logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পৃথিবী মুখোমুখি: আজ করোনা, কাল পঙ্গপাল

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মাঝেই শুরু হয়েছে পঙ্গপালের তাণ্ডব। মানুষের কপালে নতুন চিন্তার ভাঁজ ফেলে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে হানা দিয়েছে ঘাস ফড়িংয়ের সমগোত্রীয় এই পঙ্গপালের কোটি কোটি সদস্যের একেকটি ঝাঁক। মূলত কৃষিপ্রধান দেশগুলোর খাদ্যশস্য সাবাড় করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এক থেকে তিন ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এই পতঙ্গগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য। 

পঙ্গপালের দল তাদের চলার পথে খাবার উপযোগী সবকিছুকেই সাবাড় করে যায়। পতঙ্গটির আক্রমণে যে কোনো অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় মারাত্মক ধস নামতে পারে। এসব পোকা কোনো অঞ্চলে আক্রমণ করলে সেখানকার কোনো গাছের পাতাও অবশিষ্ট থাকে না। একটি পূর্ণ বয়স্ক পঙ্গপাল প্রতিদিন তার ওজনের সমপরিমাণ খাদ্য খায় এবং এমনকি ১০ লক্ষ দলের একটি ঝাঁক দৈনিক প্রায় ৩৫ হাজার লোকের খাবার খেয়ে নিতে পারে।

ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের কোরআন ও বাইবেল ধর্মগ্রন্থগুলোতে এসব পতঙ্গের আক্রমণকে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত শাস্তি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। মরু অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই পঙ্গপাল আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের পর বর্তমানে পাকিস্তান ও ইসরাইলে আক্রমণ করেছে। আর এরই মধ্যে ভারতের পাঞ্জাবেও এই পতঙ্গের আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে বাংলাদেশও এর আক্রমণের শিকার হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা এই প্রাণী পৃথিবীর অন্যান্য পতঙ্গদের চেয়ে আচরণের দিক থেকে বেশ আলাদা, কেননা অন্য কোনো প্রাণী এই পতঙ্গের মতো এত বড় দল নিয়ে এত নাটকীয়ভাবে পরিবেশে আবির্ভূত হয় না। বংশানুক্রমে ঘাসফড়িঙের আত্মীয় ছোট শিংয়ের বিশেষ এই প্রজাতিটি একা থাকা অবস্থায় ফসলের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে বিশেষ বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক পরিবেশে পতঙ্গটির আচরণগত বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মূলত তখনই তারা মারাত্মক ক্ষতিকর পতঙ্গে পরিণত হয়। এরা মূলত বিশাল বিশাল ঝাঁক বেঁধে একত্রে আক্রমণ সাজায়। এতেই মুহুর্তের মধ্যেই মাঠের পর মাঠ ফসল উজাড় হয়ে যায়। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এর তথ্যমতে মরুর পঙ্গপালের একেকটি অতিকায় ঝাঁকের আকার হতে পারে প্রায় ৪৬০ বর্গ মাইল। আর প্রতি বর্গমাইলের একটি ঝাঁকে থাকতে পারে দশ থেকে পনের কোটি পঙ্গপাল।

এসময় কেবল খাবারই খায় না তারা, একই সঙ্গে প্রজননের কাজটিও করতে থাকে। প্রাকৃতিক কিছু কারণে পঙ্গপালের মস্তিষ্কের বিশেষ পরিবর্তনের ফলে তারা অতি দ্রুত বহুসংখ্যক সন্তান জন্ম দিতে পারে। এর মাধ্যমেই তারা সামান্য থেকে ধীরে ধীরে অতি বিশাল একটি দল গড়ে তোলে। ছোট অবস্থায় পঙ্গপাল লাফিয়ে লাফিয়ে চলাফেরা করলেও প্রাপ্ত বয়ষ্ক হলে তাদের পাখা ওড়ার জন্য উপযুক্ত হয়। তবে পঙ্গপালের সংখ্যা অসম্ভব রকমের বৃদ্ধি পেলে তবেই এদের মধ্যে উড়ে বেড়ানোর প্রবৃত্তি দেখা দেয়।

খাবারের নতুন উৎস খুজতে যখন পঙ্গপাল এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে উড়ে যায় তখন তারা অনেকটাই বাতাসের অনুকূলে চলে, তাই বলা যায় বাতাস যেদিকে যায় সেদিকে পঙ্গপালের হামলা অনেকটাই অনিবার্য।

যাত্রাপথে এক একটি পঙ্গপালের দল নতুন নতুন ঝাঁকের সঙ্গে মিলিত হয় এবং কয়েকটি বড় বড় ঝাঁক একত্রিত হয়ে আরও অতিকায় ঝাঁকের সৃষ্টি করে। এ সম্মিলিত বিশাল পঙ্গপাল দলগুলো যখন কোনো ফসলি জমিতে আক্রমণ করে, তখন সে জমি ও আশপাশের এলাকার সকল শস্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে এলাকা ত্যাগ করেনা। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা একটি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি কৃষিপ্রধান দেশকে সতর্ক করা হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয় পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় চারশ গুন বেশি বৃষ্টি হওয়ায় বছর খানেক ধরে পঙ্গপালের ব্যাপক বংশবিস্তার হয়।

গত বছরের শেষ দিক থেকে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি অনুন্নত দেশ যেমন সোমালিয়া, ইথিওপিয়া এবং কেনিয়ায় কৃষি ক্ষেতে আক্রমণ চালাচ্ছে পঙ্গপাল, যে কারণে সেসব দেশের কৃষকেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

পঙ্গপাল সেখানকার মরুভূমিতে জন্ম নেওয়ার পর বর্তমানে উক্ত দেশগুলোর ফসল সাবাড় করার পর এখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছে। পতঙ্গটির আক্রান্ত অঞ্চলে হেলিকপ্টার দিয়ে কীটনাশক ছিটিয়েও কোনো রকমের প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে পঙ্গপালের বংশবৃদ্ধির হার এতটাই বেশি যে, কীটনাশক ছিটিয়ে সারা মাসে যে পরিমাণ এ পতঙ্গ বিনাশ করা সম্ভব তার চেয়েও কয়েকগুন বেশি পঙ্গপাল এক সপ্তাহেই জন্মাতে পারে।

একেকটি পতঙ্গ প্রতিদিন নিজের ওজনের সমান ফসল খেতে পারে। আর পঙ্গপালের একটি ঝাঁক প্রতিদিন ৪২ কোটি পাউন্ডের বেশি ফসল সাবাড় করে দিতে পারে। শুধু যে ফসলই সাবাড় করে তা নয়, এ পতঙ্গগুলো ঐ গাছগুলোও এমনভাবে নষ্ট করে ফেলে যে সেটা আর জীবিত থাকার মতো অবস্থাই থাকে না।

বিভিন্ন গবেষণার পর জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, এখনই পোকাগুলোর বংশবৃদ্ধি থামানো না গেলে এই বছরের মাঝামাঝিতেই এদের সংখ্যা প্রায় পাঁচশ গুণ বৃদ্ধি পাবে। তখন আফ্রিকার অন্তত ৩০টি দেশে এই পতঙ্গ ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তখন বিশ্বের ২০ শতাংশ ফসলি জমি এই পঙ্গপাল দ্বারা আক্রান্ত হবে। এর ফলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ লোকের বেঁচে থাকার মতো খাবারের সংকট দেখা দেবে। পাশাপাশি দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষও।

এসজে

RTVPLUS
  • বিজ্ঞান এর পাঠক প্রিয়