logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বেসরকারিতে সরকারি ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্য, রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি

The commission of government doctors in the private sector is a trade-off, tampering with the patient's life
ফাইল ছবি
কমিশন বাণিজ্য সরকারি চিকিৎসকরদের যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি বেনামি হাসপাতাল থেকে আসা এই কমিশন বাণিজ্যে গা ভাসিয়ে কতিপয় চিকিৎসক এতোটাই বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন যে, একেকজন রোগীর জীবন যেন তাদের কাছে একেকটি টাকার মেশিন। অর্থাৎ রোগীর জীবন যতোটা ঝুঁকিতে পড়তে থাকবে তাদের কমিশনের মাত্রাও ঠিক সেই হারে বাড়তে থাকবে। এখন পর্যন্ত এমনই ঘটনার সর্বশেষ বলি হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা এএসপি আনিসুল করিম শিপন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি চিকিৎসকরা চেম্বারনির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রাইভেট চেম্বার করলেই টেস্টের কমিশন, ওষুধ কোম্পানির কমিশন ও গিফটের ছড়াছড়ি। অথচ রোগীদের একটি বড় অংশ যথাযথ চিকিৎসার আশায় অসহায় অবস্থার মুখোমুখী হয়ে কেবল জায়গা-জমি বিক্রিই নয়, ধার-দেনা করে চিকিৎসা চালিয়ে যান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনসব ঘটনা ঘটে চলছে, ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস এন্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস এন্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেসন্স) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ এর ৪ ধারার কারণে। যে ধারায় সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টার বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই অর্ডিন্যান্সের অপব্যবহার করে কতিপয় চিকিৎসকরা রোগীর প্রতি অপচিকিৎসার ধারা অব্যহত রেখেছেন। জরুরি ভিত্তিতে এই ধারা বিলুপ্ত বা সংশোধন করা না হলে কতিপয় চিকিৎসকদের এমন অপকর্ম অব্যাহত থাকবে।

অথচ, সরকারি চিকিৎসকদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সালাহ উদ্দিন রিগ্যান, সুজাদ মিয়া, আমিনুল হক ও কাউছার উদ্দিন মন্ডল নামের ৫ জন। ওই রিট আবেদনে চিকিৎসকদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করতে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।

পরে ওই বছরেই ১২ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের আদেশ চেয়ে করা রিট আবেদনে পেশাজীবী হিসেবে চিকিৎসকদের জন্য একটি ‘পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা’ তৈরি করতে স্বাধীন কমিশন গঠনে সরকারকে নির্দেশ দেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। সংশ্লিষ্ট রিটের উপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চ রুলের পাশাপাশি কমিশন গঠনের আদেশ দেন। কিন্তু আজও সেই প্রাইভেট প্রাক্টিস বন্ধ হয়নি!

সরকারি চাকরির মধ্যে এটিই দেশের বিরল প্রকৃতির পেশা, যেখানে একজন চিকিৎসক সরকারি চারকরিজীবী হয়েও ওই প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে বেসরকারি খাতে জড়িয়ে অতিরিক্ত আয় করে কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে থাকেন হরহামেশা। এরই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো, এএসপি আনিসুল করিম শিপন হত্যা। যাকে মানসিক চিকিৎসার নামে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় মাত্র ৩০ পার্সেন্ট কমিশনের লোভে। তাকে ভুলভাল বুঝিয়ে আদাবরের ‘মাইন্ড এইড’ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি সরকারি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্টার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকার ‘মাইন্ড ওয়েল’ এবং টাঙ্গাইলস্থ ‘ঢাকা ক্লিনিক’ নামের আরও ২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও তিনি চেম্বার করে আসছিলেন।

এএসপি আনিসুল হত্যা মামলা তদন্তের এক পর্যায়ে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাম উঠে আসে। পরে মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) ডা. মামুনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ আরটিভি নিউজ বলেন, রোগীকে ‘মিসগাইড’ করে বেনামী চিকিৎসালয়ে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য করার কথা স্বীকার করেছেন চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এমনটি স্বীকার করেন। কেবল এএসপি আনিসুলের কাছ থেকে নয়, অন্য যেসব রোগীদের তিনি ওই হাসপাতালে পাঠাতেন তাদের মাথা প্রতি ৩০ পার্সেন্ট করে কমিশন নিতেন এই চিকিৎসক। আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এই চিকিৎসকের ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত তার ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

ডিসি হারুন অর রশীদ জানান, যে হাসপাতালের লাইসেন্স নেই এমন জায়গায় আপনি কীভাবে চেম্বার করছিলেন, ডা. মামুনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার মতো অন্য ডাক্তাররাও একই কাজ করে। তাই আমিও করছিলাম’।

এমন খামখেয়ালীর বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক আরটিভি নিউজকে বলেন, একজন সরকারি চিকিৎসক তার কর্মস্থল থেকে অনৈতিক কমিশনের আশায় কোনও রোগীকে অন্যত্রে পাঠানো অবশ্যই বেআইনি। সরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বোর্ড গঠন করে ওই রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তবে, কোনোভাবেই চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থে রোগীকে ভুয়া হাসপাতাল বা চেম্বারে পাঠানো যাবে না। যদি কোনও চিকিৎসক এমন কিছু করে থাকেন, তাহলে সরকারের উচিৎ হবে ওই চিকিৎসককে নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া ও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অপরাধে লাইসেন্স বাতিল করে চাকরিচ্যুৎ করা।

আর যেহেতু ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস এন্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস এন্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেসন্স) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ এর ৪ ধারার বিষয়ে ২০১৯ সালে মাহামান্য হাইকোর্ট একটা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সরকারের উচিৎ সেই নির্দেশনা আমলে নিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যাতে করে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রাইভেট হসপিটালে বা ক্লিনিকে চেম্বার করার সুযোগ না পান। এর ফলে রোগী হয়রানি, অবহেলা, অযত্ন ও অপচিকিৎসার মাত্রা কমে আসবে এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সমতা বজায় থাকবে।

একই বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন আরটিভি নিউজকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে কতিপয় দালাল বা হাসপাতালে কর্মরত সংশ্লিষ্টরা রোগীকে ভুলভাল বুঝিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে যেখানে সেখানে পাঠিয়ে কমিশন হাতিয়ে নেয়। এটি কেবল সরকারি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট হাসপাতালে নয়, এমন কর্মকাণ্ড ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ সরকারি অন্যান্য হাসপাতালগুলোতেও বিদ্যমান রয়েছে। এসব সরকারি হাসপাতালের দালালরা ওই হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও মানসিক সেবা কেন্দ্রে কমিশনের বিনিময়ে রোগীদের পাঠিয়ে দেন। যার ফলে অপচিকিৎসায় রোগীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হন। এসব কর্মকাণ্ডে কতিপয় অসাধু চিকিৎসকরা সিন্ডিকেটবদ্ধ হয়ে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

কেএফ/এমকে

RTVPLUS