• ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

এমপি জাহিদকে নিয়ে এখন কী করবে বিএনপি?

সিয়াম সারোয়ার জামিল
|  ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১০:০৪ | আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ১৩:১৯
দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। হঠাৎ করে এ শপথ নেয়ার আগে তিনি দলের কাউকেই জানাননি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাহিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে, এমনটা গণমাধ্যমকে জানালেও সেটা কী তা স্পষ্ট করেননি। ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকটাই বিপাকে পড়েছে বিএনপি। 

whirpool
জানা গেছে, নানামুখী রাজনৈতিক সংকটে থাকা বিএনপির শীর্ষ নেতারা যখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক তখন ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত এই প্রার্থীর শপথ গ্রহণে অনেকটাই বাকরুদ্ধ তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার তাৎক্ষণিভাবে বিএনপির কোনো নেতাই মন্তব্য করতে চাননি। বারবার বলেছেন, নো কমেন্ট নো কমেন্ট। দুপুর নাগাদ খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর আরেক দফা কথা হয় তাদের সঙ্গে। তাতে প্রায় সবাই হতাশার কথা জানান। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। জানিয়েছেন, তারা বিব্রত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধারণা ছিল, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ফল বর্জন এবং শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তেই তারা অনঢ় থাকতে পারবেন। এমনকি স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও (২২ এপ্রিল) তাদের সে সিদ্ধান্তই বহাল রাখা হয়। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবং দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ শপথ নেওয়ার কথা ভাববেন না বলেও ধারণা ছিল শীর্ষ নেতাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এরই মধ্যে একজন শপথ নিয়ে নেওয়ায় সে হিসাবে গরমিল হয়ে গেছে।

তবে ও নির্বাচনে জয়ী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া নির্বাচিত পাঁচ প্রার্থীই শপথের বিষয়ে শুরু থেকেই ছিলেন উদগ্রীব। সে কারণেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হারুনুর রশীদ, বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মো. মোশারফ হোসেন, ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত উকিল আব্দুস সাত্তার ১৫ এপ্রিল থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

বৃহস্পতিবার রাতে মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত মো. জাহিদুর রহমান আজ শপথ নিয়েছেন। তিনি স্পষ্টত দলীয় সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তার বিরুদ্ধে শিগগিরই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান দলীয় গঠতন্ত্রে রয়েছে, সে ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক দলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, মো. জাহিদুর রহমানের শপথ নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটু বেশিই বিব্রত। কারণ, ঠাকুরগাঁও তার নিজ এলাকা। একজন নির্বাচিত প্রার্থী দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেওয়ায় দলের কাছে জবাবদিহিতার দায়বদ্ধতা তারই বেশি।  

তবে দুয়েক দিনের মধ্যেই দলের সর্বোচ্চ নীতির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। তারপর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে বিএনপি। এমনটাই জানিয়েছেন ওই নেতারা।

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদের প্রথম বৈঠকের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে শপথগ্রহণ করতে হবে। তা না হলে সদস্যপদ বাতিল করে আসন শূন্য ঘোষণা করা হবে। একাদশ সংসদের প্রথম বৈঠক বসে এ বছরের ৩০ জানুয়ারি। এই হিসেবে ২৯ এপ্রিলের মধ্যেই নির্বাচিত সদস্যদের শপথগ্রহণ করতে হবে।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যেসব সাংসদ শপথগ্রহণ করেছেন, আইন অনুযায়ী তাঁদের সদস্যপদ থাকবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এ বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সাংসদ নির্বাচনের পর সাংসদ পদে থাকার অযোগ্য হবেন কি না কিংবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সাংসদের আসন শূন্য হবে কি না—এ সম্পর্কিত কোনো বিতর্ক দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তবে সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে।

এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সুলতান মনসুর, মোকাব্বির খান ও জাহিদুর রহমান দল থেকে পদত্যাগ করেননি। সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগও তাঁদের নেই। তবে তাঁরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিলে এবং ওই অবস্থায় দল তাঁদের বহিষ্কার করলে পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে হলে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থাকতে হবে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শপথ নিয়ে দল থেকে বহিষ্কার হলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও আরপিওর ১২(১) বিধি অনুযায়ী কারো এমপি পদ থাকবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা এখন দেখার বিষয়। তিনি বলেন, যে দল তাদের মনোনয়ন দিয়েছে, সেখান থেকে বহিষ্কৃত হলে সংসদে এ দু’জনের অবস্থান কোথায় হবে? এখন অন্য দলে যোগ দেয়ার বা স্বতন্ত্র এমপি হয়ে থাকার সুযোগও নেই। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার শর্ত তারা পূরণ করেননি। 

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, দল কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলে তার সদস্য পদ কি হবে এটার উত্তর সরাসরি আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নেই। ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে পদত্যাগ অথবা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার কথা বলা আছে। বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে মামলা হলে তখন উচ্চ আদালত এ বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন। তবে আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা দাঁড়াবে পদত্যাগ ও বহিষ্কার শব্দটা সমর্থক কিনা। হাইকোর্ট হয়তো এটাই বলবেন যে, দল থেকে পদত্যাগ করা আর বহিষ্কার করা সমর্থক। তাহলে এই বিবেচনায় তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। তবে হাইকোর্ট কি বলবেন সেই সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান ও আরপিও’র আইনে বহিষ্কার হওয়ার পর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কিনা সেটা অস্পষ্ট আছে। এক্ষেত্রে অতীতের উদাহরণের উপর সংসদ সদস্য পদ থাকা না থাকা নির্ভর করতে পারে। আর অতীতের উদাহরণ হলো দুই একজন এমপি বহিষ্কার হওয়ার পর তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। 

এসজে/ এমকে 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়