল বছরের চার মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলেও তেমন কোনও সমস্যা হয়নি টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীদের। তবে সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে মরিয়া হয়ে উঠে পুলিশ, র‌্যাব ও  বিজিবি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে একের পর এক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা একমাস পুলিশের সেফ হোমে থাকার ৯টি শর্তে আত্মসমর্পণ করে।

whirpool
এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১০২ জন ইয়াবাকারবারী আত্মসমর্পণ করেছেন। এর মধ্যে ৩০ জন ইয়াবা গডফাদারও রয়েছেন। টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক(আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কাছে ইয়াবা ও অস্ত্র জমা দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকালে তারা তিন লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা ও ৩০টি দেশীয় পিস্তল জমা দিয়েছেন। এসময় আত্মসমর্পণকারীদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

আত্মসমর্পণের পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দুই শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী। তারা হলেন টেকনাফ সদরের ইউপি সদস্য এনামুল হক ও মো. সিরাজ।

মো. সিরাজ বলেন, ইয়াবা পুরো দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এতে দেশের নতুন প্রজন্ম চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই অপরাধে আমরা দায়ী। ইয়াবা ব্যবসার কারণে টেকনাফসহ পুরো কক্সবাজার জেলার মানুষ সারাদেশের মানুষের কাছে ছোট হয়ে আছে। যেখানে যাই টেকনাফের মানুষ পরিচয় দিলে আমাদের ঘৃণা করা হয়।তাই আমি আর জীবনেও ইয়াবা ব্যবসা করব না।

ইউপি সদস্য এনামুল হক বলেন, আমরা ভালো হতে চাই। আমাদেরকে সুযোগ করে দিন। এটা বড়ই কষ্টের এবং লজ্জার। আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। যারা এখনও আত্মসমর্পণ করেনি তাদেরকেও আত্মসমর্পণ করার  আহ্বান জানাচ্ছি।বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড সীমান্তে যৌথভাবে কাজ করলে ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে আমাদেরকে ক্ষমা করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছি।

আত্মসমর্পণকৃতদের মধ্যে সাত জনপ্রতিনিধি ও এক নারী কাউন্সিলরের স্বামী রয়েছেন। এরা হচ্ছেন টেকনাফ হ্নীলা ইউনিয়নের জামাল হোসেন, নুরুল হুদা, সাবরাং ইউপির শামসুল আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, রেজাউল করিম রেজু, সদর ইউপির এনামুল হক, পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর প্রকাশ নুরশাদ এবং নারী কাউন্সিলরের স্বামী শাহ আলম।

নুরুল হুদা হেলপার থেকেই কোটিপতি:

নুরুল হুদা। একসময় গাড়ির হেলপারি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি নুরা বলে পরিচিত। অপর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ছোট দুজনকে নিয়ে নাফ নদীতে জাল ফেলতেন তাদের বাবা।

তিনজন পরের জমিতে লবণ শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু যাদের জমিতে কাজ করতেন, কয়েক বছরের মাথায় ইয়াবা ব্যবসার বদৌলতে সেই জমিই কিনে নেন নুরুল হুদা। মহাসড়কের ধারে গড়ে তোলেন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। তারপর একেক ভাইয়ের জন্য বানান একেকটি প্রাসাদ। ওঠাবসা ছিল এমপি, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে। পরে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পদে নির্বাচন করেন। প্রায় দেড় কোটি টাকা অর্থ ব্যয় আর ক্ষমতাসীনদের সমর্থনে ব্যালটবাক্স ভর্তি করে বনে যান নেতা। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদ  আট নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার হন নুরুল হুদা।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এককালের সেই হেলপার নুরা আজ শতকোটি টাকার মালিক। হ্নীলার টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কের পাশেই তাদের ছয় ভাইয়ের নামে ছয়টি নান্দনিক বাড়ি রয়েছে। বর্তমানে তাদের বাড়ির সংখ্যা ১৪। টেকনাফের হোছ্যারখালের উত্তর পাশে, হ্নীলা আলীখালী, লেদাবাজার এলাকায় হুদার নিজেরই তিনটি বাড়ি রয়েছে। নিজে বসবাস করেন পুরান লেদায়। ফ্ল্যাট আছে চট্টগ্রামে। তবে হ্নীলার দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্ট ঘেঁষে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেন ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ। যিনি ২০১৪ সালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

