অরুণ কুমার বিশ্বাস এর ধারাবাহিক ‘আমাদের ব্যোমকেশ বক্সী’

প্রকাশ | ১৪ অক্টোবর ২০২০, ২২:৫৬ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ২৩:০২

অরুণ কুমার বিশ্বাস
এই সময়ের আলোচিত গোয়েন্দা চরিত্র অলোকেশ রয়ের স্রষ্টা কথাসাহিত্যিক অরুণ কুমার বিশ্বাস

[শেষ পর্ব]

ব্যোমকেশের ছাতা 
রহস্য অনুসন্ধানী বা গোয়েন্দাদের জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রত্যেকের কিছু না কিছু উৎকেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে। ব্যোমকেশও তার ব্যতিক্রম নন। সারাজীবন তিনি একটি বিশেষ ছাতা বহন করতেন। না না, সেটা তার স্ট্যাটাস সিম্বল বা বিলাসিতা নয়, নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে ব্যোমকেশ ওটা জমিয়ে রেখেছিলেন। ছাতার বর্ণনা শুনলেই বুঝতে পারবেন। ‘ছাতাটি ব্যোমকেশের প্রিয় ছাতা; অতিশয় জীর্ণ, লোহার বাঁট এবং কামানিতে মরচে ধরেছে, কাপড় বিবর্ণ এবং বহু ছিদ্রযুক্ত। এই ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তায় বেরুলে নিজে অদৃশ্য থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যায়; ফুটো দিয়ে বাইরের লোককে দেখা যায়, কিন্তু বাইরের লোক ছাতাধারীর মুখ দেখতে পায় না। সত্যান্বেষীর উপযুক্ত ছাতা।’  

শার্লক হোমস এমন কোনো ছাতা বা সানগ্লাস ব্যবহার করতেন কিনা জানা যায় না। তবে তিনি হ্যাট পরতেন। কখনও রোদ থেকে নিজেকে আড়াল করবার জন্য, আবার কখনও মক্কেলের চোখে ধুলো দেবার জন্য। তার টুপির ধরনও ছিল বিচিত্র। যখন যেমন প্রয়োজন, তেমন হ্যাট তিনি পরতেন। সঙ্গে জ্বলন্ত পাইপ। বলা যায়, এও একরকম ছদ্মবেশ। এমন ছদ্মবেশ সকল গোয়েন্দাই কমবেশি ধারণ করেছেন। হালের ডিটেকটিভ অলোকেশ রয় অবশ্য মনে করেন, সাধারণ্যে মিশে গেলেই অপরাধীর উপর নজর রাখা বরং সুবিধাজক। কেষ্টবিষ্টু পোশাক বা অতি সাধারণ করে তুললে নিজেকে চিনিয়ে দেবার ঝুঁকি বেশি থাকে।            

শ্রীসুকুমার সেনের মতে, ব্যোমকেশের ধরন-ধারণ সাধারণ বাঙালির মতোই। সত্যি বলতে, খুব সহজে তার অসামান্যতার পরিচয় পাওয়া যেত না। বাইরে থেকে দেখলে তাকে হয়তো সাধারণই মনে হত, তবে তাকে খোঁচা দিয়ে, প্রতিবাদ করে বা একটু উত্তেজিত করে দিতে পারলেই ভিতরের আসল মানুষটি কচ্ছপের মতো বের হয়ে আসতো। সে স্বভাবতই স্বল্পভাষী, কিন্তু ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে একবার তাকে চটিয়ে দিতে পারলেই শাণিত ছুরির মতো ঝকঝক করে উঠতো সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী।      

ব্যোমকেশের রিফ্লেক্স    
শ্রীসুকুমার সেন যাই বলুন ব্যোমকেশ কিন্তু কেবল বুদ্ধিতে নয়, শরীরিক কসরতেও বেশ পারঙ্গম ছিলেন। তিনি অস্ত্র বহন করেননি বটে, তবে মগজাস্ত্রের পাশাপাশি প্রয়োজনে শরীরটাকে বেশ খাটিয়ে নিতেন। লোহার বিস্কুট গল্পে গোল্ড স্মাগলার মুস্কো দেখতে অক্ষয় মণ্ডল পুলিশ দেখে যেই না পকেটে হাত দিয়েছে (সম্ভবত পিস্তল বের করতে চাইছিল), ব্যোমকেশ কালবিলম্ব না করে হাতের টর্চখানা গদার মতো তার চোয়ালে মারলেন, বাড়ি খেয়ে অক্ষয় ছাদের উপর চিতিয়ে পড়ে গেল।  

