logo
  • ঢাকা বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

সূর্য ওঠার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখা করতে আসে তার সাথে (ভিডিও)

Before the sun rises, flocks of birds come to see him
সূর্য ওঠার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখা করতে আসে ট্র্যাফিক সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের সাথে
চুয়াডাঙ্গার ট্র্যাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস। ছেলেবেলা থেকেই পাখিদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তার। পুলিশে চাকরির পরও পাখিদের সাথে অটুট রয়েছে বন্ধুত্ব। চুয়াডাঙ্গায় যোগদানের পর থেকে নিয়মিত পাখিদের খাবার খাওয়ান তিনি। প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা দেখা করতে আসে তার সাথে। দল বেঁধে আসে দিনের প্রথম আহারের আশায়। পাখিপ্রেমী মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের চারপাশে তখন পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ ও কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত। জেলার শহীদ হাসান চত্বর ও রেল-বাজারে নিত্যদিনের অতিথি পাখিদের আপ্যায়নে নিমগ্ন হন তিনি। ইতোমধ্যে পাখিদের বন্ধু হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছেন সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস।

পাখিরা হোটেল-রেস্তোরাঁর ফেলে দেয়া খাবার খেত। মহামারি করোনা ভাইরাসের সময় জেলায় লকডাউন শুরু হলে হোটেল রেস্তোরাঁসহ সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাতে কষ্ট হলে অনেকটা অনাহারেই থাকতো পাখিরা। তখন তিনি দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়ানো শুরু করেন। এবার শীতে অতিথি পাখিদের নিরাপদ বাসস্থান গড়ে তোলার জন্য গাছে বেঁধে দিচ্ছেন নীড়। পাখিদের প্রতি তার ভালোবাসার গল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গার গণ্ডি পেরিয়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। তাই তো এখন পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে এলাকাবাসীর।

মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার চেঙ্গারডাঙ্গা গ্রামে। তার বাবার নাম প্রবিত বিশ্বাস। পরিবারের ৪ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি মেজো। ২০১১ সালের ৩ জুলাই ঝিনাইদহে পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন। সাতক্ষীরায় ট্র্যাফিকে বদলি হন ২০১৫ সালের প্রথম দিকে। পরে চুয়াডাঙ্গা ট্র্যাফিক পুলিশে বদলি হন ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ সালে। সেই থেকে চুয়াডাঙ্গার পাখিরা তার বন্ধু হয়ে ওঠে। সকালে তাকে দেখলেই দল বেঁধে ছুটে আসে পাখিরা। মহামারি করোনার প্রথম দিকে হোটেল রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ ছিল। সেই সময় থেকেই পাখিদের আহারের কথা ভেবে দোকান থেকে খাবার কেনেন তিনি। সকাল-দুপুর দু’বেলায় পাখিদের খেতে দেন চাল, শস্যদানা ও চানাচুর। পাখির সাথে তার গভীর প্রেম দেখে অবাক হন পথচারীরা। 

চুয়াডাঙ্গা শহরের বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন ও আব্দুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন পাখিদের সাথে ওই পুলিশ কর্মকর্তার কর্মযজ্ঞ দেখতে আসেন। তারা জানান, পাখির সাথে পুলিশের এমন বন্ধুত্ব কল্পনা করা যায় না। নিয়মিত পাখিদের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করেন তিনি। এসময় পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় চারপাশ। পাখির সাথে তার বন্ধুত্ব দেখে মন ভরে ওঠে সবার। পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের পাখির প্রতি ভালোবাসা আমাদের পশু-পাখিদের প্রতি মানবিক হতে শিক্ষা দেয়। 

শীতের শুরু থেকে অতিথি পাখিদের অভয়াশ্রমের কথা ভেবে গাছের ডালে ডালে নীড় বাঁধতে শুরু করেন মৃত্যুঞ্জয়। জেলা শহরের প্রতিটি গাছের ডালে ডালে নিজ উদ্যোগে এসব নীড় বেঁধে দিচ্ছেন তিনি। ‘পুলিশের বিচরণ যেখানে, পাখিদের অভয়ারণ্য সেখান’ - এ স্লোগানে পাখিদের বাসা গড়ার উদ্যোগ নেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। জেলার ৫টি থানা, একটি ফাঁড়ি ও ৩০টি ক্যাম্প ও ৩৯টি স্থাপনায় পাখিদের অবাধ বিচরণে পাঁচ হাজার মাটির কলস ও বাঁশের তৈরি বাসা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বাস করতে পারবে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার পাখি। পুলিশ লাইন, পুলিশ সুপারের বাসভবন, পুলিশ পার্কসহ শহরের পাখিদের আনাগোনার স্থানে নিজ হাতে পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। 

সার্জেন্ট মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস জানান, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’- স্বামী বিবেকানন্দের এই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পাখিদের প্রতি স্নেহ জন্ম নেয় আমার। করোনার শুরুতে যখন লকডাউন চলছিল তখন হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ ছিল। এতে করে পাখিদের আহার জোগাতে অনেক কষ্ট হয়। সেই সময় দোকান থেকে খাবার কিনে পাখিদের খাওয়ার ব্যবস্থা করি। পাখিদের খাওয়ানোর মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি পাই আমি। এবার পাখিদের নিরাপদ বাসস্থান গড়ার জন্য নিজ থেকেই এমন উদ্যোগ নিয়েছি। ছোট থেকে পাখিদের প্রতি ভালোবাসা ছিল। তখন থেকে বাড়িতে ঘর তৈরি করে পাখি পোষা শুরু করি। ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় চাকরির সময়ও বাড়িতে পাখি পোষতাম। চুয়াডাঙ্গায় আসার পর শহীদ হাসান চত্বরে পাখিদের খাবার খাওয়াতাম। এখন মাঝে মাঝে আমার এই কাজে মেয়ে শ্রেয়া বিশ্বাস সহায়তা করে।

ঝিনাইদহ প্রগতি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী শ্রেয়া বিশ্বাস জানান, বাবার সাথে পাখিদের খাবার দিতে খুব ভালো লাগে। তাদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। পাখিদের কিচিরমিচির গান শুনতেও ভালো লাগে। বড় হয়ে বাবার মতো আমিও পাখিদের নিয়মিত খাবার দেব।

পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জানান, পুলিশের কাজ শুধু মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা নয়, মানবিক কাজগুলোতেও অংশ নেওয়া। সেই কাজের অংশ হিসেবে পশু-পাখিদের প্রতি ভালোবাসার ওই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। পুলিশ এখন শুধু জনগণের নয়; প্রাণিদেরও। পাখিদের বন্ধু মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের মতো সকলকেই ওই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয়ের এমন উদ্যোগ জৈববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা শাখার সভাপতি পরিবেশবিদ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান বিশ্বের জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। একারণে পাখিরা মারাত্মক খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস যুগোপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।  

এসআর/পি
 

RTV Drama
RTVPLUS