এছাড়া হ্নীলা লেদায় শত একর জমি কিনে নিয়েছে এই ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেড নুরুল হুদা। তবে আসামি থাকা অবস্থায়ই দুই কোটি টাকা ব্যয় এবং ক্ষমতার জোরে মেম্বার নির্বাচিত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হ্নীলার জাদিমুড়া থেকে খারাংখালী এলাকা পর্যন্ত নাফ নদীর দুই পাশে ইয়াবার সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন নুরুল হুদা। জাদিমোড়া, নয়াপাড়া, মোচনী, লেদা, রঙ্গীখালী, নাটমোড়া পাড়া, হ্নীলা সদর, ওয়াব্রাং ও খারাংখালী পয়েন্ট হয়ে প্রতিদিন মিয়ানমার থেকে তার নামে ইয়াবার চালান আসত। সন্ধ্যার পর এসব খোলা বিলে লোকজনের উপস্থিতি না থাকায় ইয়াবা চোরাচালানের একটি অন্যতম রুটে পরিণত হয়। বর্তমানে নুরুল হুদা একাই প্রায় শতকোটি টাকার মালিক বনে আছেন। তিনি একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পুলিশ জানায়, নুরুল হুদা হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সরওয়ার কামাল হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। তিনি ও তার সব ভাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের  তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী। ২০১৪ সালে আত্মগোপনে থেকে মেম্বার নির্বাচিত হলেও শপথ নিতে পারেননি। পরে ২০১৬ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে শপথ গ্রহণের চেষ্টা করেন। পুলিশ জানায়, এরা পারিবারিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ী। দ্বিতীয় ভাই শামসুল হুদা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন। নুরুল কবির, সরওয়ারসহ অন্য ভাইরাও ফেরার।

দিনমজুর থেকে কোটিপতি জামাল মেম্বার

জামাল মেম্বার।পিতা মৃত হায়দার আলী। এই জামাল হোছাইন ছিল একজন সাধারণ দিনমজুর। মাঝে  মধ্যে কৃষিকাজ করতেও দেখা যেত। ২০০৯ সালে লবণ ব্যবসার আড়ালে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আসায় মরণ নেশা ইয়াবা ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেন।এরপর ইয়াবা ব্যবসাকে আরও পাকাপোক্ত করার জন্য আরেক শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী  বন্দুকযুদ্ধে নিহত নুর মোহাম্মদের মেয়ের সঙ্গে তার ছেলে শাহ আজমের বিয়ে দেন। এরপর দুই বেয়াই মিলে গড়ে তুলে ইয়াবা ব্যবসার বড় সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে ঘুরে যায় তার ভাগ্যের চাকা। তার বেয়াই নুর মোহাম্মদ নিহত হওয়ার পর ছেলে শাহ আজমের মাধ্যমে ভারত, ঢাকা, কুষ্টিয়া, যশোর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান পাচার করে অল্প সময়ে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীর খেতাবে নাম লেখান। হয়ে যান ফেরারি। একের পর এক গাড়ি-বাড়ি ও জমি-জমার মালিক বনে গেলেও জনসম্মুখে আসতে পারত না।সম্প্রতি এই অপরাধ থেকে রক্ষা পেতে ইউপি নির্বাচনে কোটি টাকার অধিক ব্যয় করে মেম্বার নির্বাচিত হন। তিনি মেম্বার নির্বাচিত হয়ে বসে থাকেননি। ইয়াবা ও মোটা অংকের টাকা দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে হ্নীলা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান-২ নির্বাচিত হন। সে মেম্বার নির্বাচিত হলেও ইয়াবা বাণিজ্য থেমে থাকেনি। আরও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চট্টগ্রামে নিজস্ব অত্যাধুনিক ফ্লাটে বসে এই ব্যবসা চালাতে গিয়েই গত মাসে চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে ৩৬ হাজার ইয়াবা, নগদ ৪২ লাখ টাকা ও মূল্যবান প্রাইভেট গাড়িসহ আটক হয় তার পুত্রবধূ ও অপরাপর সিন্ডিকেটের সদস্যরা। বর্তমানে জামাল মেম্বারের রয়েছে প্রায় আড়াইশ খানি জমি ও আলিশান বাড়ি। সব মিলিয়ে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি প্রায় ৪০ কোটি টাকা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। গেল ইউপি নির্বাচনে এই শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে হ্নীলা সাত নম্বর ওয়ার্ড হতে ইউপি মেম্বার নির্বাচিত হন।  তার রয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা।