মানবিক ব্যোমকেশ
শুরুতেই বলেছি, ব্যোমকেশ বক্সী কোনো অতিমানব ছিলেন না। তিনি আমাদের মতোই সাদা মনের মানুষ; শুধু তার মগজটা একটু নয়, অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি ধোঁয়ার গন্ধ পেয়েই বলে দিতেন ঠিক কী কারণে আগুন এবং কোথায় আগুনটা লেগেছে। কোনো কোনো কেসে তিনি আগুনের সূত্র বা ‘আরসন’ অর্থাৎ অগ্নিকাণ্ডের পেছনের সেই কালো মানুষটিকেও চিনে ফেলতেন। ব্যোমকেশের মানবিক বোধ প্রবল, সাধারণ মানুষের মনের কষ্ট তার মনকেও দ্রবীভূত করতো। সেইজন্যই দুয়েকটি কেসে আসল অপরাধীকে চিনতে পেরেও তিনি তাকে আইনের হাতে তুলে দেননি। বিবেক তাকে বাধা দিয়েছে। তাছাড়া তিনি তো কারো হুকুমের দাস নন। 

‘রক্তের দাগ’ গল্পের শেষপাতে অপরাধী ঊষাপতি ব্যোমকেশের হাত ধরে বললেন, জীবনে তিনি অনেক কষ্ট সয়েছেন, একুশ বছর ধরে শ্মশানে বাস করছেন। পুলিশ তো তাকে ধরতে পারেনি। তাছাড়া খুনটা তার না করে আর কোনো উপায় ছিল না। ব্যোমকেশ যেন আর এই নিয়ে পানি ঘোলা না করেন। ঊষাপতিকে তিনি কথা দিয়েছেন, পুলিশকে তিনি যেচে কিছু বলবেন না। কাজটা হয়তো আইনসঙ্গত হয়নি, ‘কিন্তু আইনের চেয়েও বড় জিনিস আছে-‘ন্যায়ধর্ম।’ ব্যোমকেশ বিবেকের কথা শুনেছেন, আইনের নয়। এটা তাঁর বড় মনের পরিচয়। 

‘অর্থমনর্থম্’ গল্পেও আমরা একজন মানবিক ব্যোমকেশকে দেখতে পাই। পরবর্তীতে তার স্ত্রী সত্যবতী, তার ভাই সুকুমারকে বাঁচানোর তাঁর যে প্রয়াস, তাতে সত্য অনুসন্ধানের পাশাপাশি মানবিক বোধের পরিচয় আমর লক্ষ্য করি। এই কেসে কেউ তাকে নিযুক্তও করেনি, তাই বকশিশ প্রাপ্তিরও কোনো সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তারপরও ব্যোমকেশ নিজ উদ্যোগে কেসের কিনারা করেন, শুধু সত্যবতীর মুখ চেয়ে। ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাতে এক বোনের আর্তি তাকে আপ্লুত করেছিল তাই। ব্যোমকেশ বলেন, ‘আপনার দাদা সত্যি যদি নির্দোষ হন, আমি প্রাণপণে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করব।’  

‘হেঁয়ালির ছন্দ’ গল্পেও ব্যোমকেশের মানবিকবোধের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করি। মেসমেম্বার ভূপেশবাবু নটবর নস্করের খুনি জেনেও ব্যোমকেশ তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেননি। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নটবর লোকটা মোটেও সুবিধের ছিল না। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের আগে ঢাকায় যে দাঙ্গা বাঁধে, তখন এই নটবরই ভূপেশের ছেলেকে অপহরণ করে। তারপর ছেলেকে ফেরত দেবে বলে দশ হাজার টাকা চাইলেও ছেলেকে সে আর ফেরত দেয়নি। সেই শোকে ভূপেশের স্ত্রী মারা যান। তার অনেকদিন পরে কলকাতায় নটবরকে দেখে চিনে ফেলেন ভূপেশবাবু। আর তখনই সিদ্ধান্ত নেন নটবরকে চরম শাস্তি দেবেন ভূপেশ। কেসটা জানলেও ব্যোমকেশ চেপে যান। বললেন, ‘সাহিত্য সম্রাট শরৎচন্দ্র কোথায় যেন একবার বলেছিলেন, দাঁড় কাক মারলে ফাঁসি হয় না। আমার বিশ্বাস শকুনি মারলেও ফাঁসি হওয়া উচিত নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ভূপেশবাবু।’       

‘খুঁজি খুঁজি নারি’ গল্পে (ভাদ্র, ১৩৬৮) ব্যোমকেশ কোনোরকম লাভের আশা না করেই রামেশ্বরবাবুর রেখে যাওয়া উইল খুঁজতে প্রাণপাত করেন। উদ্দেশ্য একটাই- যাতে রামেশ্বরের অনাথা মেয়ে নলিনী তার বাবার সম্পত্তির ভাগ বুঝে পায়। শুধু তাই নয়, পেঁয়াজের অদৃশ্য কালিতে লিখে যাওয়া সাক্ষীবিহীন উইল আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা সেই বিষয়ে ব্যোমকেশ ইন্সপেক্টর হালদারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ইন্সপেক্টর অবশ্য তাকে নিরাশ করেননি। করমর্দন করে বলেছেন, ‘আপনি ভাববেন না। ওরা উইল কনটেস্ট করতে সাহস করবে না। যদি করে আমি সাক্ষী দেব।’  

একবারে শুরুর গল্প ‘সত্যান্বেষী’র শেষে অজিতের বক্তব্য, ব্যোমকেশ আমার কাঁধে হাত রাখিয়া বলিল- ‘না ভাই প্রতিদান নয়, মনে হচ্ছে, তোমার সঙ্গে এক জায়গায় না থাকিলে আর মন টিকবে না। এই ক’দিনেই কেমন একটা বদ-অভ্যাস জন্মে গেছে।’ অর্থাৎ বরাবরই বন্ধুবৎসল ব্যোমকেশ। তিনি আসঙ্গপ্রিয় ও মানবিকবোধের অধিকারী। বলা যায়, তাঁর এই গুণটি সুসাহিত্যিক অজিতের সঙ্গে তাকে জুড়ে দিয়েছিল। নইলে আমরা হয়তো শরদিন্দুর এই বিশাল সাহিত্যসম্ভার থেকে বঞ্চিত হতাম। কেননা, হোমসের যেমন একজন ডা. ওয়াটসন দরকার ছিল, তেমনি ব্যোমকেশেরও চাই অজিতের মতো বিশ্বস্ত ও অনুগত একজন সঙ্গী, বন্ধু ও সাহিত্যিক, যে কিনা তার সত্যানুসন্ধানে মাথা গলানো শুধু নয়, এই কেসগুলোকে গল্পের আকারে উপস্থাপনেরও দায়ভারও গ্রহণ করেছিল।  

ব্যোমকেশ বনাম শার্লক হোমস
ব্যোমকেশের কথা বলতে গেলে বারবার শার্লক হোমসের প্রসঙ্গ উঠে আসে তার কারণ, প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষে শরদিন্দু ব্যোমকেশ চরিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে কোনান ডয়েলের ছায়া কিছুটা হলেও নিয়ে থাকবেন। অনুসন্ধানের রকমসকমে প্রচ্ছন্ন কিছু সাদৃশ্য কোথাও দেখা গেলেও সরাসরি ডয়েলের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেননি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। মিলের কথা যদি বলি, হোমসের যেমন ওয়াটসন, ছায়াসঙ্গী, ব্যোমকেশের তেমনি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। হোমস-ওয়াটসন যেমন বন্ধু ও পরস্পরের সহযোগী, ব্যোমকেশের ক্ষেত্রেও তাই। 

তবে তাদের চরিত্রগত মিল একেবারেই নেই। শার্লক হোমস ও অগস্ত দ্যুঁপা দুজনেই চরম অসামাজিক, নারীবিদ্বেষী ও বোহেমিয়ান। কিন্তু ব্যোমকেশ ঠিক তার উল্টো। তিনি সামাজিক, বন্ধুবৎসল এবং অতি অবশ্যই নারীবিদ্বেষী নন। দ্যুঁপা তো বলতে গেলে নিশাচর। আমি বলিনি, একথা তার নাম না-জানা সেই ‘ন্যারেটর’ বা গল্পের কথক নিজেই বলেছেন। তারা দুজন থাকতেনও প্যারিসের এক পরিত্যক্ত ঘরে, যেখানে কিনা অতিথির আগমন পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। এমন কি, তারা নিজেরাও পারতপক্ষে কাউকে দেখা দিতেন না। তিনটি গল্পে আমার শুধু প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্ট মিস্টার ‘জি’ আর কয়েকজন পথচারীর সঙ্গে দ্যুপাঁকে কথা বলতে দেখি। অগস্ত দ্যুঁপা প্যারিস পুলিশেরও নিন্দামন্দ করতেন খুব। তারা নাকি মাথামোটা, জানেই না কোনো কেসের তদন্ত করতে গিয়ে কী দেখতে হয়, আর কী জানতে হয়। সেই তুলনায় হোমস অবশ্য ‘এ বিট মোর এগ্রিবল’, অর্থাৎ লন্ডন পুলিশের সঙ্গে সম্ভাব রেখে চলতেন।   

অজিত-ব্যোমকেশ কেমিস্ট্রি   
আমি মনে করি, শরদিন্দুর ব্যোমকেশের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অজিতের সঙ্গে তার আলাপ-পরিচয়, বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া। তাদের দুজনের আলাপটাও কিন্তু বেশ নাটকীয়। সে ১৩৩১ সালের কথা, পুলিশ কমিশনারের অনুমতি নিয়ে ব্যোমকেশ সেই অঞ্চলে এক মেসে কিছুদিনের জন্য ঠাঁই নিলেন। মেসের মালিক হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার অনুকূল মেসে জায়গা নেই বলে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রায়। অমনি একজন মেসবাসী অনুকম্পা করে ব্যোমকেশকে নিজের ঘরে স্থান দেন। তার নাম অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই সূত্রে রুমমেট দুজনের মাঝে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ও দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।  

‘সত্যান্বেষী’ গল্পের গল্প এটি। সেই যে মেসের কথা বললাম, তার মালিক অনুকূল খুনের দায়ে জেলে যায়। ফলে অজিতের তার সেখানে থাকা হয়ে ওঠে না। সে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। অমনি ব্যোমকেশ হ্যারিসন রোডে তার নিজের বাসায় অজিতকে থাকার প্রস্তাব দেয়, অজিতও রাজি হয়। একেই বুঝি বলে ‘আইরনি অফ ফেইট’! অজিত ব্যোমকেশকে যখন নিজের মেসের ঘরে জায়গা দিল, তখন কি সে জানতো যে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তাকে আবার ব্যোমকেশের বাড়িতেই ঠাঁই খুঁজতে হবে! এরকম বুঝি কেবল গল্পতেই হয়, বাস্তবে নয়। এমন পরিহাস অবশ্য পরেও একবার ঘটেছে। সত্যবতীর সঙ্গে ব্যোমকেশের দেখা, পরিচয় ও পরিণয়। সত্যানুসন্ধান করতে গিয়ে নিজের স্ত্রীকে খুঁজে পান ব্যোমকেশ বক্সী। বলা যায় একরকম ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’। ‘অর্থমনর্থম্’-এ খুনের দায়ে প্রায় ফেঁসে যাচ্ছিল সুকুমার। আইনসঙ্গতভাবেই তাকে বাঁচান ব্যোমকেশ, কেসের বিনিময়ে টাকাকড়ি তো কিছু পাননি, তবে নিজের জীবনসঙ্গিনীকে ঠিকই খুঁজে পেলেন ব্যোমকেশ। তার মানে কেসখানা একেবারে নির্জলা যায়নি।  

অজিত কেবল তাঁর বন্ধুই নয়, একেবারে যাকে বলে অভিন্নহৃদয় বন্ধু। এঁটুলির মতো সারাক্ষণ তার সঙ্গে সেঁটে থাকে অজিত। রোদ-বৃষ্টি ঝড়জল সবকিছু তারা দুজন একসাথে মাথায় করে একই ছাদের নিচে বাস করেন। শুরুতে হ্যারিসন রোডে, তারপর ব্যোমকেশের নতুন বাড়ি কেয়াতলায়। ‘ছলনার ছন্দ’ গল্পে আমরা তাদের নতুন বাড়িতে যাবার খবর পাই। ‘ব্যোমকেশরা মাত্র ছয় মাস হলো কেয়াতলার নতুন বাড়িতে এসেছে। বাড়িটা ছোট, কিন্তু দোতলা। নিচে তিনটি ঘর, ওপরে দুটি। সত্যবতী এই বাড়িটি নিয়ে সারাক্ষণ যেন পুতুল খেলা করছে। ব্যোমকেশ কিন্তু নির্বিকার, শালগ্রামের শোয়া-বসা বোঝা যায় না।’ অর্থাৎ স্থিতধী মানুষ ছিলেন ব্যোমকেশ বক্সী। শালগ্রামের মতো সুখে-দুখে নির্বিকার। 

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৬৫ সালের ১৬ নভেম্বর ‘ছলনার ছন্দ’ প্রকাশিত হয়, তার ছয় মাস আগে অর্থাৎ একই সালের মে মাসের দিকে কেয়াতলার বাড়িতে ওঠেন ব্যোমকেশের পরিবার ও সারাক্ষণের সঙ্গী অজিত। এমনটি কিন্তু শার্লক হোমসের ক্ষেত্রে ঘটেনি। তার অবশ্য কারণ ছিল। হোমস বিয়ে না করলেও ওয়াটসন কিন্তু করেছিলেন। ‘কনফার্মড ব্যাচেলর’ তিনি নন। ফলে তাকে ২২১বি, বেকার স্ট্রিটের মিসেস হাডসনের বাড়ি কিছুদিনের জন্য ছাড়তে হয়েছিল। কারণ বউ নিয়ে থাকবার মতো জায়গা সেখানে ছিল না। স্ত্রীবিয়োগের পরে অবশ্য আবারও বেকার স্ট্রিটের বাসায় ফিরে আসেন ডা. ওয়াটসন।     

পাঁচকড়ি দে’র পরে মৌলিক গোয়েন্দাগল্প লিখে যিনি পাঠকের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছেন তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে মজার ব্যাপার এই, ক্রাইম নভেলের সাব-জঁরা হিসেবে গোয়েন্দাগল্প এলেও শরদিন্দুর ব্যোমকেশ বক্সী নিজেকে কখনও ‘গোয়েন্দা’ বলে পরিচয় দিতেন না। তার পরিচয় তিনি নিজেই ঠিক করেছিলেন- সত্যান্বেষী। হতে পারে তিনি এডগার অ্যালার পো’র চরিত্র অগস্ত দ্যুঁপা’র অনুসারী, নয়তো রহস্য অনুসন্ধানের কাজটিকে তিনি পেশা হিসেবে নেননি বা এই কাজের বিনিময়ে তিনি কোনো অর্থকড়ি বা ফিস প্রত্যাশা করতেন না বিধায় নিজেকে তিনি গোয়েন্দা বলে দাবি করতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। রহস্যপ্রিয় ব্যোমকেশ কেসের অনুসন্ধান করেই পরিতৃপ্ত ছিলেন, যদিও কোনো কোনো কেসে তিনি কিঞ্চিত বকশিশ গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রেও অ্যালান পো’র অগস্ত দ্যুপা’র সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়।  তিনটি কেসের শেষটাতে অর্থাৎ ‘দ্য পারলয়ন্ড লেটার’ গল্পে দ্যুঁপা প্যারিসের পুলিশ প্রিফেক্ট মিস্টার জি-এর কাছ থেকে চিঠি খুঁজে দেয়া বাবদ পঞ্চাশ হাজার ফ্রাঁ রিওয়ার্ড বা বকশিশ গ্রহণ করেন। তিনি বকশিশ নিতেন তাই বলা হয় ব্যোমকেশের পদবী স-বর্জিত বক্সী।  

‘সত্যান্বেষী’ দিয়ে শরদিন্দুর ব্যোমকেশ সিরিজ শুরু হয় (আষাঢ়, ১৩৩৯), মতান্তরে ‘পথের কাঁটা’। একই বছর তাঁর মোট তিনটি গল্প প্রকাশিত হয়। সত্যান্বেষী, পথের কাঁটা ও সীমন্ত-হীরা। শরদিন্দু তাঁর একটি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘ডিটেকটিভ গল্প সম্বন্ধে অনেকের মনে একটা অবজ্ঞার ভাব আছে- যেন উহা অন্ত্যজ শ্রেণীর সাহিত্য। আমি তাহা মনে করি না। এগডার অ্যালান পো, কোনান ডয়েল, জি কে চেস্টারটন যাহা লিখিতে পারেন, তাহা লিখিতে অন্তত আমার লজ্জা নাই।’ 

৩০ মার্চ, ১৮৯৯ সালে উত্তর প্রদেশের জৌনপুর শহরে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। বাবা তারাভূষণ, মা বিজলী প্রভা। আদিবাড়ি উত্তর কলকাতা, বরানগর, কুঠিঘাট অঞ্চলে। পড়াশুনা মুঙ্গেরে, কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে। বিএ পাশ করে ল কলেজে ভর্তি হন। শেষ পর্যন্ত পাটনা থেকেই তিনি আইন পাশ করেন। কবিতা দিয়েই লেখালেখির শুরু। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যৌবনস্মৃতি’ (১৩২৫ বঙ্গাব্দ)। টানা কয়েক বছর ব্যোমকেশ সিরিজ লিখে ১৯৩৮ সালে তিনি বোম্বাই পাড়ি জমান, সেখানে চিত্রনাট্য লেখা কাজ শুরু করেন। তারপর সিনেমার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৫২ সাল থেকে পুনাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর জ্যোতিষচর্চায় গভীর আগ্রহ ছিল বলে জানা যায়। ১৯৭০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

অরুণ কুমার বিশ্বাস: কথাসাহিত্যিক