logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি অনলাইন

  ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:১৪
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:২৪

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা বাড়াবে ভারতের ২৫ বছর বয়সী কোটিপতি হোটেল ব্যবসায়ী

India's 25-year-old hotel billionaire eyes a US expansion
ছবি সংগৃহীত
কলেজের পড়াশোনা শেষ না করা রিতেশ আগারওয়াল, গত মাত্র ছয় বছরে ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী কোটিপতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারতের রাজধানী দিল্লির অদূরে গুরুগাঁও শহরে বাজেট হোটেল চেইন ওয়ো চালু করেন রিতেশ। আর এখন ২৫ বছর বয়সে বিশ্বজুড়ে নিজের ব্যবসা ছড়িয়েছেন রিতেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চাইছেন তিনি।

ওয়োর সবচেয়ে বড় মার্কেট ভারত। সেখানে ১৮ হাজার লোকেশনে ওয়োর হোটেল রয়েছে। তবে চীনেও খুব দ্রুত নিজেদের ব্যবসার প্রসার করছে ওয়ো। দেশটিতে ৩৩৮টি শহরে ১৩ হাজারে লোকেশনে হোটেল রয়েছে ওয়োর। লাল-সাদা লোগো সম্বলিত কোম্পানিটির উপস্থিতি যুক্তরাজ্য, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও রয়েছে।

কিন্তু রিতেশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার পরবর্তী বড় সুযোগ। তিনি বলেন, আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আতিথেয়তার সবচেয়ে বড় মার্কেট এবং তাই আমাদের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০টি লোকেশনে হোটেল রয়েছে ওয়োর, কিন্তু রিতেশ আরও হোটেল চান। গত আগস্টে নেভাডায় ৬৫৭ রুম বিশিষ্ট হুটার ক্যাসিনো হোটেল কিনে নেয় ওয়ো, পরে সেটিকে ওয়ো হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনো লাস ভেগাস হিসেবে রিব্র্যান্ড করেন রিতেশ।

হুটারস হোটেল কিনে নিলেও, ওয়ো সাধারণত এভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে না। বিশ্বজুড়ে তাদের যতগুলো হোটেল রয়েছে, তার মধ্যে মাত্র দুটি হোটেল কোম্পানিটির মালিকানাধীন। আর বাকি সব হোটেল ফ্রাঞ্চাইজড বা এসব লোকেশন লিজ নিয়েছে ওয়ো।

ওয়োর হোটেল পার্টনাররা তাদের ‘সহযোগী’ থাকে এবং হোটেলের মালিকানাও তাদেরই থাকে। ওয়ো কেবল ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ডিং, ইউনিফর্ম সার্ভিস এক্সপেরিয়েন্স এবং বেশি মাত্রায় রুম ভাড়ার গ্যারান্টি দেয়। এসব সার্ভিসের জন্য সহযোগী হোটেলগুলোর কাছ থেকে একটা চার্জ নেয় ওয়ো, যেটা সাধারণত এসব হোটেলের গ্রোস মার্জিনের এক ভাগ। এছাড়া ওয়োর অনলাইন নেটওয়ার্কে তালিকাবদ্ধ হওয়ার জন্য তাদের অংশীদারদের কাছ থেকে আলাদা ফি নেয় ওয়ো।

সহযোগী সব হোটেলের বাইরে ওয়োর লোগো লাগানো থাকে। মার্কেট ভেদে প্রতি রাতের জন্য ওয়ো হোটেলের ভাড়া ১৫-১৫০ ডলার। তবে ওয়োর গড় বৈশ্বিক রুম রেট হচ্ছে ৩০ ডলার।

ওরাভেল ট্রাভেল নামে একটি অনলাইন সার্ভিস হিসেবে ২০১২ সালে প্রাথমিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ওয়ো। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মের একটি অংশীদার লাইটস্পিড ভেঞ্চার পার্টনারসের বেজুল সোমাইয়া বলেন, এটা অনেকটা এয়ারবিএনবি’র কনসেপ্টের মতো।

২০১৩ সালে রিতেশ থিয়েল ফেলোশিপের জন্য মনোনীত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে পরিচয় হয় সোমাইয়া। নিজেদের উদ্ভাবনী ব্যবসায়ী আইডিয়া বাস্তবায়নে কলেজ ছুট উদ্যোক্তাদের এক লাখ ডলার অনুদান দিতে দুই বছরের এই প্রোগ্রাম চালু করেন পেপালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল।

