logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ৯ মাঘ ১৪২৭

বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা, অভিভাবক মহলে উৎকণ্ঠা

Adolescents are involved in various crimes, anxiety in the guardianship
বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা (ফাইল ছবি)
পৃথিবীর সকল মা-বাবাই চান তাদের ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে আলোকিত মানুষ হবে। সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে দিন-রাত পরিশ্রম করেন তারা। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন পেক্ষাপটে পাল্টে যাচ্ছে সে চিত্র। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সঙ্গদোষে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। 

সম্প্রতি শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে উঠতি বয়সের কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। কখনও ওরা সংঘবদ্ধ হয়ে ধর্ষণ করছে। চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে ডাকাতি, মাদকপাচারের মতো মারাত্মক অপরাধের কাজে উঠতি বয়সের কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার খবর শোনা যাচ্ছে। এসব কিশোররা কখনও ঘটাচ্ছে মারামারি, খুনাখুনির মতো ঘটনা। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও বেড়ে চলেছে কিশোর অপরাধের মাত্রা। জেলায় গত এক বছরে নানান অপরাধের দায়ে মামলা হয়েছে ৪১ জন কিশোর-কিশোরীর বিরুদ্ধে। এ সকল মামলায় অনেকে পলাতক থাকলেও অধিকাংশ কিশোর-কিশোরীরা জামিনে রয়েছেন। আবার অনেককেই পাঠানো হয়েছে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসনের অভাবের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, মাদকের কালোছায়া, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট, ভার্চুয়াল জগতের নেশায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠার কারণেই এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মতে কিশোর অপরাধ বাড়ার পেছনে বড় ভাই নামক গ্যাং লিডাররা অনেকটা দায়ী। এসব বড় ভাইয়েরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে কিশোরদেরকে ব্যবহার করছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে। উঠতি বয়সের এসব তরুণ হঠাৎ ক্ষমতার সংস্পর্শে এসে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। 

জেলা পুলিশের তথ্য মতে, গত এক বছরে জেলায় হত্যা, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ ৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় ১১টি, কসবা থানায় সাতটি, নবীনগর থানায় পাঁচটি, নাসিরনগর থানায় দুটি, সরাইল থানায় সাতটি, বিজয়নগর থানায় সাতটি ও আখাউড়া থানায় দুটি মামলা রয়েছে। এসব অপরাধে ৩১ জন কিশোর জামিনে আছে। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ছয়জন রয়েছে। এদের মধ্যে সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের মীরহাটি গ্রামে ১৪ বছর বয়সের কিশোর সুমন প্রতিবেশী আট বছরের এক শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ তাকে আটক করে আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠায়। বর্তমানে সে জামিনে রয়েছে। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওই কিশোরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। 

অপর এক কিশোরী তানিয়া (১৫) পারিবারিক কলহের জের ধরে গত বছরের ২ নভেম্বর নিজ ঘরেই দা-বটি দিয়ে খুন করে নিজের মাকে। ঘটনার শুরুতে বিষয়টি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও পুলিশের তদন্তে বেড়িয়ে আসে কিশোরীর হাতে মায়ের হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য। 

জেলা শহরের দাতিয়ারা এলাকায় বাসিন্দা মোমেনুর রহমান। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাতে শহর থেকে বাসায় যাওয়ার সময় তিনজন কিশোর তাকে রাস্তায় আটক করে। পরে ধারালো চাকু দিয়ে তার কাছ থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় চিৎকার দিলে র্যা বের টহল গাড়ি এসে পড়ায় তাদেরকে আটক করে ফেলে। তাদের কাছ থেকে চাকু ও সিমবিহীন মোবাইলসহ নগদ ৩৮ হাজার ৩০০ টাকা জব্দ করে। পরে সদর মডেল থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় মোমেনুর রহমান সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

একাধিক অভিভাবক জানান, যে হারে কিশোর অপরাধ বাড়ছে তা মূলত সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে সন্তানরা যখন বাড়ির বাইরে যায়, তখন একটা অজানা আতঙ্ক মনের ভিতর কাজ করে। কারণ কিশোররা অপরিণত বয়সের হওয়ায় যে কোনো প্রলোভনে কিছু না বুঝেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এক শ্রেণীর মানুষ এসব কোমলমতি কিশোরদের দিয়ে বিভিন্ন অন্যায় কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। এতে করে কিশোররা অনেকটা অজান্তে অন্ধকার জগতে চলে যাচ্ছে। কিশোর অপরাধ প্রতিহত করতে হলে প্রথমে কিশোর অপরাধ কেন হচ্ছে? কারা এর পিছনে দায়ী তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রকৃত দায়ীদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা গেলে কিশোর অপরাধ কমে আসবে। 

জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি রতন কান্তি দত্ত বলেন, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ক্রীড়া ক্লাব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই। ফলে সব কিশোর-কিশোরীরা মোবাইলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কিশোর অপরাধের তিনটি দিক রয়েছে। সামাজিক, মনস্তাত্বিক ও আইনগত। এ ঘটনাগুলো বাড়ার পিছনে যে দৃষ্টিভঙ্গিগুলো লক্ষ্য করা যায়, তা হলো কিশোর অপরাধের যথাযথ বিচার হচ্ছে না। আইনের যে বিধান রয়েছে তা সঠিক প্রয়োগ করা হচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকলকে যার যার অবস্থান থেকে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। 

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. রইছ উদ্দিন বলেন, কিশোররা যদি অপরাধে জড়িয়ে যায় সমাজের বড় একটা অংশ অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। কিশোর অপরাধগুলোকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক এলাকার অপরাধীকে চিহ্নিত করে সঙ্গে সঙ্গে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আইনের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন বৃদ্ধি করে সকলে সম্মিলিত চেষ্টা চালালে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পি
 

RTV Drama
RTVPLUS