logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পারিবারিক অবহেলায় করোনায় বয়স্কদের মৃত্যু হার বেশি

Hospital, corona test,
করোনায় আক্রান্ত বয়স্করা
বিশ্বের দুইশ ১৭টি দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।  আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। তবে তরুণদের তুলনায় বয়স্করা করোনায় কম আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর সংখ্যায় বয়স্করাই বেশি। তবে বিশ্বের অন্য দেশে করোনায় মৃত্যু কমলেও বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ২০ জনের ওপরে মারা যাচ্ছেন।

সচেতনতার অভাব ও বয়স্কদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের অবহেলায় এ মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা প্রতিনিয়ত জনগণকে পরামর্শ দিচ্ছেন যে, বয়স্ক মানুষের শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, হাইপার টেনশন, ক্যান্সার অথবা এমন কোনও রোগ জটিল রোগ থাকলে করোনায় আক্রান্ত হন, তারা যেন বাসায় চিকিৎসা না নেন। সরাসরি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নেন। কিন্তু আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষ করোনা আক্রান্ত হলে মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ চিকিৎসকদের পরামর্শ না নিয়ে নিজে নিজে বাসায় বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে দেশে করোনা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত করোনায় ৫ হাজার ৬৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যাদের সিংহভাগেই বয়স্ক মানুষ। এই হিসেবে ৬০ বছরের ওপরে ২ হাজার ৯৩৯ জন মারা গেছেন। ১ হাজার ৫১৩ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৭০৯ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৩১৯ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, ১২৭ জনের ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, ৪৫ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ২৯ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের কম। পুরুষ মারা গেছেন ৪ হাজার ৩৭১ জন নারী ১ হাজার ৩১০ জন।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট মৃতের সংখ্যা ১১ লাখ ১৯ হাজার পেরিয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু ভারত ও পাকিস্তানে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

বৈশ্বিক তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ভারতে মোট মৃত্যু ১ লাখ ১৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, পাকিস্তানে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মানুষের। বিশ্বে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ কোটি ৩ লাখ ছাড়িয়েছে। মোট সুস্থ হয়েছেন ৩ কোটি ১ লাখের বেশি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্ত রোগীর সংখ্যায় দিক থেকে ১৫তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ২৯তম অবস্থানে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্য দেশে করোনা সংক্রমণের প্রথম ঢেউ শেষ হয়েছে কিন্তু আমাদের দেশে এখনও প্রথম ঢেউয়ে আটকে আছে। করোনা আক্রান্তের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। আসন্ন শীতের মৌসুমে করোনা সংক্রমণের হার বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি তাই হয় সেক্ষেত্রে বয়স্ক মানুষ অসুস্থ্ হলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে এখন যেভাবে গাঁছাড়া ভাবে মানুষ চলাচল করছে সেটি অব্যাহত থাকলে শীতে এই মহামারি থেকে রক্ষা পাবে না মানুষ। রাজধানী ঘনবসতি এলাকায় হওয়ায় করোনার সময়ে অনেকে শারীরিক দূরত্ব বাজায় রাখতে পারেনি। ফলে দেশের ৮ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে আর সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সারোয়ার আলী আরটিভি নিউজকে বলেন, করোনা আক্রান্ত বয়স্ক রোগী সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসত। বয়স্কদের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, হাইপার টেনশনসহ অন্য জটিল রোগ আছে এবং তারা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন বাসায় চিকিৎসা না নিয়ে হাসপাতালে আসেন। এখন প্রতিটি কভিড-১৯ হাসপাতালে বেড খালি আছে।

তিনি আরও বলেন, মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন কারণে চিকিৎসা নিতে যাননি কিন্তু এখন চিকিৎসা নিতে যাওয়া দরকার। করোনা আক্রান্ত রোগীরা এখনও যদি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা না নেন তাহলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আরটিভি নিউজকে বলেন, করোনা আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যদি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেন এবং  হাসপাতালে আসতেন তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা কম হত। বিশেষ করে যাদের বয়স ৫০ বছরের ওপরে তারা করোনা আক্রান্ত হলেই চিকিৎসাধীন থাকতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক আমাদের দেশে করোনা টেস্ট ব্যবস্থাপনা এবং করোনা চিকিৎসা নিয়ে সরকারি মহল যে পরিমাণ দুর্নীতি-অপকর্ম সংগঠিত হয়েছে, তাতে মানুষ খুব হতাশাগ্রস্ত। করোনা টেস্ট করার প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষ সহজেই হাসপাতাল মুখী হচ্ছেন না। হাসপাতালে চিকিৎসকদের সেবা রোগী বান্ধব ছিল না। করোনায় মৃত্যু যেন এখন সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন মানুষ। এখনও সরকারের পক্ষ থেকে করোনা চিকিৎসা নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে কম আসছেন এজন্য প্রতিদিন প্রায় ২০ জনের ওপরে মানুষ মারা যাচ্ছেন। হাসপাতালে করোনা টেস্ট বান্ধব পরিবেশ তৈরি করে রোগীকে স্বাগতম জানাতে হবে। এতে রোগীদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ, এর ১০ দিন পর ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর পর থেকে দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন হাজারের ওপরে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে আর দৈনিক মৃত্যুবরণ করছেন প্রায় ২০ জনের ওপরে। ধারাবাহিকভাবে গত সাত মাস ধরে করোনার এমন চিত্রের মধ্যে মানুষের জীবন-জীবিকার টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

এফএ/ এমকে 

RTVPLUS