সোমাইয়া বলেন, সাধারণত ভারতীয় উদ্যোক্তা নির্বাচিত হন না, তাই আমরা রিতেশের দিকে নজর দেই। কিন্তু রিতেশের ব্যবসায়িক আইডিয়া খুব একটা পছন্দ হয়নি সোমাইয়ার।

তিনি বলেন, আমি তাকে (রিতেশ) বলি যে ভারতের জন্য এই মডেলটা সঠিক নয়। শেয়ারিং ইকোনমি মডেল ভারতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ কারণ সেখানে মান ও নিরাপত্তার মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তবে আইডিয়ার জন্য আরও উন্নত একটি অ্যাপ্রোচের কথা বলেন রিতেশ। তখন তিনি সোমাইয়াকে ওয়ো রুমের কথা বলেন, যেটি রিতেশ ২০১৩ সালে অনেকটা চুপচাপ চালু করেছিলেন।

ওয়ো, মূলত একটি সংক্ষিপ্ত রূপ যেটির মানে হচ্ছে ‘অন ইউর ওউন’, এটি এমন একটি ওয়েবসাইট যা বিনামূল্যে ভারতে ওয়াইফাই, ফ্ল্যাটস্ক্রিন টিভি, মানসম্পন্ন লিনেন এবং ব্র্যান্ডযুক্ত টয়লেটরিজের মতো মানসম্মত সুযোগসুবিধা ব্র্যান্ডেড বাজেটের হোটেল কক্ষগুলোতে সরবরাহ করতো।

রিতেশের এই আইডিয়া লাইটস্পিড ভেঞ্চারসের পছন্দ হয়ে যায় এবং তারা এই প্রজেক্টে ছয় লাখ ডলার বিনিয়োগ করে।

২০১৬ সালের মধ্যে ওয়ো তাদের বিজনেস মডেল প্রসার করে। এই প্রক্রিয়ায় কোনও হোটেল রুমকে আপডেট করা বা রিসেল করার চেয়ে, ওয়ো পুরো হোটেলটিকে তাদের প্রোপার্টি হিসেবে রিব্র্যান্ড করে এবং সহযোগীদের সঙ্গে ফ্রাঞ্চাইজি ও লিজের মাধ্যমে চুক্তি করে।

বর্তমানে বিশ্বের ৮০০টি শহরে ৩৫ হাজারের বেশি হোটেল ও ২০ হাজার কর্মী রয়েছে ওয়োর, যার অর্ধেকেই আবার ভারতে। তার প্রতিষ্ঠানের আয় কত সেটি বলতে অস্বীকার করেছেন রিতেশ, তবে এটি এখনও লাভজনক পর্যায়ে যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

ওয়োতে সফটব্যাংক, সেকুইয়া ক্যাপিটাল ইন্ডিয়া, এয়ারবিএনবি ও গ্রিনওকস ক্যাপিটাল বিনিয়োগ করেছে, যার পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার।

গত অক্টোবরে আরও ১৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে ওয়ো, এর মধ্যে রিতেশের ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে এখন কোম্পানিটিতে রিতেশের ৩০ ভাগ শেয়ার হয়েছে। এছাড়া লাইটস্পিড ভেঞ্চার পার্টনারস ও সেকুইয়া ক্যাপিটালের কাছ থেকে ১৩০ কোটি ডলার সমপরিমাণ শেয়ার কিনে নিয়েছেন রিতেশ। ওয়ো বলছে, এর মধ্য দিয়ে তাদের সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া সহজ হবে।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওড়িষ্যায় বড় হওয়া রিতেশ খুব সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সম্ভবত শহরের ৭০ ভাগের বেশি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করতো। আমি কখনও অভিযোগ করিনি কিন্তু বাইরের দুনিয়া কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা ছিল না।

রিতেশ ছোটকাল থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি উদ্যোক্তা হতে চান। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিভিন্ন দোকানে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রির কাজ নেন রিতেশ।

বিষয়টা তার পরিবার ভালোভাবে নেয়নি। রিতেশ বলেন, তারা আমাকে আমার পড়শোনায় মন দিতে বলতো। আমার বড় ভাইবোন ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিজনেস নিয়ে পড়াশোনা করেছে। আমি ছিলাম অনেকটা কলঙ্কস্বরূপ।

১০ম শ্রেণির পড়াশোনা শেষে রিতেশ অন্য শহরে চলে যান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি পুরো সপ্তাহ ক্লাস করতেন এবং সপ্তাহান্তে  উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পরিচয় বাড়াতে দিল্লিতে নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে যোগ দিতেন। এসব ট্রিপের সময় তিনি কম দামি ও পরিষ্কার আবাসনের অভাব অনুভব করেন। তখনই তিনি ওরাভেল স্টেস-র আইডিয়াটা পান।

কিন্তু রিতেশ যখন ওরাভেল চালু  করেন, তখন কিছু একটার কমতি রয়েছে বলে তিনি অনুভব করেন। তিনি বলেন, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার আইডিয়া বড় কিছু হবে কিনা। ব্যতিক্রমী কিছু একটার কমতি ছিল।

পরবর্তী তিন মাস তিনি দেশজুড়ে ঘুরে বেরিয়েছেন এবং তার সাবেক কিছু ওরাভেল ক্লায়েন্টের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন এবং হোটেল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এভাবেই তিনি ছোট বাজেট হোটেলের আইডিয়া পান।

তিনি বলেন, আমি এটা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যদি আমি ব্যর্থ হতাম, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার পথ খোলাই ছিল।

তিনি গুরুগাঁও একটি লোকেশন লিজ নিয়ে ওয়ো শুরু করেন। প্রথম কয়েক মাস আমরা দিনে একটি থেকে দুটি হোটেল তালিকাবদ্ধ করতাম।

তবে বাজেট হোটেলের পাশাপাশি ওয়ো টাউনহাউজেসও চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু নিজেদের ব্যবসায়িক নীতি ও মান নিয়ন্ত্রণে অভাব যেমন পরিষ্কার নিয়ে অসঙ্গতি এবং কাস্টমারদের অভিযোগ দ্রুত হোটেল স্টাফদের সমাধান না করার মতো বিষয় নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পড়ে ওয়ো।

রিতেশ বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যখন অভিজ্ঞতার বিষয়টি আসে, তখন উন্নতির জায়গা রয়েছে এবং কাস্টমারদের কথা শুনলে এবং সংশোধনী  পদক্ষেপ নিলে পদ্ধতিগত পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের নেটওয়ার্ক হোটেলগুলো যেন ভালো মান ও সেবা বজায় রাখে তা নিশ্চিত কিছু চেক অ্যান্ড ব্যালান্স শুরু করেছি।

তিনি আরও বলেন, ওয়োর কাস্টমারদের প্রায় ৯০ ভাগই রিপিটেড কাস্টমার ও অন্যের রেফারেল শুনে আসা ব্যক্তি।

২০ হাজার সদস্যদের ফেডারেশন অব হোটেলস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া গত বছরের ডিসেম্বরে রিতেশকে ওয়োর সহযোগীদের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে চিঠি পাঠায়। সেখানে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির কমিটির ‘অনেক বেশি’ এবং এমনিতেই কম ভাড়ার রুমগুলোর রেট আরও কমিয়ে দিচ্ছে নিজেদের ওয়েবসাইটে।

তবে ওয়োর মতো এমন অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর খবরদারি মেনে নেবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ফেডারেশন অব হোটেলস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিমাংশু তালওয়ার।

পার্টনারদের সঙ্গে বিভিন্ন রকম সমস্যা সমাধানে একটি পার্টনার এনগেজমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করার কথা জানিয়েছেন রিতেশ। এর মধ্যে যেকোনো বিবাদ মেটাতে হোটেল পার্টনারদের জন্য হটলাইন চালু, পেমেন্ট সম্পর্কিত তথ্য ট্র্যাক করতে ফ্রাঞ্চাইজিদের জন্য জন্য অ্যাপ চালু। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি হোটেল মালিকদের সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে এবং তারা যেন আরও ভালো কাজ করতে পারে সেজন্য আমাদের ভালো কাজ করতে হবে।

তবে এখনও অনেক শেখার বাকি আছে বলে স্বীকার করেন রিতেশ। তিনি বলেন, আমার বয়স এখন মাত্র ২৫। আমি সৌভাগ্যবান যে আমার চারপাশে মেধাবী ও নেতা রয়েছেন, যারা আমাকে আরও ভালো করার জন্য ধাক্কা দিয়েছে। আমি সবসময় বড় কিছুর লক্ষ্যে বিশ্বাস করেছি। আমি এটা অব্যাহত রাখবো।

এ/ এমকে

RTVPLUS