Mir cement
logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

দিনটি আজ মা’র

মা এই শব্দটি এত শান্তির, যে মনের অজান্তেই উচ্চারিত হয় ‘মা’। সকল দুঃখ-কষ্ট লাঘব করে দেয় এ শব্দটি। সন্তানের মুখে এই ডাকেই একজন নারী পান তার জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান। সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার। মার অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়৷ তাইতো তিনি আমাদের গর্ভধারিনী ও জননী৷

আর এ ‘মা’ শব্দটির মূল্যকত— যাদের মা এ পৃথিবীতে বেঁচে নেই, তাদের অভাগা সন্তানরাই ভালো করে বুঝতে পারে। মা বলে না ডাকার সে-কি কষ্ট বেদনার ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বুঝছি। এই দিনে মাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলি। মায়ের চলে যাওয়াতে ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সারাক্ষণই মনে হয় কি যেন নেই।

কিছুদিন থেকে নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলাম না। কারণ ৮ মে মা দিবস। মাকে নিয়ে কিছু লিখতে হবে। যতবারই লিখতে বসেছি, চোখে পানি এসেছে। ঝাপসা চোখে কেবল মা’র মুখখানিই ভেসে উঠেছে। কি লিখবো জানি না। শুধু জানি মা’কে খুব মনে পড়ে, অসম্ভব রকম মনে পড়ে।

কেউ কেউ বলবে? মাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়ত কোনো প্রয়োজন নেই৷ তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ‘মা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে; যার সূত্রপাত ১৯১৪ সালের ৮ মে থেকে৷ তবে বিশেষ একটি দিন যদি শুধু মায়ের জন্য হয়, তাহলে মন্দ কি? বিশেষ মানুষটির জন্য বিশেষভাবে না হয় দিনটি কাটানো যাবে। আর যাদের এ পৃথিবীতে মা নেই, তারা মাকে স্মৃতিচারণ করে বেশি বেশি দোয়া করবে।

তাইতো আজ মাকে খুবই মনে পড়ছে। বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে যেমনটি করে চারটি সন্তানকে লালন–পালন করেছ, সেটি আমার দৃষ্টিতে খুবই নজিরবিহীন। আমি তখন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ি। বাড়িতে তুমি একা। বড় ভাই আর মেঝ ভাই দুজনই চাকরি শুরু করেছিল। ছোট বোন কাকনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। এর ভিতরে আমাদেরকে কখনো বাবা অভাব বুঝতে দাওনি।

মা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। ফজর নামাজ শেষ করে পুরো বাড়িটির আঙিনা নিজের হাতে ঝাড়ু দিতেন। পুকুরঘাটে গিয়ে থালাবাসন পরিষ্কার করতেন। নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ ছিল মায়ের। এ মধ্যে ২০১১ সালে মা বেস্ট ক‍্যানসারে আক্রান্ত হন। এরপর হাসপাতালে ভর্তি, অপারেশন ও ক্যামোথেরাপি দেওয়া হল। তখন মার জন্য বাসা নিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে। যেখানে থাকতে মা খুবই পছন্দ করতে। আমার জন্য রান্না করে একসঙ্গে খাবারে জন্য বসে থাকতেন। এভাবে চলতে লাগল।

তারপর ২০১৫ সালে আবারও মাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল। এবার ধরা পড়ল ব্লাড ক‍্যানসার। দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও মা ছিলে সব সময়ই হাসিখুশি। তাইতো, মা যেদিন এ পৃথিবী থেকে একেবারে চলে যাবে-সেদিন সকালে ডাক্তার আমাকে বলেছিল-তোমার মা সব সময় হাসিখুশি। আজ তার হাসি নেই।

সেদিন মা তোমার মুখখানা যত দেখেছি, মনে হচ্ছে তুমি আমাকে দেখে হাঁসছ। আর বলছ, বাবা আমি ভালো আছি-তুই বাসায় চলে যা। আমার জন্য আর কত কষ্ট করবি! আমি হাসপাতালে থাকতে পারব। সত্যিই মা সেদিন তোমার মুখখানি ছিল হাস্যোজ্জ্বল। আর সেদিন বলেছিলে, আমার সবাই যেন একসঙ্গে মিলেমিশে থাকি।

হাসপাতালে প্রথম ক্যামোথেরাপি শেষেরদিকে যখন মাকে জিজ্ঞাসা করতাম-মা থেরাপি শেষ হলে তুমি কার বাসায় যাবে? তখন মা বলত- আগে নাজুর বাসা, তারপর তোমার বাবার বাড়ি, আর হামিদ খালুর বাসা। আত্মীয় স্বজনে বাসা ঘুরে আবার যখন- হাসপাতালে দ্বিতীয় ক্যামোথেরাপি দেওয়ার জন্য ভর্তি করলাম। তখন আবার মাকে বললাম- থেরাপি শেষে তুমি কোথায় বেড়াতে যাবে? এবার মা বলেছিল- বাড়িতে যাবো। বাড়িতে ঠিকই গেলে-তবে জীবিত না-লাশ হয়ে।

আজ চারপাশে তোমার সব স্মৃতিগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয় তুমি নেই। বিশেষ করে বাড়িতে যখন যায় তখন নাবিল, রাফা, রুহির, রাহাত, তাইয়্যেব তাওহিদের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় তুমি নেই, চলে গেছ তাদেরকে একা ফেলে।

সত্যি মা, তোমার সন্তান আজ খুব একা। সবার ইচ্ছা থাকে বিয়ের সময় মা-বাবার দোয়া-আশীর্বাদ নিয়ে বিয়ে করতে যাবে। কিন্তু মা-আমি সেটা পাইনি। তুমি চলে যাওয়ার পর ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিয়ে করলাম শাকিলাকে। ২০১৮ সালে ২২ এপ্রিল আমি কন‍্যা সন্তানের বাবা হলাম। আজ আমার মেয়েও বুঝতে শিখছে। আনিসা এখন প্রায়ই বলে আমার দাদা-দাদু আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ঈদের আগে দিন আনিসা বাড়িওয়ালাকে বলে, আমার দাদু মারা গেছে। আর বলে আমিতো কাউকে দাদু বলে ডাকতে পারছি না। আমি দোয়া করে আল্লাহ আমার দাদা-দাদুকে বেহেশত বাসী কর। তোমাদের সে খুবই মিস করে মা।

আজ আমার সত্যিই খুবই গর্ব হচ্ছে মা, আমার বউ ডাক্তার হয়েছে। আমি চেয়েছিলাম আমার বউ ডাক্তার হবে। কারণ আমার বাবা-মা দুইজনই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা যায়। আল্লাহর ইচ্ছা ও তোমার দোয়ায় সে ডাক্তার হয়েছে। রোগীদের সেবা করছে। গ্রামে গেলেও এলাকায় লোকজন এসে সেবা নিচ্ছে। আর বলছে, আজ যদি তোমরা বেঁচে থাকতে তাহলে কত না খুশি হতে। তোমার আদরে নাতি নাবিল ক‍্যাডেটের ভর্তি হওয়া জন্য কোচিং করছে। রাফা, রুহি, রাহাত, তাইয়্যেব এরা স্কুলে যাচ্ছে।

মাগো, এখন তো মনকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারি না। তুমিহীনা সেই ঘরে আর যেতে ইচ্ছে করে না। আমরা কেউ বাড়িতে যাচ্ছি শুনলে আগেই পথের সামনে দৌড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে। আর আমি বাড়ির কাছে রাস্তা থেকে ‘মা-মা’ বলে চিৎকার করে ডাকতাম। এখন আর ডাকতে পারি না। কষ্টে বুকটা মুচড়ে ওঠে। বলতে পারো, আমার এই কষ্টের শেষ কোথায়? এবার যখন রংপুরে একা একা ঈদ করলাম? সে কী কষ্ট পেয়েছি মা, কাউকে বুঝাতে পারেনি। শুধু বুক ফেটে কান্না এসেছে।

মাগো, তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল মানুষকে খাওয়ানো। মাগো, তোমার পিঠা বানানোর কথা, খিঁজুড়ি রান্নার কথা- তোমার মৃত্যুর পর সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছে। তোমার উদার দানশীল মন-মানসিকতার জন্য সবাই তোমাকে খুব পছন্দ করত। জানো মা, তুমি চলে যাওয়ার পর সবাই প্রতিদিন, প্রতিক্ষন তোমাকে, তোমার সুকর্মগুলোকে স্মরণ করে। যখনই গ্রামে যাই সবার কাছে শুধু তোমার প্রশংসা শুনি। তখন গর্বে আমাদের বুক ভরে যায়।

তুমি আমাদের মাঝে নেই ভাবতে বড় কষ্ট লাগে। কারণে-অকারণে কত না কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। কখনোই শান্তি দিতে পারিনি, হয়তোবা জীবনভর শুধু উৎকণ্ঠা আর সীমাহীন দুশ্চিন্তায় কেটেছে তোমার অনেকটা সময়। বলতে দ্বিধা নেই, তুমি ছিলে সৃজনশীল শৈল্পিক মনের একজন সরল-সাধারণ মানুষ। সেজন্য সন্তান হিসেবে আমরা গর্বিত। আমি সব সময়ই দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোমার গুনাহ মাফ করে, ভালো কাজের মর্যাদা দেয়। আর আমার যদি কোনো নেককাজ থাকে, এর প্রতিদানও যেন তোমায় দান করে মহান আল্লাহ।

মা দিবসের এই দিনে বিশ্বের সব মমতাময়ী মায়ের জন্য রইলো আন্তরিক শ্রদ্ধা। শুভ মা দিবস।

লেখক: কৃষিবিদ বশিরুল ইসলাম

উপ-পরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

মেইল- [email protected]

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS