Mir cement
logo
  • ঢাকা সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

রোহিঙ্গা প্রবেশের ৪ বছর: অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে ফিরতে চান তারা

রোহিঙ্গা প্রবেশের ৪ বছর: অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে ফিরতে চান তারা
রোহিঙ্গা ক্যাম্প (ফাইল ছবি)

মিয়ানমারে সৃষ্টি সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়ে পালিয়ে আসার ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে প্রত্যাবাসনের চুক্তি হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরাতে পারেনি উভয় দেশ। দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়াতে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গারা যায়নি। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে রয়েছে।

এদিকে ২৫ আগস্ট এই দিনটিকে কালো দিবস ঘোষণা করে প্রথম দুই বছর বড় পরিসরে শিবিরে নানা কর্মসূচি পালন করলেও গতবছরের মতো এবারও কোভিড এবং সরকারের কঠোর নজরদারীর কারণে তা করতে পারছেন না রোহিঙ্গারা।

তারা সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারছের না। গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে রোহিঙ্গাদের। তারপরও মসজিদ-মক্তবে তারা দিনটি উপলক্ষে হতাহতদের জন্য দোয়া প্রার্থনা করবেন দিনব্যাপী। সেই সাথে অনেকেই রোজা রাখবেন বলেও জানা গেছে। শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা। তাদের নিরপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে ফেরাতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘসহ সমগ্র দেশের কাছে আকুল আবেদন জানান তারা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন, ঘরবাড়ি আগুনে ভষ্মীভূত, গণহত্যা, ধর্ষণের অভিযোগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যের লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এপারে আসেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট বলে স্বীকৃত। রাখাইনের ২০১৭ সালের ওই নৃশংসতাকে গণহত্যা বলছে জাতিসংঘ। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিপুল এলাকাজুড়ে গড়ে তুলেছে ৩৪ শিবিরে নতুন ও পুরাতন মিলে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। কিন্তু চার বছরে তাদের একজনকেও ফেরত পাঠানো যায়নি।

৪ বছর পূর্ণ উপলক্ষে তাদের একমাত্র দাবি নিরাপত্তা ও তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে জন্মভূমিতে ফেরত দেওয়া। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে খাবার দাবার দেওয়া হলেও শরণার্থী জীবন চান না তারা। নিজ দেশে ফেরাতে জাতীয়- আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থার সহযোগিতা কামনা করেন তারা।

সরকার ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে দুই দেশের চুক্তি হয়। এরই প্রেক্ষিতে বেশকিছু রোহিঙ্গাকে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চয়ন করেন সে দেশের সরকার। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর ও ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট দুইবার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরেনি। বাংলাদেশও জোর করেনি। প্রত্যাবসন প্রক্রিয়া চলছে কচ্ছপগতিতে এর মধ্যে ২০২১ সালের শুরুতে সেদেশের সেনা অভ্যুত্থানের কারণে আরো থমকে যায় এ প্রক্রিয়াটি।

অপরদিকে পালিয়ে আসার এক বছর পূর্ণ হলে নানা কর্মসূচি পালন করেন রোহিঙ্গারা। পরবর্তী বছর ২০১৯ সালে এ দিবস পালন করতে গিয়ে লাখো রোহিঙ্গা সমবেত হয়। উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ৪ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে এ সমাবেশ করে। তাদের বর্ণাঢ্য আয়োজন ও সমবেত হওয়া দেখে রাষ্ট্র নড়চড়ে বসে। একযোগে বেশ কয়েকজন ক্যাম্প ইনচার্জ সিআইসি (নির্বাহী মেজিস্ট্রেট) বদলি করা হয়। তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করার অভিযোগে বেসরকারি সংস্থা ‘এডরা’সহ কয়েকটি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। সব মিলিয়ে নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তখন অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সেই সাথে তিনটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন নিযুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে তারা নানা কর্মসূচি করার জন্য আবেদেন করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু কোভিডকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে, তা নাকচ করা হয়েছিল। মসজিদ মক্তবে রোজা রেখে ঠিকই দিনটি পালন করেন। এবারও প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। গতবারের মতো অভ্যন্তরীণভাবে হতাহতের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া প্রার্থনা ও রোজা রেখে দিনটি পালন করবেন রোহিঙ্গারা।

২৬ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের ষাটোর্ধ্ব সৈয়দ আহমদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরটিভি নিউজকে বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ওপারের কবরস্থানে পড়ে আছেন। সেই সাথে জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী আমাদের ভাই-বোন, বাবা, মা-বোনকে হত্যা, ধর্ষণ করে। অসংখ্য বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এইসব দুঃসহ স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এইভাবে আর কতদিন থাকবো? যেভাবেই হোক মিয়ানমারে ফিরতে চাই।

২৬ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) বজরুল ইসলাম বলেন, আমি রাখাইন রাজ্যের চেয়ারম্যান ছিলাম। মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার হয়ে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে। এ জীবন আমাদের কাম্য নয়। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা ১৮ হাজার নারীদের ধর্ষণ, ২৫ হাজার মৃতদেহের সন্ধান, সেখানকার কারাগারে শতাধিক রোহিঙ্গাদের পিটিয়ে হত্যা, ৭৫ হাজার বাড়িঘর ও ৭২ হাজার দোকান পুড়িয়ে দেয়। এসব নির্যাতনের কারণে পালিয়ে আসতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক নারী এখনও দলবেঁধে ধর্ষণের নির্যাতনের কথা ভুলতে পারেননি। কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে তাদের। অনেকে অকপটে বললেও আবার অনেকে স্বামী-সন্তানের জন্য মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অথচ পরিবার ও পার্শ্ববর্তীরা প্রত্যক্ষদর্শী।

নির্যাতনের ভয়ে তারা ওপারে যেতে চাচ্ছেন। অন্যথায় স্বেছায় চলে যেতেন। নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিভাবে হাত বাড়ানোর অনুরোধ তার।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গারা চেয়েছিল কর্মসূচি পালন করতে। কিন্তু আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি বিধায় পালন করবেন না তারা। এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে রাষ্ট্র কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সেইভাবে শিবিরগুলোতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত জানান, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এটি অব্যাহত রয়েছে। কোভিডের কারণে হয়তো ধীরগতি হতে পারে। তবে সকলেই একযোগে কাজ করছি।

তিনি আরো বলেন, ২৫ আগস্ট হিসেবে রোহিঙ্গারা কোনো কর্মসূচি পালন করবেন না। তাছাড়া কোভিডের কারণে গত আড়াইমাস ধরে ৫-১০ জন জড়ো হয় এমন কোনো কাজও বন্ধ রয়েছে। সে হিসেবে কোনো কিছুই করবেন না রোহিঙ্গারা।

পি

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS