বাল্যবিবাহ

পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অল্প বয়সী মেয়েরা!

প্রকাশ | ০৭ নভেম্বর ২০২০, ১৫:৩১

পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অল্প বয়সী মেয়েরা!

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চর ও প্রত্যন্ত এলাকায় বাল্যবিবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপুষ্ট শিশুর জন্ম, পারিবারিক কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদ। রোগশোক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এসব অল্প বয়সী মেয়েরা। 

উত্তরের বিভাগ রংপুরের কুড়িগ্রামে বাল্যবিবাহের বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদ, বেড়েছে পারিবারিক কলহ। এর কারণ হিসেবে বাল্যবিবাহের আধিক্যকে দায়ী করছেন সচেতনমহল। চলমান করোনাকালে বাল্যবিবাহের হার যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা!

একদিকে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে বাবা-মা’র নিজেদের বোঝা হালকা করছেন অপরদিকে বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যে সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এসব মেয়েরা হয়ে পড়ে কিশোরীমাতা। অপুষ্টিতে ভুগে হারিয়ে ফেলে শারীরিক সক্ষমতা। বাড়ে পারিবারিক কলহ। শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ বালিকাবধূর সংসার ভাঙে বিবাহ বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। পুনরায় বোঝা হয়ে ফিরে আসে বাব-মা’র কাছে। 

বাল্যবিবাহের পর বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার হয়েছে এমন একজন কমলা বেগম। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ বলদিয়া গ্রামের আব্দুল করিমের মেয়ে এবং নাগেশ্বরী উপজেলার কেদার ইউনিয়নের গোলের হাট ফাজিল মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চারমাস আগে করোনাকালে বিয়ে দেয়া হয় তাকে। বিয়ের পর থেকে শুরু হয় পারিবারিক কলহ। শেষপর্যন্ত স্বামীর ঘর ছেড়ে আসতে হয় তাকে।

কমলা খাতুন জানান, গরিব পরিবারের মেয়ে হওয়ায় তার বিয়েতে অসম্মতি ছিল না। বাবা মায়ের কথা মতো বসেছিলও বিয়ের পিড়িতে। বিয়ের মাস ঘুরতে না ঘুরতে শুরু হয় পারিবারিক কলহ। এখন ছাড়াছাড়ি হবে। 

কমলার মা জানান, ছোট বয়সে বিয়ে দিয়ে ভুল করেছেন তারা। বিয়ের পর এমন সমস্যা হবে জানা ছিল না তাদের।

একই গ্রামের মৃত ছালামের মেয়ে ছালমা খাতুন। সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়ার সময় বছর দুই আগে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পরেই পারিবারিক কলহ, স্বামীর নির্যাতন প্রতিদিন সহ্য করতে হয় তাকে। এরই মাঝে একটি সন্তান কোলে আসে তার। মাস দুই আগে যৌতুকের চাপে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানসহ বাপের বাড়িতে ঠাঁই হয়েছে তার। 

ছালমা বেগম জানান, লেখাপড়ার ইচ্ছা থাকলেও দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়ায় কম বয়সেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় তাকে। বছর খানেক স্বামী সংসার নিয়ে ভালোভাবে কাটলেও পরে শুরু হয় পারিবারিক কলহ। একপর্যায়ে এক সন্তানের মা হন তিনি। এরপর যৌতুকের জন্য শুরু হয় নির্যাতন। মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হতো তাকে এবং সেপ্টেম্বরে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় তার। 

সচেতন মহলে ধারণা বিবাহ বিচ্ছেদের আরও একটি কারণ অনিবন্ধিত বিয়ে। বাল্যবিবাহের সময় বিবাহ নিবন্ধন না করায় আইনের আশ্রয় নিতে পারে না মেয়েরা। ফলে বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে পড়েছে পানিপান্তার মতো।  

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্লান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের 'বিল্ডিং বেটার ফর গার্লস' প্রকল্পের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ মাসে জেলায় অনিবন্ধিত বিয়ে হয়েছে ২ হাজার ৭৮৩টি।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান জানান, বাল্যবিবাহের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের হারও বেড়েছে। প্রতিমাসে তার ইউনিয়নে ১০ থেকে ১৫টি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এছাড়া করোনাকালে বিচ্ছেদের পরিমাণ বেড়েছে।

কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর এসএম আব্রাহাম লিংকন আরটিভি নিউজকে বলেন, পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ এসবের পেছনে বাল্যবিবাহের একটা প্রভাব রয়েছে। তবে নারী শিশু নির্যাতন মামলা বাড়ায় তালাকের হারও বেড়েছে বলে তিনি জানান।

জিএম/এসএস