• ঢাকা বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬

ফেসবুকই হোক ফেসবুক আসক্তির প্রতিকার

অরবিন রূপক ইমরান
|  ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:২০ | আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:৫২
লক্ষ্যের মধ্যে উপলক্ষ রাখতে নেই, কথাটি যেমন সত্য, তেমনই লক্ষ্যকে আরাধ্যে পরিণত করতে পারাও জরুরি। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ফেসবুক আমাদের জীবনে সেই যে আরাধ্য হয়ে উঠলো, যার ব্যবহারকে কিছুতেই রুটিনের মধ্যে আনা যাচ্ছে না। ফেসবুক আমাদের যোগাযোগকে দ্রুততর ও সহজ করণের মাধ্যমে সময় বাঁচানোর অবতার হয়ে মুঠোফোনে আসীন হলো; আর সেই অবতারের হাতেই আমাদের মূল্যবান সময়ের ধারাবাহিক বিনাশ ঘটে চলেছে।

whirpool
বেশ মনোযোগ দিয়ে পাঠ্যবই পড়ছিলাম, একটা ইংরেজি শব্দের অর্থ খুঁজতে মুঠোফোন হাতে নিয়ে কয়েকটা নোটিফিকেশনে চোখ পড়লো, সেগুলো দেখতে যেইনা ফেসবুকে ঢুকেছি, পরক্ষণে দেখি দেড় ঘণ্টা শেষ। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়ি ফেসবুক থেকে। ফোন রেখে দেখি কোন পর্যন্ত পড়েছিলাম তাও মনে নেই। অতঃপর টের পেলাম যার জন্য মুঠোফোন হাতে নিয়েছি সেই ইংরেজি শব্দটির অর্থ তখনও আমার জানা হয়নি।

প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে বইয়ের বাইরেও অনলাইনের নানান শিক্ষণীয় শাখায় পরিভ্রমণের সুযোগ আছে। কোনও জরুরি একটা তথ্যের জন্য অনলাইনে ঢুকে ক্রমাগত চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটনের পর ইউটিউবও বাদ দেইনি। সেখানে তথ্য নেওয়ার পাশাপাশি চলছে বাইক রিভিউ, নতুন মুভির ট্রেলার, পছন্দের মিউজিক ভিডিও দেখা। একটা স্ট্যাটাসও দিয়ে ফেললাম, মোবাইল ফোনের কোনায় চোখ মেলে দেখি আরও প্রায় এক ঘণ্টা শেষ।

-------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : ‘তুমি সরকারের দুই টাকার চাকর, আমাকে চেনো’? (ভিডিও)
-------------------------------------------------------

এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে একটানা পড়ার পর ছোট্ট একটা চা বিরতি নিচ্ছি। পাশাপাশি চলছে প্রদেয় স্ট্যাটাসটির লাইক, কমেন্ট ও রিয়েক্ট দেখার পালা। আমার অপেক্ষায় চাও জুড়িয়েছে, বিস্কুটের গন্ধে পিঁপড়েও জড়ো হয়েছে, আমার ফেসবুক অভিযান আর শেষ হলো না। যন্ত্রণায় ওয়াইফাই বন্ধ করে পুনরায় যেই পড়তে বসেছি, পরীক্ষার পূর্বরাত্রি তখন ভোরের আলোয় মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে।

পরীক্ষার হলে আশপাশের যার দিকেই তাকাই দেখি সে'ই লেখায় ব্যস্ত। প্রায় সাদা খাতাটা জমা দিয়ে হলে ফেরার পথে দারুণ মোটিভেটেড হতে থাকি। আগামী পরীক্ষায় আর কোনও ছাড় নয়, আদাজল খেয়ে পড়ব। কিন্তু কোথায় আদা, কোথায় জল; আমি তো এক পেয়ালা ফেসবুকেই মাতাল।

এভাবে আর কতদিন চলে? স্নাতক (সম্মান) শেষে স্নাতকোত্তরের গণ্ডিও পেরিয়ে যাচ্ছি। এবার তো পাকাপোক্ত একটা আয়ের উৎস খোঁজা দরকার। এই সংকট লগ্নে ফেসবুক অবতারের সাধনায় স্তফা না দিলে আর চলছে না। ওদিকে সামাজিক যোগাযোগের এই অমৃত সুধার তৃষ্ণাও আমায় দূরে থাকতে দেয় না; হুট-হাট চুমুক দিয়ে ফেলি। যখন ছাড়তেই পারছি না, তখন এর সাথেই ফন্দি-ফিকির করে থাকতে হবে।

আমাদের দেশে যখন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচলিত হয়নি, তখন একটা নির্দিষ্ট সময় পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা ঘুমাতো। আমিও একটা ফেইক আইডি খুলে নিয়েছি। যেখানে প্রয়োজনীয় এবং শিক্ষণীয় গ্রুপ ও পেজ অনুসরণ করছি। বায়োতে অবশ্য লিখে রেখেছি, ‘ইট'স এ ফেক আইডি ফর এডুকেশনাল পারপাসেস‘। এতে করে নতুন বন্ধুত্ব তৈরি ও বিভিন্ন গ্রুপে সংযুক্ত হয়ে যাওয়ারও সুযোগ থাকছে না। ফেক আইডি চালানো একটা অপরাধ কিন্তু আমি প্রযুক্তির কাছে ভীষণ অসহায়।

সত্যি বলতে কি, দিন শেষে কর্মই আমাদের পরিচয় ও প্রাপ্তি নির্ধারণ করে। যৌবনে পরিশ্রম করলে বার্ধক্যে অবসরকালীন প্রশান্তি তো পাওয়াই যায় তাছাড়া নানান কর্মকাণ্ডে নিয়জিত হয়ে বৃদ্ধ বয়সটাকেও কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে।

ফেসবুকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সুবিধায় ছোটখাটো কোনও সাফল্যের ঘটনা শেয়ার করে আমরা বাহবা পাই ঠিকই তবে তা সাময়িক। অন্যান্য বন্ধুদের ভিড়ে এটা হারিয়ে যেতেও সময় নেয় না। আজকাল আমরা কেন যেন অন্যকে হাসানোর দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছি। হাস্যরসের জোয়ারে ফেসবুক ওয়াল হাহা'র ভেলায় ভাসছে। এছাড়া খেয়াল রাখা দরকার, একজন ফেসবুক বন্ধু তার সুবিধামতোই আপনাকে বার্তা পাঠাবে বা মন্তব্য করবে। এর প্রেক্ষিতে আপনার হুড়মুড়িয়ে পড়া নিষ্প্রয়োজন। আপনার উচিত হবে নিজের সুবিধামতো তাকে প্রত্যুত্তর বা প্রতিক্রিয়া জানানো। যদি অতি জরুরি কিছু হয়ে থাকে, তবে সে আপনার সাথে মুঠোফোনেই যোগাযোগ করে নেবে।

যোগাযোগের এই আশীর্বাদকে অভিশাপে রূপান্তর না করে বরং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর সদ্ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি। বন্ধু তালিকায় নজর দিলেই এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আলোকচিত্র পেশা একদিকে যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, একইসাথে নতুন ক্লায়েন্টও সহজে পাওয়া যায়। কয়েকজন উদ্যোক্তা মিলে অফিস ছাড়াই ফেসবুকে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে।

‘ফেসবুক আমাকে নয়, আমি ফেসবুককে ব্যবহার করবো’ আর ‘কারও ফলোয়ার থেকে যাব নাকি তাকেই আমার ফলোয়ার বানাবো’ এটাই এখন ভাবার বিষয়।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন :

সি/

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়