Mir cement
logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮

যেভাবে সামনে এলো যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মৌসুমীর বিয়ে প্রতারণা 

The way the US expatriate seasonal marriage fraud came to the fore
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শারমিন সুরভী মৌসুমী

শারমিন সুরভী মৌসুমী জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। বাড়ি সিলেটে জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট চুনাহাটি গ্রামে। স্থায়ীভাবে মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আর মার্কিন নাগরিকত্বকে কাজে লাগিয়ে বিয়ের নামে প্রতারণা করে যাচ্ছেন শারমিন সুরভী মৌসুমী।

আরটিভির অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে মৌসুমীর প্রথম বিয়ে হয়েছিল এক চিকিৎসকের সঙ্গে। তার ৫ বছর বয়সের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। সে তথ্য গোপন রেখে কুমারী সেজে ২০২০ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর বরপক্ষের কাছ থেকে স্বর্ণ, কাবিননামা ও অনলাইন শপিংয়ের জন্য আত্মসাত করেছেন টাকা।

মৌসুমীর এমন প্রতারণার কারণ বুঝতে পেরে দ্বিতীয় স্বামী সিলেটের গোলাপগঞ্জ ভাদেশ্বর দক্ষিণভাগ গ্রামের আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে জাকের আহমদ বাদী হয়ে প্রতারণার মাধ্যমে পূর্ববর্তী বিয়ের তথ্য গোপন করে বিয়ে করার অপরাধে তার ও তার বাবা-মায়ের নাম উল্লেখ করে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। এরপর অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেন মামলাটি এফআইআর পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। সিলেট এসএমপির বিমানবন্দর থানায় মামলাটি দাখিল করা হয়। মামলা নং ৭(২)২১ ।

মামলার আসামিরা হলেন, সিলেটের জৈন্তাপুর থানার নিজপাট চুনাহাটি গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে রফিকুর আর এম এ মুনিম (৫০), তার স্ত্রী ইমামা বেগম চৌধুরী (৪৫) ও শারমীন সুরভী মৌসুমী (৩১)।

জাকের আহমদ তার মামলায় উল্লেখ করেছেন, তিনি সাইপ্রাস প্রবাসী। ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি দেশে এলে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক সিলেট নগরীর হাউজিং এস্টেট ৭ নম্বর লেনের ৫৬ নম্বর বাসায় মৌসুমীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তখন কন্যার বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন। বিয়ের ১৩ দিন পর মৌসুমী তার মা-বাবাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

তখন বরের বাবা-মাকে বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে জাকেরকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর মৌসুমী ফোনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন জাকেরের সঙ্গে। গত বছরের ২১ নভেম্বর মৌসুমী ফোন করে জাকেরকে বলেন, তোমাকে আমেরিকা আনতে হলে ২৫ লাখ টাকা লাগবে। অন্যথায় আনা যাবে না। তখন জাকের তার মা-বাবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। জাকেরের মা-বাবা বলেন, এতো টাকা দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার দরকার নেই।

এর চেয়ে সাইপ্রাস ছিলে, সেখানে চলে যাও। সাইপ্রাস থেকে পরে আমেরিকা যাবে। পরে মৌসুমী ২৫ নভেম্বর ফোন করে বলেন, দেশে এলে তাকে নিয়ে উপশহরে বাসা ভাড়া করে থাকতে হবে। সে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকবে না। এই কথায় রাজি হননি জাকের। তখন মৌসুমীর মা ফোনের মাধ্যমে বলেন, তার মেয়ের কথা না শুনলে, বিয়ের সম্পর্ক রাখা যাবে না। এরপর ২৮ ডিসেম্বর মৌসুমীর গ্রামের বাড়ি জৈন্তাপুরে গিয়ে তার স্বজনদের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ের স্বামীপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তখন জানতে পারেন, মৌসুমীর মা-বাবা ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার পৃথিমপাশা সুজাপুর গ্রামের মো. শফিক মিয়ার ছেলে ডা. মো. ফরিদ আহমদের সঙ্গে মৌসুমীর বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর ২০১৫ সালের ৩ মার্চ একটি ছেলেসন্তান জন্মে।

এ খবর পেয়ে প্রথম স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন দ্বিতীয় স্বামী জাকের। বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তখন প্রথম স্বামী বলেন, তার সঙ্গে বিয়ের পর ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই মৌসুমী বাদী হয়ে মোহরানার জন্য সিলেটের জৈন্তাপুর পারিবারিক আদালতে (মামলা নং৩৯/১৮) মামলা দাখিল করেন। যা গত বছরের ১৫ মার্চ সোলেনামা দাখিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। মৌসুমী ও তার বাবা-মা প্রতারক। নিরীহ লোকদেরকে প্রতারণার জালে ফেলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়াই তাদের মূল কাজ।

