Mir cement
logo
  • ঢাকা সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮

লকডাউনে নতুন মা'দক ‘ঝাক্কি’ তে ঝুঁকছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা, টানা ২-৩ দিনের ঘুমে বুদ!

Long sleep for university students after consuming new drug 'Jhakki-Cocktail' in lockdown!
ল্যাবে নতুন মাদক ‘ঝাক্কি’ বা ‘ককটেল’ তৈরির সরঞ্জাম

‘ককটেল’ বা ‘ঝাক্কি’ পুরাতন মাদকের সংমিশ্রণে তৈরি করা এক নতুন রূপ। যা খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ টানা ২ থেকে ৩ দিন ঘুমিয়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এটি তরল জাতীয় মাদক, যা দামি এবং কম দামি মাদকের মিশ্রণে তৈরি করা হয়। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় এমন ধরণেরই এক ল্যাবের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে এই মাদকটি তৈরি করা হচ্ছিলো।

লকডাউন কিংবা কঠোর বিধিনিষেধের কড়াকড়িতে যখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঠিক তখনই সংমিশ্রিত নতুন এই মাদক তৈরি করা শুরু করে অভিজাত পরিবারের সন্তান জামিলুর চৌধুরী জুবেইন (৩৭)। এই জুবেইন লন্ডন থেকে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে মাদক কারবারে জড়িয়ে যায়। জানা গেছে, সংমিশ্রিত মাদক ‘ককটেল’ বা ‘ঝাক্কি’ এর সিংহভাগ ক্রেতা অলস সময় পার করতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীরা।

এ অবৈধ কর্মকাণ্ডে জুবেইনে সঙ্গে যুক্ত হয়, তৌফিক হোসাইন (৩৫), এসএসসি পাশ করা আরাফাত আবেদীন রুদ্র (৩৫), রাকিব রাকিব বাসার খান (৩০), সাইফুল ইসলাম সবুজ (২৭) এবং খালেদ ইকবাল (৩৫)।

এদের মধ্যে আরাফাত আবেদীন রুদ্রই মূলত দামি ও কম দামি মাদকের সংমিশ্রণ করে ‘ঝাক্কি’ তৈরি করতে দক্ষ। মাদকের ল্যাবের দায়িত্বটি তার’ই ছিলো।

জানা গেছে, মাদকের ‘ঝাক্কি’ বা ‘ককটেল’ তৈরি করতে- ইয়াবা, ক্রিস্টাল আইস, ঘুমের ট্যাবলেট, ফেনসিডিলসহ আরও কয়েকটি কেমিক্যাল মেশানো হতো।

শুক্রবার (১৮ জুন) বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত জানায় র‌্যাব। জানানো হয়, রাজধানীর উত্তরা থেকে আইস মাদক সরবরাহকারী চক্রের মূলহোতা তৌফিক হোসেনসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে তাদের কাছ থেকে মাদক তৈরির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন দেশীয় ও বিদেশি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব বলছে, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে দামি মাদক ‘ক্রিস্টাল আইস’ নিয়ে আসতো সংঘবদ্ধ চক্রটি। মাদক বিক্রিতে তাদের টার্গেট উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীরা।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘কয়েক বছর আগে রাজধানীর উত্তরায় বায়িং হাউজের আড়ালে ‘আইস’ নামে নতুন মাদকের ব্যবসা করে আসছিলো অভিযুক্ত তৌফিক হোসেন। র‌্যাবের হাতে সে সহ আরো ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর বেড়িয়ে আসে এ মাদক বিস্তারের ভয়ংকর তথ্য। নতুন নতুন নেশায় মাদক সেবীদের আকৃষ্ট করতে তাদের তৈরি ল্যাবে চলতো গবেষণা।

তাদের আস্তানায় মাদক সেবন করতে আসা শিক্ষার্থীদের অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ দিয়ে এক পর্যায়ে তাদের নগ্ন ভিডিও ধারণা করে ব্ল্যাকমেইল করে হাতিয়ে নিতো মোটা অংকের টাকা। মানসম্মানের ভয়ে ওইসব তরুণ-তরুণীরা কাউকে ঘটনার বিষয়ে কিছুই বলতেও পারতো না। চাপ প্রয়োগ করা হতো- অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে চক্রটির তৈরি করা মাদকের ক্লোজ গ্রুপে যুক্ত হওয়ার। কেবল তা’ই নয় ওই গ্রুপ থেকে নিয়মিত মাদকের ক্রেতা হতে হবে এবং মাদকের বিত্তশালী ক্রেতা যোগাড় করে দিতে হবে অথবা বন্ধু-বান্ধবীদেরকে মাদকের প্রতি আসক্ত করে তুলতে হবে। যাতে করে নতুন করে মাদকাসক্তরা চক্রটির কাছ থেকে নিয়মিত মাদক ক্রয় করে। এমন করে ধারাবাহিকভাবেই চক্রটি মাদকের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক তৈরি করে আসছিলো।

আস্তানায় মাদক গ্রহণ করতে এসে চক্রটির ফাঁদে পড়ে যারা তাদের প্রস্তাবে রাজি না হতো, তাদেরই এয়ারগান, রেপলিকা পিস্তল এবং তলোয়ার দিয়ে ভয় দেখাতো এবং জিম্মি করে কৌশলে অর্থ আদায় করতো।

