logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ চৈত্র ১৪২৭

বহুরূপী ডিজে নেহার পরিবার, বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন 

Multiple DJ Neha's family, questions about the identity of the parents
ডিজে নেহা

মদপানের পর সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাধুরী এবং আরাফাত নামের দুইজনের মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো তাদের সঙ্গে থাকা মাধুরীর খুব কাছের বন্ধু রায়হান এবং আরেক বান্ধবী নুহাত আলম তাফসীর। যারা এই বিষয়ে ‘ধর্ষণ ও হত্যা’ মামলার আসামি। মামলাটির সূত্র ধরে আরটিভি নিউজ অনুসন্ধানে নামে। এই অনুসন্ধানে এবার বেরিয়ে এসেছে ডিজে নেহার পরিবারের বহুরূপী তথ্যজট। নেহা ওরফে ডিজে নেহার পরিবার নিয়েই তৈরি হয়েছে এক ভিন্নরকমের ধ্রুমজাল। এই জটিল পরিস্থিতির কূলকিনারা যেনো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিলো না! কে যে নেহার মা, আর কে যে নেহার বাবা, তা নিয়ে এবার প্রশ্ন উঠেছে। এমন বাস্তবতায় আরটিভি নিউজ চেষ্টা করেছে নেহার পরিবারের জটিল তথ্য বিভ্রাটের গভীরে ঢুকে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে। নেহার মা এতোটাই চতুর তিনি ঘন ঘন বাসা বদল করেন। এরমধ্যে কোনো বাসায় তিনি নেহার মা, আবার কোনো বাসায় তিনি নেহার খালা পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নেন ।

নেহার পরিবার:

আরটিভি নিউজের হাতে আসা ডকুমেন্ট বলছে, নেহার মায়ের জন্ম ১৯৮৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। তার পরিবার বলছে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই নেহার মায়ের বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পরই নেহার বাবা মারা যান। এর পরেই এক ব্যক্তির সঙ্গে নেহার মায়ের পরিচয় ঘটে। অতঃপর নেহার জন্ম। এমন প্রক্রিয়াতেই এক অস্বাভাবিক রকমের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন নেহার মা। নেহার মায়ের পরিবার অভিযোগ করছে, নেহার মায়ের সঙ্গে যার দ্বিতীয় বিয়ে হয় ওই ব্যক্তি খুবই দুষ্টু প্রকৃতির। যিনি পরনারী আসক্ত ছিলেন। যদিও আরটিভির হাতে এমন ধরণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় স্বামী নেহার মাকে, নেহাকে এবং নেহার ছোট বোনকে প্রচণ্ড মারধর করতেন, পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনও করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে উল্টো অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, নেহার মায়ের চারিত্রিক ত্রুটি থাকার দরুন তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি আজিমপুরে থাকেন এবং পুরান ঢাকায় ছোটখাটো ব্যবসা করেন।

নেহার প্রকৃত নাম কোনটি?

সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী মাধুরী এবং তাদের সঙ্গে থাকা আরেক তরুণ আরাফাত মারা যাওয়ার পর একটি মামলা দায়ের হয়। যে মামলার বাদি মাধুরীর বাবা। মামলাটি রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হয়। ওই মামলা বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নেহার পরিচয় দিতে গিয়ে ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ জানান, নেহার পুরো নাম ‘ফারজানা জামান নেহা’। অন্যদিকে আরটিভির অনুসন্ধানে নেহার পুরো নাম ‘ফারজানা হক’ পাওয়া গেছে। যা নেহার মা’ই একটি ডকুমেন্টে লিপিবদ্ধ করেছেন। একই ডকুমেন্টে নেহার মা তার ছোট মেয়ের নাম লিখেছেন ‘আনিকা হক’।

নেহার মা কে?

অনুসন্ধানে নেমে আরটিভি নিউজ প্রমাণ পায়, নেহার পরিবার বর্তমানে মিরপুর-২ এর আহম্মেদনগরের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় বসবাস করছে। তারা এ বাসায় ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে উঠেন। এই বাসায় নেহার মা পুলিশের ভাড়াটিয়া তথ্য নিবন্ধন ফরমে নিজের নাম লিখেছেন ‘ফারহানা মজুমদার’। আরটিভি নিউজের হাতে আসা তার জাতীয় পরিচয় বলছে, তার নামটি সঠিক। তার গ্রামের বাড়ি, যা স্থায়ী ঠিকানা- যশোর সদর, লোন অফিস পাড়া, উমেশ চন্দ্র লেন এলাকায়। এই বাসাটিতে তিনি নেহার মা পরিচয় দিয়ে উঠেন বলে জানা গেছে।

* উপরের ছবিটি নেহার মা ‘ফারহানা মজুমদারের’ (বাঁয়ে), ডানে তার ভোটার আইডিসহ অন্য ডকুমেন্টের অংশ বিশেষ।। ছবি: আরটিভি নিউজ

ঢাকার মিরপুরের বর্তমান বাসার ভাড়াটিয়া তথ্য নিবন্ধন ফরমে পরিবার সদস্যদের ঘরে নেহার মা প্রথমে স্বামীর নাম উল্লেখ করেন। এর পরেই প্রথম মেয়ে ‘ফারজানা হক’ এবং দ্বিতীয় মেয়ে হিসেবে ‘আনিকা হক’ এর নাম উল্লেখ করেন।

জটিলতা এখানেই যে, পুলিশ বলছে নেহার পুরো নাম ‘ফারজানা জামান নেহা’। অন্যদিকে নেহার মায়ের লেখা প্রমাণ বলছে নেহার নাম ‘ফরজানা হক’!

এই প্রতিবেদনটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে পড়লেই এসব জটিলতার জট খুলবে বলে আশা করা যায়।

নেহার প্রকৃত বাবা কে?

সরেজমিনে পাওয়া নেহার মায়ের লিখিত ডকুমেন্ট বলছে, নেহার বাবার নাম ‘মোজাম্মেল হক’। অনুসন্ধান বলছে, মোজাম্মেল হক আসলে নেহার বাবা বা তার মায়ের বিয়ে করা স্বামী নয়। এই ব্যক্তি চট্টগ্রামে থাকেন, মাঝে মাঝে নেহাদের বাসায় আসেন এবং কয়েকদিন আদর-আপ্যায়ন নিয়ে ফের চট্টগ্রামে চলে যান। নেহাদের বর্তমান বাসাটি তিনিই ভাড়া করে দেন, ওই বাসা ভাড়া নেওয়ার সময়ে বাড়িওয়ালা এবং নিরাপত্তা কর্মীর কাছে নেহার মাকে স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেন। সে হিসেবে তিনি নেহার বাবা পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নেন। একই সময়ে নেহার মাও মোজাম্মেল হককে নিজের স্বামী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই সময়ে নেহার মা জানান যে, তার স্বামী চট্টগ্রামে ইনকাম টেক্স নিয়ে কাজ করা একজন অ্যাডভোকেট। বস্তুত এটিই হলো পিলে চমকে ওঠার মতো ঘটনা। অনুসন্ধান বলছে, দীর্ঘদিন যাবত নেহার মায়ের সঙ্গে এই ব্যক্তির অবৈধ সম্পর্ক চলমান রয়েছে।

এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তথ্য পেয়েছে, নেহার জন্মদাতা বাবা মি. জামান রাজধানীর আজিমপুরে থাকেন এবং পুরান ঢাকায় ব্যবসা করছেন। তার সঙ্গে নেহার মায়ের দূরত্ব চলছে দীর্ঘদিন যাবত।

নেহা বিপথে যাওয়ার পেছনে পরিবারের যে ভূমিকা:

খুব সাধারণ ‘নেহা’ থেকে ‘ডিজে নেহা’ ওরফে ‘কুইন নেহা’ হয়ে ওঠার পেছনের ঘটনা খুঁজতে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়েছে আরটিভি নিউজ। এক পর্যায়ে কথা হয় নেহার বড় খালা শাহানাজ পারভীনের সঙ্গে। যিনি যশোর শিক্ষা বোর্ডে চাকরিরত আছেন। তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, নেহাকে আমি কোলে পিঠে করে বড় করেছি। ছোট বেলা থেকেই নেহা খুবই সহজ সরল প্রকৃতির মেয়ে। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে, এর পেছনে কোন পুরুষ মানুষতো অবশ্যই জড়িত আছে। বাচ্চা মানুষতো একটা ভুল করতেই পারে। নেহার এমন পথে পা বাড়ানোর পেছনে দায়িত্বের ক্ষেত্রে মায়ের কোনো অবহেলা ছিলো না, তবে বাবার অবহেলা আছে। বাবা খুব টর্চার করতো মেয়েটাকে। আমার বোনের মেয়েটা স্পষ্টবাদী, কোনো ছেলেকে হয়তো পাত্তা দেয় না, তাই শত্রুতা করে এমনটা করেছে। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে আঘাত পেতে পেতে এমন হয়ে গেছে যে, মেয়ে কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলে না। যা বলে সামনা সামনেই বলে বসে। মেয়ের ফুফুরাও তাকে মাথার মধ্যে জোরে জোরে আঘাত করতো, মারধর করতো।

আরটিভি নিউজের সঙ্গে কথা বলার সময়ে খুবই আবেগী হয়ে পড়েন নেহার খালা শাহানাজ পারভীন। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আসলে মেয়েটার কোনো দোষ নেই। বাবার অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণেই পুরুষবিহীন সংসার ছিলো আমার বোনের। পরিস্থিতিতে মেয়েটা এমন হয়ে যায়। নেহা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমার বোন খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমার বোনটাও জটিল রোগে আক্রান্ত। তারা আসলেই খুব সমস্যার মধ্যে আছে। পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই লাঠি ঝাটা খেয়েছে! তাদের ভাগ্যটাই খারাপ।

নেহার খালা আরও বলেন, অভাব অনটনের কারণে নেহার ছোট বোন আনিকা আমার কাছেই বড় হয়েছে। তাকে আমি বড় করেছি। সে এখনও পড়াশোনা করছে। গত ডিসেম্বরে নতুন বাসায় ওঠার পর আনিকা আমার কাছ থেকে তার মায়ের কাছে চলে যায়। যেহেতু আমার একমাত্র ছেলে বিয়ের পর তাকে মোটেও সহ্য করতে পারছিলো না। তাই আনিকাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এদিকে আমিও অসুস্থ হয়ে পড়েছি।

খালাতো ভাই বিশাল বিভ্রাট:

নেহার খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া শাফায়াত জামিল বিশাল মূলত তাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় নয় বলে জানান নেহার খালা। তিনি বলেন, নেহারা আগে যে বাসায় ভাড়া থাকতো ওই বাসার এক মহিলাকে ধর্মের বোন ডেকেছে আমার বোন। সে থেকেই নেহা ও বিশাল খালাতো ভাইবোন পরিচয়ে একসঙ্গে চলাফেরা করতো, ঘুরে বেড়াতো। বিশাল উশৃঙ্খল প্রকৃতির ছেলে। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে- বিশালের হাত ধরেই নেহা এমন পথে পা বাড়ায়। বিশালের মা খুবই খারাপ প্রকৃতির মহিলা। জানতে পেরেছি, বিশালের মা সম্প্রতি পঞ্চম বিয়ে করেছেন এক ব্যবসায়ীকে। এই মহিলা একের পর এক টাকাওয়ালাদের বিয়ে করে ব্লাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়, অবশেষে মোটা দাগে ধার্য করা কাবিনের টাকাও। এখন ছেলে বিশালসহ বিদেশে পাড়ি জমানো ধান্দায় আছে সে।

বোন জানে না বোনের স্বামী কে!

নেহার মা ফারহানা মজুমদারের বড় বোন শাহনাজ পারভীনকে তার বোনের স্বামীর নাম পরিচয় জানেন না! বোনের স্বামীর নাম জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বর্তমান বাসার ভাড়াটিয় তথ্য নিবন্ধন ফরমে স্বামী হিসেবে উল্লেখ থাকা ‘মোজাম্মেল হক’ এর বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে তিনি বিব্রত হয়ে বলেন, ‘আমিতো যশোরে থাকি। তার বিষয়ে তো বলতে পারছি না। এটা সেই বলতে পারবে, আমি তো ওর বাসায় যাই না। আমি একটা কথাই বলছি- একটা পরিবারে পুরুষ গার্ডিয়ান না থাকলে যা হয়, তা আপনারাই ভালো জানেন। এ বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই, আপনারাই বুঝে নেন। পারলে ওদের কাছেই শুনে নেন।’

নেহা ও তার মায়ের পরিচয় বিভ্রান্তি:

ডিজে নেহাদের আগের বাসার ঠিকানা- পশ্চিম মনিপুর, মিরপুর-২ এর একটি বাসার ৪র্থ তলা। ২০১৯ সালের যখন ওই বাসাটিতে ভাড়া ওঠেন নেহার মা ফারহানা মজুমদার, তখন ওই ভবনের লোকদের কাছে তিনি নেহাকে বোনের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি নিজেকে নেহার খালা পরিচয় দিতেন। ওই বাসায় প্রায়ই বোরখা পড়া এক মহিলা আসতো, যাকে নেহার মা পরিচয় দেওয়া হতো। বলা হতো, পারিবারিক জটিলতার কারনে নেহার খালার বাসাতেই থাকছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পারিবারিক রিকশা চালক সুমনও বিভ্রান্তিতে পড়ে যেতো। তবে এ নিয়ে ওই রিকশা চালক মুখ খুলতে চাননি।

নেহার মায়ের জাতীয় পরিচয় পত্রের বয়স নিয়ে সন্দেহ:

নেহার মা ফারহানা মজুমদারের জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নিজের বয়স উল্লেখ রয়েছে তিনি ১৯৮৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেছেন। সে হিসেবে আজ পর্যন্ত ওনার বয়স ৩১ বছর ৪ মাস ৮ দিন চলছে। অন্যদিকে মামলার এজহারে নেহার বয়স আনুমানিক ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মেয়ের সাথে মায়ের বয়স মাত্র ৬ বছর পার্থক্য। এরমধ্যে নেহার ছোট একটি বোনও রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাত্র ৬ বছর বয়সে কেমন করে তিনি সন্তান জন্মদান করলেন? এর প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা মনের করছেন তিনি হয় বয়স লুকিয়েছেন, অন্যথায় ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমে যে ভোটার আইডি’র ফটোকপি যুক্ত করেছেন, তা ভুয়া বা জাল।

পুলিশের বক্তব্য:

আজ সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সংশ্লিষ্ট মামলার হালনাগাদ তথ্য জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সাজেদুল হককে কল দেওয়া হলে তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, এই মামলার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। যা বলবেন স্যাররাই বলবেন।

এরপর সন্ধ্যা ৬ টা ১১ মিনিটে কল দেওয়া হয় তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদকে। তবে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।

উল্লেখ্য, এই মামলায় আসামি নেহা বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) তার পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হবে। এরপরই তাকে আদালতে হাজির করবে পুলিশ।

কেএফ/এমকে

RTV Drama
RTVPLUS