'ভালো লিখতে শুধু নেশা নয়; ধৈর্য, সততা ও নম্রতারও প্রয়োজন আছে'

প্রকাশ | ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১২:১৩ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১২:২৬

সিয়াম সারোয়ার জামিল
হারিস অধিকারী

হারিস অধিকারী নেপালের একজন প্রখ্যাত তরুণ কবি ও অনুবাদক। তিনি কাঠমুন্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে শিক্ষকতাও করছেন। লেখালেখি ও শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মিস্টি মাউন্টেন রিভিউ নামের একটা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এরই মধ্যে তার তিনটি কবিতা ও অনুদিত বই প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে নেপালি কবিতার বিভিন্ন ধারা নিয়ে গবেষণা করছেন। তার কবিতা ও অনুবাদ দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিয়াম সারোয়ার জামিল

আরটিভি: আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন?

হারিস অধিকারী: লেখালেখি বলতে মূলত কবিতা সবসময় আমাকে টানে। আমি প্রথম কবিতা লিখি ক্লাস নাইনে থাকতে। তাৎক্ষণিকভাবে সেটা আমাকে পূর্ণ করে উচ্ছাসে। উৎসাহ দেয়। আমোদিত করে। পাখি, ফুল, রংধনু, খোলা আকাশ এসব আমাকে টানে। পরে সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও আমার কবিতার প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দেয়। 

আমি বিক্ষিপ্তভাবে ২০০৭ সালে পর্যন্ত নেপালি, ইংরেজি ও হিন্দিতে লিখতে থাকি। স্নাতকোত্তর শেষ করার পর আমি নিজেকে আরও সময় দিই কবিতা পড়াশোনা ও অনুধাবনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কবিতা অনুবাদ ও গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠি আমি। আমি মনে করি, গত দশ বছরে ব্যক্তিগত, আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। 

পৌরাণিক কাহিনীর বিভিন্ন জগতগুলো আমার কবিতায় জায়গা নিয়েছে। আমি জীবন এবং জগতের নাটকগুলো পড়তে আগ্রহী। আমাদের যা বলা হয়েছে এবং আসলে তা কী- সেসব জানতে আগ্রহী ছিলাম সবসময়।  এসব থেকেই তৈরি হওয়া শক্তি, গতি এবং মায়া আমাকে নতুন করে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।

আমার সাম্প্রতিক উপলব্ধিটি হলো- কবিতায় আমি আমার হৃদয় ও মনে যা রেখেছি তা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারি। তবুও আমি মাঝে মাঝে কবিতা থেকে নিজেকে দূরে ভাবতে পছন্দ করি। আমি যেটা বুঝতে পেরেছি তা হল- কবির পক্ষে অতি পরিচিত, বাহ্যিক বহিরাগত, রহস্যময়, অন্তর্দৃষ্টি বা চিন্তা-চিত্তাকর্ষক জগতের বাহন তৈরির পক্ষে সক্ষম হওয়াও প্রয়োজনীয়।

আরটিভি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আপনি নিজেকে কতটা বিকশিত বলে মনে করছেন?

হারিস অধিকারী: আমি এখনও শিখছি। আমার আগ্রহ কবিতায়। কবিতাই আমাকে অনুবাদের দিকে ও গবেষণায় ধাবিত করেছে। এর সঙ্গে সৃজনশীল লেখায়ও উদ্বুগ্ধ হয়েছি। আমার লেখালেখি, সম্পাদনা, প্রকাশনার অভিজ্ঞতায় প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছি। যেমন, আমার একটা পাণ্ডুলিপি প্রকাশনার জন্য দেয়া হয়েছিল। সম্পাদক ও প্রকাশক দুজনেই খুব আগ্রহী ছিলেন তা প্রকাশ করতে। আমি সেই পাণ্ডুলিপি তৈরিতে তিন মাস সময় দিয়েছি। কিছু সময় অপেক্ষাও করেছি। পরে আরও কিছু পরিবর্তন এনেছি পাণ্ডুলিপিতে। আমি এখন প্রকাশনার জন্য কিছু জায়গা খুঁজছি আরও কিছু বই প্রকাশ করতে। এখান থেকে একটা বিষয় শিখেছি, সেটা হলো ভালো লেখার জন্য শুধু নেশার দরকার-বিষয়টি এমন নয়, ধৈর্য, সততা ও নম্রতারও প্রয়োজন আছে।  

আরটিভি: শিক্ষকতার সঙ্গে লেখালেখি কীভাবে সমন্বয় করেন?

হারিস অধিকারী: সম্প্রতি আমার বিশ্ববিদ্যালয় বেশ ব্যস্ততা যাচ্ছিল। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড, সম্পাদনা, গবেষণা রিভিউ করা এসব বেশ সময় দিতে হচ্ছিল। এসব কারণে যতটা সময় লেখালেখিতে দেয়া দরকার, তা দেয়া হয় না। কিন্তু আমি ছুটির দিনগুলো দারুণভাবে ব্যবহার করি। আমি বেশ নিশাচরও! (হেসে) 

আরটিভি: আপনি নেপালি কবিতার পাশাপাশি পশ্চিমা কাব্যও অনুবাদ করেছেন। আপনার কি মনে হয় এসব আপনার কবিতাকে প্রভাবিত করে? করলে সেটা কীভাবে?

হারিস অধিকারী: হ্যাঁ। এটা হয়। বই, পত্রিকা, জার্নাল অনুবাদ-কবিতা গবেষণা এসব লেখায় অবশ্যই প্রভাব ফেলে। আমি যা অনুবাদ করি, তা সাধারণত পৌরাণিক, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে। এসব আমাার সাহিত্য জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এবং আমি আরও গবেষণার আরও আকর্ষণীয় কিছু বিষয় পেয়েছি। আমি অন্যান্য বিষয়গুলির সাথে সাথে পাঠ্য প্রসঙ্গ এবং সংযোগ, সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বও পেয়েছি। যা থেকে আমি আমার কবিতাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা করি। আমি মনে করি এই শিক্ষাগুলির কিছুটা আমার কিছু কবিতায় প্রতিফলিত হয়। 

আরটিভি: কবি-সাহিত্যিকদের মাঝে রাইটার্স ব্লক আসতে দেখা যায়। এটা থেকে কীভাবে বের হয়ে আসেন?  

হারিস অধিকারী: এই সময়গুলো বেশ অস্থিরতার। আমি খুবই অশান্ত বোধ করি। আমি মুভি বা ডকুমেন্টারি দেখার চেষ্টা করি। বই পড়ে, ঘুরে নিজেকে জানার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।  আম মনে করি, নিজেকে পূর্ণ করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য এমন কিছু করি, যা আমাকে স্বাভাবিক করে। 

আরটিভি: লেখালেখি করতে গিয়ে দারুণ কোনো অভিজ্ঞতা আছে? 

হারিস অধিকারী: লেখালেখি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আমাকে বারবার বিচক্ষণ হতে এবং মানসিক শান্তি ফিরে পেতে সহায়তা করেছে। নিজেকে মেলে ধরতেও পেরেছি দারুণভাবে, যা আমি সম্ভবত অন্য রূপগুলিতে প্রকাশ করতে পারতাম না। লিখতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে আপাতত আমার ফোকাস হচ্ছে লেখার সবরকম প্রক্রিয়া শেখা। এই ক্ষেত্রে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি হিসাবে, এটিই আমার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত। 

আমার গত বছরের একটি প্রোজেক্ট ব্যর্থ হয়েছিল। তবে নেটিভ এডিটরের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার পক্ষে সহায়ক হয়েছে। কাজের প্রতি দক্ষতা আনার চেষ্টা করছি। সম্পাদনা প্রক্রিয়াটি একটা শিল্প। প্রতিনিয়ত এ কাজে দক্ষতা  বাড়াচ্ছি। আমি মূলত আমার ভাষাটিকে পরিমার্জন করতে শিখেছি। বিশেষত লেখাকে সংক্ষেপে কাঠামোগত করে তুলতে শিখেছি। এও শিখেছি যে কীভাবে গভীরভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়। 

উদাহরণস্বরূপ, আমার মনে আছে আমি কীভাবে একবার লেখা অনুবাদ করেছিলাম। যা সম্পাদক দারুণভাবে সেটাতে মিষ্টি স্বাদ এনে দিয়েছিলেন। এগুলো ছাড়াও, আমি পাণ্ডুলিপিগুলিতে গঠনমূলক উপকরণগুলি গ্রহণ করতে পাশাপাশি শিখেছি। সংক্ষেপে, আমি তিন মাসের নিবিড় সম্পাদনা প্রক্রিয়া চলাকালীন সংশোধন, পুনরায় ফর্ম্যাট এবং পরিমার্জন করতে শিখেছি। সম্পাদনা করা লেখাগুলো দেখে মনে হয়, এখন সেগুলো একেকটি প্রজাপতি যেন। 

আরটিভি: ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

হারিস অধিকারী: আমি একই সাথে তিনটি পান্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছি। আশা করি, এই বছর ভাল প্রকাশক খুঁজে পাব। ইচ্ছে আছে, গবেষণাপত্রগুলিতেও কাজ শুরু করবো। নেপালে কাব্য, স্ট্রিট থিয়েটার, জীবন ও জগতে পৌরাণিক আধিপত্য, শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়েও বেশ কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে। কবিতা নিয়ে কিছু এক্সপেরিমেন্ট ও কাব্যগ্রন্থের বই বের করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

এসজে