এ সিন্ডিকেটের আরো বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। অচিরেই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

ঘটনার বিস্তারিত

র‌্যাব বলছে, বর্তমান সময়ের মাদকের ধরন ও সরবরাহের গতিপথে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো ‘আইস’। এই মাদকে আসক্ত হয়ে মাদকাসক্তরা নানা অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে। আইস এক ধরণের মেথাফেটামিন মাদক যা মানবদেহে ইয়াবার চেয়েও বহুগুণ ক্ষতিসাধন করে।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে র‌্যাব আরও বলছে, এটি সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার জটিলতা এবং মানসিক অবসাদ ও বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রে ইহা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই মাদকের প্রচলনের ফলে তরুণ-তরুণীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, একটি চক্র ‘মেথ ল্যাব’ তৈরি করে ভেজাল আইস, ইয়াবার রং পরিবর্তন, ঝাক্কি মিক্স, ঝাক্কি কিংবা ককটেল মাদক তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে র‌্যাব গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ায় এবং ছায়াতদন্ত শুরু করে।

এক পর্যায়ে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে মূল হোতা তৌফিক হোসাইনসহ ৬ জন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩।

অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে, আইস, ইয়াবা, বিদেশী মদ, গাঁজা, ১৩টি বিদেশী অস্ত্র, রেপলিকা অস্ত্র, অন্যান্য ইলেকট্রিক শক যন্ত্র, মাদক সেবনের বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামাদিসহ ল্যাবরেটরি (মেথ ল্যাব) সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।

এই সংঘবদ্ধ চক্রটি সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরায় একটি ‘মেথ ল্যাব’ তৈরির চেষ্টা করছিল। এই মেথ ল্যাবটি মূলত গ্রেপ্তারকৃত আরাফাত রুদ্র ওরফে ঝাক্কি রুদ্র ও তার কয়েকজন সহযোগীর সহায়তায় পরিচালিত করত।

তারা আইস ও ইয়াবার পরীক্ষামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। তারা বাজার হতে বিভিন্ন ওষুধ ও কেমিক্যাল মাদকের সাথে মিশ্রণ করতো। তারা পাতন পদ্ধতিতে ভেজাল দ্রব্য মিশিয়ে আইসের পরিমাণ বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবার রং পরিবর্তন এবং ‘ঝাক্কি’ তৈরি করত। ‘ঝাক্কি’ তৈরিতে তারা তরল পানির সাথে ইয়াবা, ঘুমের ওষুধ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় ‍ওষুধের তরল মিশ্রণ করত বলে জানায়। তারা ভেজাল ও পরিশুদ্ধ উভয় প্রকার আইস সরবরাহ ও নিজেরাও সেবন করতো। এছাড়া মাদক দ্রব্য সেবনের জন্য তারা উত্তরায় একটি বাইং হাউজের নামে বাসা ভাড়া করে গোপনে মাদক সেবন ও অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করত। যেখানে সেবনকারী সিন্ডিকেটের একই ‘রিং’ বা পরিচিতরা আসা যাওয়া করতো।

তারা অনলাইনে বিভিন্ন কনটেন্ট হতে মেথ ল্যাব সম্পর্কে জানতে পারে।

এই ব্যবসার মূলহোতা ও সমন্বয়কারী হলেন তৌফিক। অর্থ যোগানদাতা গ্রেপ্তারকৃত জুবেইন ও খালেদ। গ্রেপ্তারকৃত রুদ্র কেমিস্ট হিসেবে ‘মেথ ল্যাব’ পরিচালনা করতো। গ্রেপ্তারকৃত ‘সবুজ’ সংগ্রহ ও সরবরাহকারী এবং তৌফিকসহ বাকিরা সকলেই মাদক বিপণনের সাথে জড়িত ছিল। এ চক্রে আরও ১০ থেকে ১৫ জন রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত জুবেইন লন্ডন থেকে বিবিএ, তৌফিক বেসরকারি ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ, খালেদ বেসরকারি ইউনিভার্সিটি হতে এমবিএ পাশ করে। অন্যদিকে তাদের সহযোগী রুদ্র ও সাইফুল এইচএসসি পাশ করার পর ড্রপ আউট হয়। গ্রেপ্তারকৃত রুদ্রের নামে ৩টি মাদক মামলা রয়েছে এবং জুবেইনের নামে ১টি হত্যা চেষ্টা মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবনে তারা চরম আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছায়। পরবর্তীতে আসক্তির মাত্রা বাড়াতে গত ৪ থেকে ৫ বছর যাবৎ তারা আইস গ্রহণ শুরু করে। গ্রেপ্তারকৃতরা বিভিন্ন সময়ে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের নেশায় উদ্বুদ্ধ করতো। ক্ষেত্র বিশেষে গোপন ভিডিও ধারণ করে তাদেরকে ব্লাকমেইল করত। এছাড়া তারা অস্ত্রদ্বারা ‘এমিং গেম’ জুয়া খেলত।

গ্রেপ্তারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সদস্য এবং তারা আইস গ্রহণে মারাত্মকভাবে আসক্ত। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও কিছু সিন্ডিকেট এবং এই মাদকের সাথে জড়িতদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। যার ভিত্তিতে সাড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে এই এলিট বাহিনী।

কেএফ

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS