logo
  • ঢাকা বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

কুয়েতে নারী গৃহকর্মী কেনাবেচার বিশাল অনলাইন বাজার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি অনলাইন
|  ০২ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৩৪ | আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫৮
কুয়েত, ফেসবুক
হাজার হাজার নারীকে অবৈধভাবে কুয়েতে নিয়ে এসে গৃহকর্মী হিসাবে বিক্রি করা হয়
কুয়েতে নারী গৃহকর্মী কেনাবেচার বিশাল অনলাইন বাজারের তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত করার কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের তদন্ত অনুসারে, গুগল ও অ্যাপলের অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে নারী গৃহকর্মী কেনাবেচার পাশাপাশি ফেসবুক মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রামেও এই ব্যবসা চলছে।

অনলাইনে কুয়েতের গৃহকর্মীদের বেচাকেনার বাজার

এসব অনলাইন মাধ্যমে গৃহকর্মী কেনাবেচার বিজ্ঞাপনে হ্যাশট্যাগে লেখা হয়ে থাকে, মেইডস ফর ট্রান্সফার বা মেইডস ফর সেল।

দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নারী গৃহকর্মী কেনাবেচার বিষয়ক বিজ্ঞাপনগুলো অনলাইন মাধ্যমগুলো থেকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া এর সঙ্গে জড়িতদের একটি মুচলেকায় সই করতে হবে যাতে লেখা থাকবে তারা ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনও কিছু করবে না।

বিবিসির তদন্ত

কুয়েতের পথেঘাটে চলাফেরার সময় আপনি এই নারীদের দেখতে পাবেন না। কারণ তারা কোনও মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে না। তারা ছুটি পায় না।

তবে একটি স্মার্টফোনের অ্যাপের সাহায্যে এই নারীদের কয়েক হাজার ছবি দেখতে পারবেন। তাদের শ্রেণি ও বর্ণসহ বিস্তারিত তথ্য পাওয়া এবং মাত্র কয়েক হাজার ডলারের বিনিময়ে তাদেরকে কেনা যাবে।

বিবিসি অ্যারাবিকের গোপন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশটির বিস্তার হতে থাকা অনলাইন ব্ল্যাকমার্কেটে গৃহকর্মীদের অবৈধভাবে কেনাবেচা করা হচ্ছে।

এর অনেক ব্যবসা ফেসবুক মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রামে হচ্ছে। এখানে বিশেষ হ্যাশট্যাগ দিয়ে নারী গৃহকর্মীদের ছবি আপলোড করা হয়। এরপর ব্যক্তিগত মেসেজে দরদাম চলে।

এর বাইরে গুগল ও অ্যাপলে অনুমোদিত অ্যাপের মাধ্যমে গৃহকর্মীদের বেচাকেনা হয়। পাশাপাশি এই ব্যবসা চলছে ই-কমার্স ভিত্তিক কয়েকটি ওয়েবসাইটে।

ছদ্মবেশে দাসত্ব প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ার উর্মিলা ভোলা বলছেন, দেশটিতে একটি অনলাইন দাস ব্যবসা চালু করেছে।

তিনি আরও বলেন, যেসব কোম্পানি এই ধরনের অ্যাপ হোস্টিং করে থাকে, সেগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।

এই বিষয়ে ফেসবুক জানিয়েছে, তারা এই ধরনের হ্যাশট্যাগ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে গুগল ও অ্যাপল জানিয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য তারা অ্যাপ ডেভেলপারদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে।

দাসের বাজার

কুয়েতের প্রতি দশটি বাড়ির অন্তত নয়টি বাড়িতে গৃহকর্মী থাকে। তারা বিভিন্ন দরিদ্র দেশ থেকে অর্থ উপার্জনের আশায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসে। সম্প্রতি কুয়েতে আসা এক দম্পতির ছদ্মবেশে বিবিসি অ্যারাবিকের গোপন অনুসন্ধানী দলটি ৫৭ জন অ্যাপ ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলেছে।

গোপন অনুসন্ধানের সময় গৃহকর্মী বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ রেকর্ড করেছে বিবিসির অনুসন্ধানকারী দল

এছাড়া দলটি কয়েক ডজন ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছে, যারা তাদের বাড়িতে থাকা গৃহকর্মীকে ফোরসেল নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করে বিক্রি করতে চান।

এই বিক্রেতারা তাদের গৃহকর্মীদেরকে পাসপোর্ট জব্দ করে আটকে রেখেছে। তাদেরকে ফোন ব্যবহার করতে দেয়া হয় না, দিলেও খুব কম সময়ের জন্য।

এই অ্যাপে এক বিজ্ঞাপন দাতা লিখেছেন, আফ্রিকান কর্মীরা পরিষ্কার আর হাসিখুশি। আরেকজন লিখেছেন, নেপালি কর্মীরা ছুটি চাইতে সাহস করে না। ভারতীয়রা সবচেয়ে নোংরা বলেও মন্তব্য করেছেন এক বিজ্ঞাপনদাতা।

এই বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের কাছ থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বর্ণবাদী মন্তব্য শুনতে পায় বিবিসি দলটি।

---------------------------------------------------------------
আরো পড়ুন: ইন্দোনেশিয়ায় পরকীয়ায় জড়ানোয় দুজনকে বেত্রাঘাত
---------------------------------------------------------------

মানবাধিকার লঙ্ঘন

যারা এসব অ্যাপ ব্যবহার করেন, তারা নিজেদেরকে নারী গৃহকর্মীদের মালিক বলে মনে করেন। তারা গৃহকর্মীদেরকে সপ্তাহে একদিন তো দূরের কথা এক মিনিটও ছুটি দেয় না।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসির দলটিকে বলেন, বিশ্বাস করুন, এই গৃহকর্মী খুবই ভালো। আপনি যদি ভোর পাঁচটা পর্যন্ত জাগিয়ে রাখেন, তবু অভিযোগ করবে না।

তার কথায় বেরিয়ে আসে, কিভাবে নারীদের পণ্যের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোনো গৃহকর্মীকে ৬০০ কুয়েতি দিনারে কিনলে তাকে এক হাজার কুয়েতি দিনারে বিক্রি করা সম্ভব।

তিনি পরামর্শ দেন, কিভাবে কেনা গৃহকর্মীর সঙ্গে বিবিসি দলটির আচরণ করা উচিত। তার পাসপোর্ট কখনোই তাকে দেবেন না। আপনি তার স্পন্সর। আপনি কেন তাকে তার পাসপোর্ট দেবেন?

একটি ঘটনায় বিবিসির টিমকে ফাতুউ (ছদ্মনাম) নামে ১৬ বছর বয়সী একজন গৃহকর্মীকে কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়। যদিও দেশটিতে ২১ বছরের নিচে গৃহকর্মী আসা নিষিদ্ধ। গিনি থেকে পাচারকারীদের শিকার হয়ে ফাতুউকে কুয়েতে নিয়ে আসা হয়। গত ছয় মাস ধরে তিনি দেশটিতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। ফাতুউকে প্রথমে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। দুইদিন পরে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

কুয়েত সিটিতে বিক্রেতার সঙ্গে ১৬ বছরের ফাতুউ (ছদ্মনাম)

ফাতুউ বিবিসিকে বলেন, তারা আমার সঙ্গে শুধু চিৎকার করতো। আমাকে জানোয়ার বলে ডাকতো। এটা খুব খারাপ লাগতো, মন খারাপ হয়ে যেত। কিন্তু আমার করার কিছু ছিল না।

ফাতুউয়ের মামলাটির যিনি দেখছেন, সেই আমেরিকান আইনজীবী কিম্বারলি মোটলে বলছেন, যারা এসব অ্যাপ বানাচ্ছে, তাদেরও ফাতুউকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

কুয়েতে এরকম দাসত্বের ব্যবসা যদিও সবে শুরু হচ্ছে। কিন্তু বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৌদি আরবে হারাজ নামের আরেকটি অ্যাপ ব্যবহার করে শত শত নারী কেনাবেচা করা হচ্ছে।

গিনির কোনার্কিতে ফাতুউয়ের বাড়ি

সত্যিকারের দোজখ

সাবেক এক গৃহকর্মী বলেছেন, কুয়েত হলো সত্যিকারের একটি দোজখ। এখানে গরুর সঙ্গে গৃহকর্মীদের থাকতে বাধ্য করা হয়। কুয়েতের বাসাগুলো খুব খারাপ। কোনও ঘুম নেই, খাবার নেই, কিছু নেই।

কুয়েতের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কুয়েতের জনশক্তি বিষয়ক কর্তৃপক্ষের প্রধান ড. মুবারক আল-আজিমি বলেছেন, ফাতুউয়ের ঘটনাটি তারা তদন্ত করছেন। যে পুলিশ কর্মকর্তাকে বিবিসির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এই তদন্তের ফল হতে পারে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া।

কে/পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ
  • আন্তর্জাতিক এর পাঠক প্রিয়