জাকের তার মামলায় আরও উল্লেখ করেন, তার সঙ্গে মৌসুমীর বিয়ের জন্য উভয় পক্ষের আলোচনায় ১৫ লাখ টাকার স্বর্ণ ও দেনমোহর বাবদ ৬ লাখ টাকা মু’আজ্জল রেখে কাবিন সাব্যস্তে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের কাবিননামা তুলে দেখা যায়, সেখানে ২১ লাখ টাকার কাবিননামা ও ১ লাখ টাকা স্বর্ণালঙ্কার বাবদ পরিশোধ দেখানো হয়েছে। তাছাড়া প্রথম বিয়ে গোপন রেখে কুমারি সেজে বিয়ে হয়েছে। যা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছে।

মামলার বাদী জাকের আহমদ আরটিভি নিউজকে বলেন, তার বিশ্বাস ভঙ্গ করে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাৎ করেছেন এবং প্রথম বিয়ে গোপন করেছেন মৌসুমী। তিনি বিষয়টি জানতে পেরে সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে (এয়ারপোর্ট সিআর মামলা নং১১/২১ ইং) মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে এফআইআর গণ্যের আদেশ দেন।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আব্দুর রহমান আফজাল আরটিভি নিউজকে জানান, প্রথম স্বামীর সঙ্গে মামলা চলাকালীন সময়ে বিয়ে গোপন রেখে জাকেরকে বিয়ে করেন মৌসুমী। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দাখিল করলে আদালত তা গ্রহণ করে এফআইআর গণ্যে প্রেরণের জন্য এসএমপির বিমানবন্দর থানাকে নির্দেশ দেন আদালত।

মৌসুমীর প্রথম বিয়ের বর ঐ চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, তিনি মৌসুমীকে বিয়ে করেছিলেন। এমনকি নিজের টাকায় আমেরিকাতেও গিয়েছিলেন। তাদের একটি সন্তান আছে। সে বর্তমানে মৌসুমীর কাছে আছে।

সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে এ ব্যাপারে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ঐ চিকিৎসক হতাশা নিয়ে বলেন, তাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে এবং সিলেটে আদালতের মাধ্যমে বিয়ের কাবিননামার ৩০ লাখ টাকা তিনি মৌসুমীকে দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঐ চিকিৎসকের সঙ্গে বিয়ের কাবিননামায় জৈন্তাপুরের বাপের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার না করে মৌসুমী মুসলিম কোয়ার্টার হবিগঞ্জ সদরের ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।

এ বিষয়ে মৌসুমী ও তার পরিবারের সঙ্গে বার বার যোগাযোগ করা হলে তাদেরকে পাওয়া যায়নি। তবে মৌসুমী বিভিন্ন মানুষ দিয়ে আরটিভি নিউজটিমকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।

অবশ্য সিলেট প্রেসক্লাবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করেন মৌসুমী। সেই সংবাদ সম্মেলনে মৌসুমীর টাকা চাওয়ার দাবিটি অস্বীকার করে তিনি জানান, জাকেরের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। তবে সে শারীরিকভাবে অক্ষম। এ জন্য তার সঙ্গে সম্পর্কে আঘাত আসে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

প্রতারণার শিকার হওয়া জাকের আরটিভি নিউজকে বলেন, শারমিন সুরভী মৌসুমীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি আমার কাছে যখন টাকা দাবি করেছেন, আমি দিতে রাজি না হওয়ায় তিনি আমার উপর এমন ব্লেইম দিচ্ছেন।

মৌসুমী-জাকেরের বিয়ের ঘটক মৌসুমীর আত্মীয় সৈয়দ জয়নুল হক আরটিভি নিউজকে বলেন, মৌসুমীর কাছ থেকে আমি যখন শুনতে পারি যে, জাকের শারীরিকভাবে অক্ষম, তখন জাকেরকে নিয়ে সিলেট ওসমানি মেডিকেলের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শাফিয়া রহমানের কাছে যাই। তিনি তাকে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে রিপোর্ট দেন।

এসএমপির বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খাঁন মুহাম্মদ মাইনুল জাকির আরটিভিকে বলেন, আদালতের নির্দেশ মতো মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।

পি

RTV Drama
RTVPLUS