logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ছাত্রীকে বাসায় রাতযাপনের প্রস্তাব দেন জাবি শিক্ষক

জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
|  ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:০৬ | আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:৪২
শিক্ষক, ছাত্রী, জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সানোয়ার সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে বিভাগটির স্নাতকোত্তরের এক ছাত্রী। এই ঘটনায় তার শাস্তির দাবি করে মানববন্ধন করেছে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, জাবি শাখা। 

শনিবার দুপুর একটার  দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাদদেশে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন থেকে বক্তারা শিক্ষক সানোয়ার সিরাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

জানা যায়, ভুক্তভোগী ছাত্রী হয়রানির বিচার চেয়ে বিভাগীয় সভাপতি বরাবর অভিযোগ দিলেও কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সানোয়ার সিরাজ সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ সত্য হলে আমি শাস্তি পাব। কিন্তু যদি সত্য না হয় তবে আমি নিশ্চয়ই অব্যাহতি পাব। আর নম্বর কম দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষার নম্বর দেখলেই বুঝতে পারবেন আসলে তাকে কম দেওয়া হয়েছে কিনা।

জানা যায়, গত এক বছর ধরে অভিযোগ করে কোনও বিচার না পাওয়ায় এবং শিক্ষক সানোয়ার সিরাজের অব্যাহত হয়রানির ফলে মানসিকভাবে প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী ছাত্রী। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছাত্রী ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ২৬টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে তার সহপাঠীরা জানান। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভুক্তভোগী ছাত্রীকে সাভারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে পরবর্তীতে বিভাগের নতুন সভাপতি অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বরাবর হয়রানির ঘটনা উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রী। ১৯ সেপ্টেম্বর দায়ের করা অভিযোগপত্র গেল ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলে পাঠান বিভাগীয় সভাপতি।

বিভাগীয় সভাপতি বরাবর দায়ের করা অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী ছাত্রী উল্লেখ করেন, ভালো পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় বর্ষে সানোয়ার সিরাজের কোর্সে কম মার্কস পাই। ফলশ্রুতিতে আমি ওই কোর্স মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিতে চাই। আর এজন্যই আমি সানোয়ার সিরাজের শরণাপন্ন হই। এ সময় তিনি আমার মোবাইল নম্বর নিয়ে রাখেন।

তিনি আমাকে বলে রাখেন, যেকোনো কারণে যেন যোগাযোগ করি। পরীক্ষার দিন (গত বছরের ১২ মার্চ) তিনি ফোন করেন। পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চান। এরপর ওই রাতেই তিনি আবারও ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন এবং আমার সঙ্গে ঘোরাফেরা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হঠাৎ করে তার এ ধরনের আচরণে আমি বিস্মিত হই। পরবর্তীতে আমি বিভাগে গিয়ে তার কাছে জানার চেষ্টা করি যে, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিল কিনা। কিন্তু তিনি নিশ্চিত করেন যে আইডি হ্যাক নয় বরং তিনিই এই মেসেজ প্রদান করেছেন।

এ সময় তিনি আরও বলেন যে, আমার প্রতি তিনি তীব্র শারীরিক আকর্ষণ বোধ করেন। আমার সঙ্গে সময় কাটাতে চান। ঘুরতে চান। আমি ধারাবাহিকভাবে সানোয়ার সিরাজের এমন আচরণে খুব বিব্রত ছিলাম। ফলে বারবার ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাক্টিভ করছিলাম। কিন্তু তিনি রেগুলার আমাকে উত্ত্যক্ত করে যাচ্ছিলেন। আমি এ ঘটনার জন্য সানোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ইচ্ছা পোষণ করি। কিন্তু স্নাতকোত্তর পরীক্ষার কারণে এই মুহূর্তে অভিযোগ না দেওয়ার জন্য অনেকে আমাকে পরামর্শ দেন।

এ অবস্থায় আমি সানোয়ারের আচরণে হতাশ হয়ে পড়ি। পরবর্তীতে তিনি আমাকে আবার কল করে ড্রেস গিফট করা, ঢাকা এবং সাভারের রেস্টুরেন্টে খাওয়া, রাতে একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া এবং স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার বাসায় রাত যাপন করার প্রস্তাব দেন।

এ সময় তিনি আরও কিছু অশালীন কথাবার্তা ও কুপ্রস্তাব দেন। আমি তার ধারাবাহিক অত্যাচারে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং একাধিক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হই। পরবর্তীতে সানোয়ার সিরাজের যৌন নিপীড়নমূলক কথাবার্তা, ফোন কল রেকর্ড ও মেসেঞ্জারের চ্যাটের প্রমাণ বিভাগের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার শামসুন্নাহারের কাছে হস্তান্তর করি। কিন্তু এর কারণে পরবর্তীতে একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আমার ওপরে চড়াও হন খন্দকার শামসুন্নাহার এবং তিনি আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেন।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, মহিলা পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে আমি আমার হয়রানির কথা জানাই। কিন্তু এসব শুনে বিভাগের সাবেক সভাপতি খন্দকার শামসুন্নাহার আমাকে বিভিন্নভাবে থ্রেট করেন যাতে বিভাগে লিখিত অভিযোগ না নিয়ে যাই। আমি পরে তাকে কিছু বিষয় শেয়ার করি। তিনি আমাকে সহানুভূতি জানিয়ে এসব ভুলে গিয়ে ক্যারিয়ারের দিকে নজর দিতে বলেন। বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে তিনি এসব গোপন রাখার কথা ছিল। কিন্তু এসব শিক্ষকদের মধ্যে ভাইরাল করে দেন। এর মধ্যে আমার পরীক্ষা। আমি আসলে আর লড়াই করতে পারছিলাম না।

এই বিষয়ে বিভাগটির বর্তমান সভাপতি নাসরিন সুলতানা বলেন, আমি গেল ১৯ তারিখ অভিযোগপত্রটি পেয়েছি। কিন্তু তার কিছু প্রমাণপত্র আমাকে দেওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে আমি গত ২৫ আগস্ট অভিযোগপত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলে হস্তান্তর করি।

এদিকে এ ঘটনার তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা আখতারকে প্রধান করে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলর প্রধান অধ্যাপক রাশেদা আখতার বলেন, ‘আমি অভিযোগপত্রটি পেয়েছি। আমরা সব ধরনের নথিপত্র তৈরি করেছি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

তবে অভিযোগপত্রে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট সেল’র প্রধান অধ্যাপক রাশেদা আখতারের বিষয়ে বলেন, আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমি নিশ্চিত যে, তিনি ওই কমিটির প্রধান থাকলে এ ধরনের নিপীড়নকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। অভিযোগকারী হিসেবে আমি সুবিচার পাব না। কারণ এর আগে শাখা ছাত্রলীগের এক নেতা আমাকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। সে ঘটনায় যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল বিচার না করে উল্টো আমাকেই হ্যারেজ করে।’

অনাস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক রাশেদা আখতার বলেন, এটা সে বলতেই পারে। এটা তার ধারণাপ্রসূত বিষয়। এই কমিটিতে শুধু আমি না। আরও ছয়জন সদস্য আছেন। সকলের তদন্তের মাধ্যমে এর আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিভাগের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ভিসিপন্থি গ্রুপের রাজনীতি করার কারণে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সদ্য সাবেক বিভাগীয় সভাপতি খন্দকার শামসুন্নাহার।

অভিযোগের বিষয়ে বিভাগের সদ্য সাবেক সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার শামসুন্নাহার বলেন, আমাকে কোনো ধরনের লিখিত অভিযোগ দেয়নি। আমার বিরুদ্ধে যা বলছে তা বানিয়ে বলছে। এসব মিথ্যা, বানোয়াট।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত সানোয়ার সিরাজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

জেবি/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • অন্যান্য এর সর্বশেষ
  • অন্যান্য এর পাঠক প্রিয়