logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস: ভেতর থেকে দেখা

Politics of the Sixties and the Forecast of the Liberation War: Seen from the Inside
ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস
ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস একজন মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদের লেখা। স্বভাবতই এটি ভেতর থেকে দেখার মতো। আরেকটু খোলাসা করা যাক, একজন ছাত্রনেতা যখন ষাটের দশক দেখেন কাছ থেকে; তখন তা ভেতর থেকেই দেখা হয়। ওই দশককে কি খুব সহজে মুক্তিযুদ্ধের ফিসফাসকাল বলা চলে না? ফিসফাস শব্দটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সূচনা। আবার ওই লেখকই যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হন তখন তার দেখা লেখমালা ভেতর থেকে নিগূঢ় দেখায়।

উল্লিখিত লেখক কামরুল আহসান। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রলীগ কর্মী। পরে একজন রণাঙ্গনের সম্মুখ যোদ্ধা। তার লেখা নিয়ে কথা বললে বারবার তিনি আসবেন। এবার বলা যাক এই লেখকের ভালোবাসার একজন মানুষই বিভিন্ন সময়ের লেখাগুলো জড়ো করে এক মলাটে এনেছেন। আর কিছু নয় লেখকের প্রতি দায়বোধ থেকে। দেশের প্রতি, রাজনীতির প্রতি; সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়িত্ববান থেকে। এমন হবে না কেন? সম্পাদক মানুষটিও যে লেখক। ভালো লেখক ও একজন ভালো মানুষ। তিনি তপন দেবনাথ। লেখকের জেলার মানুষ, ভোলার মানুষ। 

দুজন গুণী মানুষই থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে। প্রবাসী বাংলাপ্রেমিক তারা। রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং মানবপ্রেমিক তো অবশ্যই। 

ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস বইটিতে কামরুল আহসানের তেরটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। লেখাগুলোর অধিকাংশই বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া। বইটির ভূমিকায় লেখক কামরুল আহসানের কিছু কথা মনে ধরে যায়। তিনি বইটি লেখা কিংবা নিজের জীবনচরিতের প্রারম্ভ বলেন, ‘১৯৫৯ সালে আমার বয়স যখন দশ বছর, মানে যখন আমি সবকিছু বুঝতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি তখন দেখতাম আমার সরকারি চাকুরে, ইঞ্জিনিয়ার বাবা ছুটির দিনে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা একদল বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চায়ের আড্ডায় ভারত বিভাগ এবং তার পরিণতিতে সৃষ্ট বিদঘুটে আজব রাষ্ট্র পাকিস্তান ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকতেন। বাবার আদর্শ চরিত্র ছিলেন তিনজন সর্বভারতীয় বাঙালি নেতা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।’ 

পাঠক নিশ্চয়ই ধরতে পারছেন লেখক তার বাস্তব দেখার কথাগুলো লিপিবদ্ধ করলেই একটি প্রামাণ্য দলিল হয়। ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস বইটিতেও আমরা এমন কথামালাই পাব। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধকে পাব। 

বইটির ভূমিকায় লেখক আরও লিখেছেন, ‘অতি অল্প বয়সে আমার বাবা ও তার বন্ধুদের সেই ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতি এবং পাকিস্তানবিরোধী আলাপ আলোচনা, কথাবার্তাই আমার মনে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটায়। ১৯৬২ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিরোধী বিচারপতি হামুদুর রহমানের নতুন রচিত শিক্ষানীতি বাতিলের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের তৎকালীন সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খানের সাথে আমার পরিচয় হলে আমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা আসে। দেখতে দেখতে অচিরেই আমি ছাত্রলীগের সার্বক্ষণিক কর্মী হয়ে যাই।’

এমন স্মৃতিভাস্বর ব্যক্তি কামরুল আহসানের চোখে ষাটের রাজনীতি জানা পাঠকের জন্য পাওয়াই হবে। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস ও অনেকটা মুক্তিযুদ্ধের দেখাই মিলবে। বইটি পড়ে মনে হয়েছে লেখক সহজেই বুঝিয়েছেন ষাটের রাজনীতির হালচালের ফসলই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জয়মালা। 

পাঠকের জন্য একটি চমৎকার ভাবনা তুলে ধরা মুক্তিযোদ্ধার আবেগ-অনুভূতির কথোপকথন আলোর মুখ দেখেছে শ্রী তপন দেবনাথের বদান্যতায়। তিনি বুঝিয়েছেন ভালো লেখক অবশ্যই একজন ভালো সম্পাদকও। সম্পাদনার কাজটি সুচারুরূপে করেছেন লেখক তপন বিশ্বাস। লেখক বলেই তিনি বুঝতে পেরেছেন প্রকৃত সম্পাদনা; লেখকের খুত-ভালোবাসার বিষয়টি। 

বইটি প্রকাশ করে পাঠকের কৃতজ্ঞতা পাবে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ১১০। বইটিতে স্থান পাওয়া প্রবন্ধগুলো হলো- ‘জয় বাংলার উৎপত্তি ও আজকের প্রেক্ষাপট’, ‘স্মৃতিতে শেখ কামাল ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর দিনগুলো’, ‘ষাটের দশকের রাজনীতির মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণ’, ‘আণবিক বোমার রাজনীতি : প্রেক্ষিত ভারত-পাকিস্তান’, ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ : স্বাধীনতার এক স্বপ্ন সারথির কথা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের রণহুংকার জয় বাংলা’, ‘লেখকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে’, ‘যখন সবাই পালাতে চায়’, ‘সেকালের তৃপ্তি, একালের চাহিদা’, ‘বাংলাদেশের মেমোরিয়াল ডে’, ‘জীবনখাতার প্রতি পাতায়’, ‘ধর্ম ও সৃষ্টির সেরা জীব’ এবং ‘লস অ্যাঞ্জেলেসের ডক্টর মোস্তফা : একজন বিনয়ী মানুষের কথা’।

লেখাগুলো পত্রিকায় কলাম আকারে প্রকাশ হলেও একজন মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিকের নির্ভুল ভাবনাই। আর তা ভারী লেখাই হয়ে যায়। আরও এগিয়ে দেশ-দর্শন-রাজনীতি-মুক্তিযুদ্ধের চাক্ষুস বয়ান হয়ে যায়। আর তাই অকুণ্ঠচিত্তে প্রকাশ করেছেন কামরুল আহসান। তপন দেবনাথ নামের আরেক গুণী লেখক ভালোবেসে শ্রদ্ধার আসনে লেখককে রেখে সম্পাদনা করেছেন ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস বইটি। সম্পাদনায় তিনি মুন্সিয়ানাই দেখিয়েছেন। সবার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আমরা পেলাম একজন রাজনীতিকের চোখে দেখা- রাজনীতির বয়ান। 

খুবই অভাবনীয় বিষয় একই লেখক একজন মুক্তিযুদ্ধা হয়ে যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখেন। এমন অভাবননীয় গুণী মানুষ খুব কম। আমি নিজে যে বিষয়টিতে মোহিত হয়েছি তা হলো চারটি বিষয় একসঙ্গে ঘটেছে- রাজনীতি, রাজনীতিক, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা। অবশ্যই তা বিরল। তারপর আবার সব ছাপিয়ে মানুষটি লেখক। তাইতো এতকিছু মিশ্রণের সাহস রাখেন। আরেকটু খেয়াল করলে এমনসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংমিশ্রণ পাঠকের কাছে তুলে ধরার সাহস করেছেন একজন সম্পাদক যিনি নিজেও লেখক। তাইতো দারুণ সাহস তার।

ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস বইটির সম্পাদক তপন দেবনাথ ভূমিকায় লেখেন, ‘মৌলিক রচনার চেয়ে সম্পাদনা করা যে কঠিন কাজ সেটা টের পেলাম জনাব কামরুল আহসান সাহেবের দ্বিতীয় গ্রন্থ ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস গ্রন্থটি সম্পাদনা করতে গিয়ে। মৌলিক রচনায় যা খুশি নিজের মতো করে লেখা যায়; কিন্তু সম্পাদনা করার সময় অন্যের লেখায় ছুরি চালাতে গিয়ে যদি সে ছুরি শানিত না হয় তবে মূল লেখাটিই নষ্ট হতে বাধ্য। আমি এমন একটি বই সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছি যার প্রেক্ষিত কিছুটা আমার জন্মের পূর্বের এবং কিছু লেখা ২৪-২৫ বছর আগের। এক্ষেত্রে আমাকে খুব সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হয়েছে।’

এমন সব গুণীর পরশের ফসল ষাটের দশকের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস বইটি। সচেতন পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতো বই এটি। নিরন্তর শুভ কামনা লেখক কামরুল আহসান, সম্পাদক তপন দেবনাথ ও ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের প্রতি। 

বইটির প্রচ্ছদশিল্পী দেওয়ান আতিকুর রহমান। মূল্য: ২২০ টাকা। 

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।   

পি
 

RTVPLUS