Mir cement
logo
  • ঢাকা শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

ভারতে নি'র্যা'তিত তরুণীর বাবা ভেবেছিলেন ‘মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে’

The father of a girl who was tortured in India thought,
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও চিত্রের স্ক্রীনশর্ট

ভারতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকায় থাকা তার বাবা ভেবেছিলেন, ‘মেয়ে তার চাঁদপুরের শ্বশুরবাড়িতে রয়েছেন।’ কিন্তু বহুদূরে ভারতের কোনো এক রাজ্যে ঘটনাটি ঘটেছে জানার পর মেয়েকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন তিনি। পাশাপাশি জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে জুস বিক্রিতা এই বাবা।

শুক্রবার (২৮ মে) তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ে নিজের ইচ্ছায় ভারত যেতে পারার কথা নয়। নিশ্চয়ই তাকে কেউ পাচার করে সেখানে নিয়ে গেছে। এখন যেভাবেই হোক আমার মেয়েকে ফেরত চাই।’

কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা এই ব্যক্তি জানান, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা তার মেয়েটি মগবাজার এলাকার বাসিন্দা চাঁদপুরের এক ছেলের সঙ্গে প্রেম করে ৭ বছর আগে বিয়ে করে। তাদের ৩ বছর বয়সী এক মেয়ে আছে। সাড়ে তিন বছর আগে মেয়ের জামাই কুয়েতে গেলে মেয়েটি মাঝে মধ্যে ঢাকায় এসে থাকত। তার জীবন ভালোই চলছিল।

দেড় বছর আগে মেয়েটি ‘মগবাজারে তার স্বামীর বন্ধু হৃদয়ের মাধ্যমে’ দুবাই যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের কথা জানালে নিষেধ করেছিলেন বাবা। তারপরও মেয়েটি নাছোড়বান্দা, স্বামীর বন্ধু হৃদয়ের ফাঁদে পড়ে কবে যে ভারতে চলে গেলো, টের পাননি তিনি।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় ৬ জনকে গ্রেপ্তারের খবর এসেছে দেশটির সংবাদমাধ্যমে। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, ২২ বছরের ওই তরুণীকে বিবস্ত্র করে শারীরিক নির্যাতনের পর দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়। গ্রেপ্তার সবাই একই গ্রুপের এবং সবাই বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের দুইজন নারীও রয়েছেন।

এই ঘটনায় ঢাকার হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে নির্যাতনের শিকার মেয়েটির বাবা টিকটক হৃদয় বাবুসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ মে) এনডিটিভি জানায়, নির্যাতনের ওই ঘটনাটি ঘটেছে ৬ দিন আগে। বীভৎস কায়দায় নির্যাতনের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া তরুণীর বাবা বলেন, ‘পড়াশোনা করতে পারিনি, কতকিছু বুঝি না, ফুটপাতে জুস বিক্রি করি। ছোট্ট নাতনিকে আমার কাছে রাখতাম, আর মেয়ে চাঁদপুরেই থাকত, এখনও তাই ভাবছিলাম মেয়েটা চাঁদপুরেই শ্বশুর বাড়িতে আছে। এক বছর ধরে মেয়ের কোনো খবর নেই। কিন্তু এখন দেখি মেয়ে আমার ভারতে, ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলো।’

মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ২ মেয়ে ও ১ ছেলে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, আর স্ত্রীসহ ৪ জনকে নিয়ে মগবাজার এলাকায় বসবাস করছি। কিন্তু করোনাভাইরাসের সময় সব এলোমেলো হয়ে যায়। সংসার আর চলছিল না বলে পুরো পরিবারকে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ পাঠিয়ে দেই। ঢাকায় একা থাকতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে যাই। তাই এর মাঝে আর মেয়ের খবর নেওয়া হয়নি।’

মেয়ের বিষয়ে মন্তব্য করে এই বাবা বলেন, ‘মেয়েটা আমার ছোটবেলা থেকেই একটু চঞ্চল প্রকৃতির। তার পড়াশোনা না জানা মেয়ে এভাবে ভারতে যেতে পারে না। তাকে ফুঁসলিয়ে পাচারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

বেঙ্গালুরু সিটি পুলিশের কমিশনার কামাল পান্ট টুইটারে জানান, ‘নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি তরুণীকে পাচারের জন্য ভারতে আনা হয়েছিল। তিনি এখন অন্য একটি রাজ্যে রয়েছেন। তাকে বেঙ্গালুরুতে নেওয়ার জন্য পুলিশের একটি দল গেছে। তাকে বেঙ্গালুরুতে নেওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার জবানবন্দি নেওয়া হবে।’

এবিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘ভিক্টিমের বাবা গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল থানায় হৃদয় বাবুকে প্রধান আসামি করে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। পর্নোগ্রাফি ও মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করেছেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে আমরা কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের সংবাদ পেয়েছি। আমরা জানতে পেরেছি, এই ঘটনায় জড়িত সবাইকেই বেঙ্গালুরুর পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মাধ্যমে আমরা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ভিক্টিম ও আসামিদেরকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি ভারতে ভিক্টিম তরুণীর অবস্থান সম্পর্কে কিছু তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। সেসব তথ্য দিয়ে ভিক্টিমকে উদ্ধারে আমরা বেঙ্গালুরুর পুলিশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী ও নির্যাতনকারীদের একজন ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা। সাইবার পেট্রোলের অংশ হিসেবে ভিডিওটি তাদের নজরে আসে। নির্যাতনকারী একজনের চেহারার সঙ্গে মগবাজার এলাকার এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা ছবির মিল পাওয়া যায়। সেখান তার পরিচয় রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবু বলে শনাক্ত করা হয়। ২৬ বছর বয়সী হৃদয়কে মগবাজারের অধিবাসীদের অনেকেই চেনেন।

হৃদয়ের মা ও মামা পুলিশকে বলেছেন, ‘উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের’ কারণে ৪ মাস আগে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বাসার কারো সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই।

ঢাকার পুলিশ বলছে, হৃদয় ভারতের পুনেতে অবস্থান করার কথা তার পরিবারকে বলেছিলেন। ওই ভিডিওতে নির্যাতনের সময় হৃদয়ের সঙ্গে যাদের দেখা গেছে, তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

কেএফ/পি

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS