logo
  • ঢাকা বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

‘বেতন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হলেও দুর্নীতি বন্ধ হবে না’

Even,salary, doubles, triple, corruption, not stop
‘বেতন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হলেও দুর্নীতি বন্ধ হবে না’

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমেনি। বেতন বাড়ানো হলেও ঘুষের পেছনে ছোটা বন্ধ হয়নি। বরংচো বেতন বাড়ানোর সঙ্গে তাদের ঘুষের পরিমাণও যেন বাড়ছে। তাই তো জনসাধারণ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞদের মনেও ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ দেখা গেছে। তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ালেও জনগণের ভোগান্তি কমেনি এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ হয়নি। করোনা মহামারি সময়ে সেবা খাতে বড় বড় দুর্নীতির দৃশ্যগুলো মানুষের সামনে প্রকাশ পেয়েছে।

সম্প্রতি আমলাদের দুর্নীতি ও বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী প্রকাশেই কথা বলছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন- রাজনীতিবিদরা নয়, বিদেশে বড় অংকের অর্থ পাচারীদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের সংখ্যাই বেশি। গোপনে কানাডার টরোন্টোতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। আমার ধারণা ছিল রাজনীতিবিদদের সংখ্যাই বেশি হবে। কিন্তু যে তথ্য পেয়েছি তাতে অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাড়িঘর সেখানে বেশি আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার ও বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের ফিরিয়ে এনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সম্পদ ফেরত আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় সংস্থাটি। কিন্তু পরবর্তীতে দুর্নীতিবাজদের তালিকা প্রকাশ কিংবা অর্জিত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। দুদক মনে করে, রাজনীতিবিদ আর আমলাদের যোগসাজশেই দুর্নীতি হয়। রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অনৈতিক যোগসাজশ ভাঙতে না পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা অবৈধভাবে কেমন অর্থ আয় করছে। দেশ এবং দেশের বাইরে বছরে অবৈধ আয়ে কি পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে সে ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব দেশের কোনো সংস্থার কাছেই নেই। তবে বেসরকারিভাবে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশ থেকে অর্থ পাচারের একটি ধারণা দিয়েছেন। ১১ বছরে দেশ থেকে কমপক্ষে ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাচার হয় ৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু ২০১৪ সালেই পাচার হয় ৯ মিলিয়ন ডলার। এভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গত মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে ‘উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের খসড়া রূপরেখা চূড়ান্তকরণ’ কর্মশালা বলেন, প্রকল্পের কেনাকাটায় টিমওয়ার্ক দুর্নীতি হয় এটা আমার ধারণা, তবে ব্যক্তিগত দুর্নীতি বেশি হয়। কিছু খাতে দুর্নীতি অবশ্যই হচ্ছে। তাদের কাছে দুর্নীতি করার ব্যবস্থাও আছে। দুর্নীতির নিশ্চয় একটা ভিত্তি আছে তা না হলে এটা নিয়ে এতো আলোচনা কেন হবে। দুর্নীতি নিয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি, ঘুষ এবং অনিয়ম কমে আসবে সেটি কখনই সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবীর কোনও দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমাতে পারেনি। জনগণকে সেবা দেওয়ার নামে বিভিন্নভাবে সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি করে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইচ্ছে করলেই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ধরতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশল এবং ক্ষমতাসীন দলের কাছের লোকজন হওয়ায় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। তবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের যেসব ঘটনা আদালতে আসছে সেগুলো সিন্ধুতে বিন্দুর মতো। বেশিরভাগ দুর্নীতির ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে’র (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড: ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় প্রমাণিত হয়েছে, যে এতদিন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচারের যে অভিযোগ করা হচ্ছিলো- সেটি সত্যি। সরকারি কর্মকর্তারা অনেকে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা বিদেশে যাতায়াত করেন। প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে পড়াশোনা বা চিকিৎসাসহ নানা কারণে যেতে পারেন। পাচারের সেটা একটা অন্যতম মাধ্যম।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক বলেন, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরা দেশে অর্থ রাখার তুলনায় বিদেশে অর্থপাচারে বেশি নিরাপদ মনে করেন। এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে, আর রাজনীতিবিদরা ব্যবসায় ঢুকে পড়েছে। তাদের সহযোগী হয়েছে আমলারা। এ মিলে তৈরি হয়েছে গণবিরোধী সিন্ডিকেট।

অর্থনীতিবিদ ড. আবু আহমেদ আরটিভি নিউজকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ালে দুর্নীতি কমবে এটির সঙ্গে আমি একমত না। বাংলাদেশে অবৈধ আয়ের অনেক উৎস রয়েছে। এখানে বেতন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ করে দিলেও দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন দল বা সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই দেশে দুর্নীতি কমাতে চায় তাহলে দুর্নীতি করার সেক্টরগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে যারাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তারা যতই ক্ষমতাধর হোক তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

এফএ

RTV Drama
RTVPLUS