logo
  • ঢাকা বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭

ভৈরবে হঠাৎ বেড়ে গেছে মাদক

ভৈরবে হঠাৎ বেড়ে গেছে মাদক
ফাইল ছবি


ভৈরবে গেল এক মাসে প্রায় এক হাজার বোতল ফেন্সিডিল ও ৪শ’ ইয়াবাসহ ১০ জন আটক

ভৈরবে হঠাৎ বেড়ে গেছে মাদক! বেড়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। এ কারণে পুলিশের হাতে শত শত ফেন্সিডিলসহ বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী আটক হয়েছে। গেল এক মাসে শুধু মাত্র ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও পিকআপ ভ্যান তল্লাশি করে বিপুল ফেন্সিডিল আটক করেছে পুলিশ। এতে ভাবিয়ে তুলছে সুশীল সমাজের লোকজনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। ধারণা করা হচ্ছে ভৈরবসহ পাশের জেলা, উপজেলাগুলোতে মাদক ব্যবসায়ীরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে। 

সড়ক রেল ও নৌ পথের যোগাযোগ সমৃদ্ধ শহর এবং দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বন্দর নগরী ভৈরব। ফলে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই নানা ধরণের মাদকদ্রব্য প্রবেশ করে এই শহরে। যার কারণে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ভৈরবকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসায়ীরা। 

এক সময় মাদকের ‘স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল ভৈরব। ফলে শহরের রেলওয়ে স্টেশনের পেছনে অর্থাৎ পঞ্চবটী পুকুরপাড়, আমলাপাড়া, জগন্নাথপুর, কমলপুর, চন্ডিবের গ্রামের পাড়া মহল্লায় মাদক ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে। এমন কি বাদ যায়নি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলো। আর গ্রামাঞ্চলের মধ্যে অন্যতম এলাকা উপজেলার শ্রীনগর। হাত বাড়ালেই মিলত ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজা। আর এই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ছিলেন প্রায় তিন শতাধিক মাদকের ডিলার। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিক বাড়ি-গাড়ি এমনকি কোটি কোটি টাকার মালিকও বনে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন সময় প্রশাসনের অভিযানে একাধিক মাদক ব্যবসায়ী মাদকদ্রব্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হয়ে জেলে গেছেন। কিন্তু তারা জেল খেটে বের হয়ে ফের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। অবাক করার বিষয় হলো তারা পাল্টে ফেলেছেন ব্যবসার কৌশল। নিত্য নতুন কৌশল আর অভিনব পদ্ধতির কারণে কেউ কেউ বছরের পর বছর ধরে মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছেন। যার ফলে গেল ৬ মাসে শ্রীনগর সাদেকপুর কিংবা শিমুলকান্দি ও আগানগর থেকে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। আর এ সুযোগে তারাও রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

শুধু তাই নয় মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় খোদ পুলিশের সোর্সেরও নাম রয়েছেন। তাছাড়া গেল বছর দেড়েক আগেও ভৈরব থানায় প্রতি মাসে মাদকের মামলাই বেশি নথিভুক্ত করা হতো। কিন্তু বর্তমানে থানায় মাদক মামলার সংখ্যা নগণ্য। সমাজের বিজ্ঞজনরা ধারণা করছেন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক ব্যবসা হচ্ছে জোরেশোরে।  

কথা হয় উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপুর গ্রামের আসমা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, তার স্বামী একজন প্রবাসী। তার একমাত্র ছেলেটি অনার্স শেষ করে বাড়িতেই আছে। কিন্তু তিনি সব সময় ভয়ে থাকেন পাড়া কিংবা মহল্লার কোনও বাজে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয়ে যায় কি না।

পৌর শহরের হোসেন মিয়া জানান, ছেলেদের নিয়ে টেনশনে থাকি। কোন সময় কোন অঘটন ঘটে। কেননা, এখানে হাত বাড়ালেই মিলে মাদক। তাই, তিনি থানা পুলিশকে সমাজে আরও নজরদারী বাড়াতে দাবী জানান।

পুলিশ জানায়, শহর কিংবা গ্রামের পাড়া-মহল্লায় তাদের অভিযান অব্যাহত আছে। গেল মাসের ২৯ অক্টোবর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শহরের দুর্জয় মোড় থেকে স্থানীয় এবং সার্জেন্ট পুলিশের সহায়তায় ২৫০ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। এসময় মাদক পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল আটক করে পুলিশ। এর এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ চলতি মাসের ৭ নভেম্বর একই সড়কের নাটালের মোড় থেকে একটি প্রাইভেটকারে মাদক পরিবহণের সময় ২৮০ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। এর পরের সপ্তাহে ১৬ নভেম্বর শহরের পলতাকান্দা এলাকা থেকে ১৯৭ বোতল ফেন্সিডিলসহ আরও এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। এর দুই দিন পর ১৮ নভেম্বর শহরের চন্ডিবের এলাকা থেকে সাব-ইন্সপেক্টর মো. রফিকুল ইসলাম ৩৮০ পিস ইয়াবাসহ এক যুবককে আটক করে। এর পরদিন ১৯ নভেম্বর শহরে প্রবেশের আগ মুহূর্তে আশুগঞ্জ টোলপ্লাজা এলাকা থেকে ভৈরবের প্রভাবশালী কাউন্সিলর মোশারফ হোসেন মিন্টুর দুই ছেলে এবং কথিত এক সাংবাদিকসহ ৪ জনকে ৬৬ বোতল ফেন্সিডিল ও একটি দামি প্রাইভেটকারসহ আটক করে র‌্যাব সদস্যরা।

গত মঙ্গলবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নাটালের মোড় থেকে ৪৮ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। এছাড়াও গেল বৃহস্পতিবার সকালে একই স্থান থেকে (নাটালের মোড়) অভিনব কায়দায় ৩টি গ্যাস সিলিন্ডারের মাধ্যমে ১২৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ একজনকে আটক করে সাব-ইন্সপেক্টর মতিউজ্জামান। 

পুলিশের হাতে আটক হওয়া সবার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা দিয়ে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও মাদক আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি দেলোয়ার এবং হানিয় নামে দুইজন এসআইকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করেছেন কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ।

মাদকের বিষয়ে জানতে চাইলে ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ শাহিন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ সব সময় সজাগ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট রয়েছে। এসব স্থানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। একের পর এক মাদকের চালান ধরা পড়ছে। একই সঙ্গে শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লায়ও পুলিশের নজরদারি রয়েছে। সমাজে যারা মাদক ব্যবসা করবে তাদের কোনও ছাড় নেই। 

কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ জানান, মাদক নির্মূলে পুলিশ সব সময় তৎপর রয়েছে। তবে, থানায় মাদক মামলা কমে যাবার সঙ্গে ভৈরবে মাদক বাড়ার কোনও সম্পর্ক নেই। 

জিএম/এসএস

RTV Drama
RTVPLUS