ফুটবলার থেকে কোটিপতি এনাম মেম্বার

টেকনাফ সীমান্তের অপরাধ জগত ও  ক্যাম্পভিত্তিক মাদক ব্যবসায়ীদের অন্যতম হোতা এনামুল হক। তিনি টেকনাফের মোজাহের মিয়ার ছেলে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, তিনি মিয়ানমারভিত্তিক শীর্ষ ইয়াবাকারবারীদের সঙ্গে আঁতাত করে এলাকার উঠতি বয়সী যুবকদেরকে অল্প দিনে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বৃহত্তর সিন্ডিকেট গড়ে তোলে টেকনাফ সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোটি কোটি ইয়াবা এদেশে নিয়ে এসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নামে বেনামে একাধিক গাড়ি-বাড়ি ও অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৬টি বিভিন্ন মামলা আছে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ওয়ারেন্ট রয়েছে।

সরেজমিন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৭ বছর বয়সী এনামুল হক ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ায় তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সেই সুবাদে তরুণদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন ইয়াবা ব্যবসায়। এ কারবার করে তিনি প্রায় ১৫ কোটি টাকার মালিক বনে যান। অবশ্য খেলার সুবাদে তিনি নাফ সিটি ফুটবলের সভাপতিসহ বেশ কয়েকটি স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের সভাপতি বলে জানান তার ভাই নুরুল হক। তিনি বলেন, তারা  ছয় ভাই তিন বোন। তাদের পৈত্রিক সূত্রে নানা সম্পত্তি রয়েছে। বর্তমানে তাদের পাঁচটি মুদির দোকান, চিংড়ি প্রজেক্ট রয়েছে। তাদের বাড়িটিও ভাঙাচুরা বলে জানান তারা। তাদের বক্তব্য ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিদ্দিক আমার বড় ভাই আজিজুল হককে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। তখন থেকে তারা নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। তারাই মূলত ইয়াবা ও অস্ত্র মামলা দিয়ে ১২টি মামলা করেছে।

প্রতিবেশীরা জানান, দামি দামি অনেক জায়গা রয়েছে যা এখনো রেজিস্ট্রি করেননি এনাম। কিন্তু চুক্তিনামা দ্বারা এসব জমি ভোগ করে আসছেন। পাশাপাশি জালিয়াপাড়া কমিশনার ইসহাক থেকে, নাজিরপাড়া ও কালুর বাড়ির বাম পাশে মোট ১৫০ কাটা তার জমি রয়েছে। চট্টগ্রামেও তার কোটি টাকার জায়গা রয়েছে বলেও জানা গেছে। তার ব্যবহৃত তিনটি নোয়া গাড়ির মধ্যে একটি মিরসরাই ফাঁড়ি ও বাকলিয়া থানার আটক রয়েছে বলে জানা গেছে।

মানব পাচার থেকে ইয়াবায় দানু মেম্বার

মোয়াজ্জেম হোসেন দানু। বাবা সৈয়দ আহমদ মাস্টার। তিনি বিদেশে কিছুদিন থেকে দেশে ফিরে একটি চান্দের গাড়ি কিনেন। সেই গাড়ির হেলপারি করতেন তিনি। কিন্তু এ ব্যবসায় বেশিদূর এগুতে পারেননি। বেকার হয়ে পড়েন। এসময় জড়িয়ে পড়েন মানবপাচারে। সাগর পথে অবৈধভাবে মানব পাচার করে টাকা রোজগার শুরু করেন। প্রশাসন মানবপাচার প্রতিরোধে অভিযানে নামলে তখন গা ঢাকা দেন তিনি। মানবপাচার থেকে অর্জিত পুঁজি নিয়ে নেমে পড়েন ইয়াবা ব্যবসায়। এ ব্যবসার বদৌলতে হয়ে উঠেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। তখন থেকে বিরামহীন ইয়াবা ব্যবসায় করে  আট থেকে ১০ কোটি টাকার মালিক বনে যান বলে স্থানীয়রা।

মাছ ব্যবসায়ী থেকে কোটিপতি শামসু মেম্বার

একসময় জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতেন শামসুল আলম। বাবার নাম আলী আহমদ। পরে মাছ চাষ শুরু করেন। মাছ ব্যবসা করতে করতেই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন শামসুল আলম।

ইয়াবার টাকা খরচ করে বনে যান সবরাং ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। তিনি মেম্বার হওয়ার পর থেকে পুরোদমে শুরু করেন ইয়াবা ব্যবসা। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বছরে ঘর-বাড়ি ও জমিজমা করে ফেলেন তিনি। ১০ কোটি টাকার বেশি তার অর্থ সম্পদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ইয়াবা ব্যবসায় কোটিপতি রেজু মেম্বার

শাহপরীরদ্বীপের এবাদুল হকের ছেলে রেজাউল করিম রেজু। বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে গেল ইউপি নির্বাচনে সাবরাং ইউনিয়নের সদস্য নির্বাচিত হন। তার পরিবার সচ্ছল থাকলেও ছাত্রত্ব ছেড়েই অর্থের লোভে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তাই বেশিদূর এগুতে পারেনি লেখাপড়া। প্রথমে লবণ ব্যবসা শুরু করেন তিনি। পরে আশপাশের লোকজনের দেখাদেখি তিনিও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ইয়াবা ব্যবসার আগে হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সব মিলিয়ে তার প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।

বেকার থেকে কোটিপতি নুরশাদ

নুরুল বশর নুরশাদ। বাবা মো. ইউনুছ। বেকার থেকে ইয়াবার বদৌলতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে টেকনাফ পৌরসভার সাত নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তিনি। বিপুল অর্থ খরচ করে গেল পৌরসভা নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার কুলালপাড়ায় রয়েছে একটি অত্যাধুনিক বাড়ি। টেকনাফ স্টেশনে আরএফএলের শোরুম। এর বাইরে ব্যাংকে রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

জিরো থেকেই হিরো নারী কাউন্সিলরের স্বামী

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী শাহ আলম। তিনি পৌর কাউন্সিলর কহিনুর আক্তারের স্বামী ও  টেকনাফের যুবদল নেতা। তিনিও ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছেন।

তিনি পৌরসভার পুরাতন পল্লনপাড়ার নুরুল ইসলামের ছেলে ও কাউন্সিলর কহিনুরের স্বামী।

গত বছরের আগস্টে একটি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করলে আদালত জামিন না মঞ্জুর না করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, গেল বছরের ২৯ জুলাই পৌরসভার কাউন্সিলর শাহ আলম মিয়ার বাড়িতে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় এই কাউন্সিলর বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় একটি মামলা  করেন। কাউন্সিলর শাহ আলম মিয়া জানান, কাউন্সিলর কহিনুরের স্বামী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী শাহ আলমের সঙ্গে আমার নামের মিল থাকায় আমি খুব বিব্রতকর অবস্থায় আছি। আমি মৌখিকভাবে এর প্রতিবাদ করলেও তার কোনও সুরাহা পাইনি।

শাহ আলম ইয়াবা ব্যবসার টাকা দিয়ে স্ত্রীকে মহিলা কাউন্সিলর করেছেন। নিজে সুরক্ষায় থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে মহিলা আওয়ামী লীগের পদও ভাগিয়ে নিয়েছেন। এ দম্পতির নামে-বেনামে অনেক সম্পত্তি রয়েছে।

কয়েক বছর আগে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ছেলের জন্মদিন পালন করে এ দম্পতি। সেইসঙ্গে নান্দনিক ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে টেকনাফের অলিগলি প্রদক্ষিণ করে টক অব দ্যা টেকনাফে পরিণত হন। তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকার মতো। তার স্ত্রী কহিনুর আক্তার উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার জন্য বিশাল বাজেট নিয়ে মাঠে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

টেকনাফ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাব-নিকাশের কাজ শুরু হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে পুলিশের আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছিলেন, ১৬ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পদের হিসাব এনবিআরের মাধ্যমে যাচাই-বাচাই করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়