logo
  • ঢাকা বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

হাতিয়ায় জলবায়ু প্রকল্প: নামেই থ্রি-এফ মডেল পুকুর, বাস্তবে নেই

Climate project in Hatia: Three-F model pond by name, not in reality
হাতিয়ায় জলবায়ু প্রকল্পের থ্রি-এফ মডেল পুকুরের চিত্র, ছবি: প্রতিনিধি
বনবিভাগের জায়গায় সবুজ বেস্টনির পরিবর্তে তৈরি করা হয়েছে থ্রি-এফ মডেল পুকুর। যেখানে থাকার কথা পাড়ে বিভিন্ন ফল ফলাদির গাছ, পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষের অপরূপ দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে এই দৃশ্যের চিহ্ন কোথাও নেই। বনের পাশে বসবাস করা মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বনের উপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বুড়িরচর ও জাহাজমারা ইউনিয়নে বনবিভাগের জায়গায় একশত পুকুর খনন করা হলেও এই প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের উদাসীনতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি এখন উপকারভোগীদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ইউএনডিপির আর্থিক সহযোগিতায় উপকূলীয় বনায়ন ও পুনঃবনায়নে কমিউনিটি ভিত্তিক অভিযোজন (আইসিবিএ-এআর) নামক প্রকল্পটি ২০১৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রতি হেক্টর ভূমিতে ৫টি পুকুর খনন করা হযেছে। এর মাধ্যমে নোয়াখালী হাতিয়া উপজেলায় একশত ও ভোলা জেলার তজমুদ্দিন উপজেলায় ৪০টি পুকুর খনন করা হয়েছে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল, জীবিকার বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে জলবায়ুজনিত বিপদাপন্ন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় বনের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভিতরে পুকুর তৈরি করে সেখানে মাছচাষ ও পুকুরপাড়ে শাক-সবজি চাষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। যা জলবায়ুজনিত বিপদাপন্ন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন করবে।

এই প্রকল্পের একটি বিশেষ মডেল হলো ‘বনজ, ফলদ, মৎস্য (থ্রি-এফ) মডেল’। প্রতিটি মডেল বা পুকুরের দৈর্ঘ্যে ২৫২ ফুট এবং প্রস্থে ৪৯ ফুট। পুকুর হবে ৮ ফুট গভীর ও পাড়ের উচ্চতা হবে ৮ ফুট। প্রতিটি পুকুর খননের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৮৯ হাজার টাকা করে। মডেলটি ম্যানগ্রোভ বনের মাঝখানে পরিত্যক্ত বনভূমিতে নির্মাণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে এই নিয়ম মানা হয়নি অনেকাংশে। কিছু কিছু জায়গায় বন কেটে পুকুর খনন করা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের বড়দেইল এলাকার বেড়ির বাইরে বনবিভাগের সাগরিয়া রেঞ্জের চর আলিম বিটের জায়গায় বাগানের মধ্যে প্রথমে ১০টি পরে বাগানের বাইরে দুই ভাগে ৫৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। যা পরে এক একটি পুকুর এক একটি ভূমিহীন পরিবারকে দেওয়া হয় এর সুবিধা ভোগ করার জন্য। 

বাগানের বাইরের ৫৫টি থ্রি-এফ মডেল পুকুরের একেবারে পূর্বপাশে অবস্থিত ১৫ নম্বর পুকুরটির। কাগজে কলমে থ্রি-এফ মডেল বলা হলেও বাস্তবে ফল-ফলাদি, মাছ ও গাছের কোনো অস্তিত্ব নেই এই পুকুরে। জোয়ারের পানিতে ভেঙে সমতলের সাথে মিশে গেছে এর তিনটি পাড়, পুকুরে নেই পানি। এই মডেল পুকুরের মালিক বুড়িরচর ইউনিয়নের পূর্ব বড়দেইল গ্রামের আলাউদ্দিন মাঝি (৩৫)। জোয়ারের পানিতে পাড় ভেঙে একই অবস্থা বাগানের বাইরের ৫৫টি পুকুরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত ১৫টি পুকুরের। 

এছাড়া অন্য ৪০টি পুকুর খনন করা হয়েছে বাগানের বাইরে বনবিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গায়। এই জায়গায় উপকূল রক্ষায় সবুজ বেস্টনি তৈরি করার কথা থাকলেও আরও ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে থ্রি-এফ মডেল পুকুর খনন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে এর বিপরীতচিত্র। এসব পুকুর সুবিধাভোগীদের দেওয়া হলেও সঠিক তদারকি ও সঠিক পরিকল্পনা না থাকার কারণে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

চরআলিম বিটের বাগানের বাইরে অবস্থিত ৫৫ নম্বর থ্রি-এফ মডেল পুকুরের মালিক মহিন উদ্দিন (৩০) জানান, প্রকল্পের নিয়মানুযায়ী পুকুরের পাড় সমতল থেকে ৮ ফুট উচ্চতা করার কথা। কিন্তু বনবিভাগ মাত্র ৪-৫ ফুট উচ্চতায় পাড় করে দায়সারা কাজ করার ফলে জোয়ারের পানিতে অধিকাংশ পুকুরের এখন বেহাল দশা। অন্যদিকে মহিন উদ্দিন ও অন্যান্য উপকারভোগীরা নিজ শ্রমে পুকুরপাড় তৈরি করে নিলে খরচ দেওয়ার কথা দিলেও বাস্তবে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে।     

পূর্ব বড়দেইল গ্রামের শাহজাহানের ছেলে দিলদার উদ্দিন (৩০) এর সাথে আলাপকালে তিনি জানান, এসব পুকুর খনন করার পর বিভিন্ন দপ্তর থেকে উপকারভোগীদের মাছের পোনা, গাছের চারা ও বীজ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম বছর সবাই আন্তরিক থাকলেও পরে আর খোঁজ খবর নেয়নি। 

প্রকল্প অনুযায়ী বনের মধ্যে পরিত্যক্ত জায়গায় এই একশতটি পুকুর খননের কথা থাকলেও হাতিয়ায় অধিকাংশ পুকুর খনন করা হয়েছে বনের মধ্যে। কিছু কিছু খনন করা হয়েছে বন কেটে। এর মধ্যে ফল-ফলাদির জন্য কৃষিবিভাগ, বনায়নের জন্য বনবিভাগ ও মাছ চাষের জন্য মৎস্যবিভাগ বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু তাতেও ছিল সমন্বয়হীনতা। 

হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম জানান, বনবিভাগ ও ইউএনডিপির প্রতিনিধিদের সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী উপকারভোগীদের মাঝে বিভিন্ন গাছের চারা ও কৃষি উপকরণ কিতরণ করা হয়েছে। এখন কেউ যদি সঠিক ভাবে তা না লাগিয়ে থাকেন আমাদের কিছুই করার নেই। একইভাবে দায়সাড়া উত্তর দেন বর্তমানে মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন। 

এই প্রকল্পের ইউএনডিপির কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, কৃষি, মৎস্য ও বনবিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। আমরা শুধু সরকারের এসব বিভাগের মধ্যে সমন্বয়টা করে থাকি। প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের বিষয়ে তিনি কিছু বলেতে রাজি হননি।

প্রকল্পটি তদারকি করার জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটি রয়েছে। এই কমিটির সভাপতি পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এই প্রকল্প সম্পর্কে আলাপ কালে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেনে জানান, থ্রি- এফ মডেল পুকুর এই প্রকল্পটি সম্পর্কে অনেক আলোচনা-সমালোচনা আমি আসার পর থেকে শুনতেছি। আমি একটি মিটিং কল করেছি। মিটিংয়ে এই প্রকল্পের সাথে জড়িত সকলকে উপস্থিত থাকতে বলেছি। প্রয়োজনে সাংবাদিকরা মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারেন।
পি
 

RTV Drama
RTVPLUS