শ্রীলঙ্কায় মুসলিমরা নিজেরাই ভাঙলো মসজিদ

প্রকাশ | ১০ জুন ২০১৯, ১০:১৭ | আপডেট: ১০ জুন ২০১৯, ১০:৫৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্থানীয়রা মাদাতুগামার মসজিদটি গুড়িয়ে দিচ্ছে (ছবি: সংগৃহীত)

শ্রীলঙ্কায় গত এপ্রিল মাসে ইস্টার সানডের দিন চার্চ ও হোটেলে হামলার পর দেশটিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ব্যাপক ধাক্কা লাগে। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই হামলার পর অমুসলিমরা দেশটির মুসলিমদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখতে শুরু করে।

শ্রীলঙ্কায় ওই হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ পর রমজান মাস শুরু হয়। পুরো রমজান মাসজুড়ে রোজা পালন করেন শ্রীলঙ্কার মুসল্লিরা। এছাড়া উগ্রবাদীদের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য শ্রীলঙ্কার মুসলিমদের ছোট একটি গ্রুপ ভিন্ন একটি পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে তারা একটি মসজিদ ধ্বংস করেছে।

মাদাতুগামার প্রধান মসজিদের একজন ট্রাস্টি আকবর খান-সেখানকার মুসলিমদের এমন কাজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইস্টার হামলার পর পুলিশ কয়েক দফা তল্লাশি করেছে মসজিদটিকে। এতে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মুসলিমদের সাথে অন্য সম্প্রদায়গুলোর অবিশ্বাসও বেড়ে যায়।

যে মসজিদটি ধ্বংস করা হয় সেটিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত বা এনটিজে সদস্যরা বেশি যাতায়াত করতো বলে মনে করা হয়। পরে এনটিজে পরিচালিত ওই মসজিদটি সিলগালা করে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।

মাদাতুগামার ওই মসজিদটি ঐতিহাসিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক-কোনও কারণেই খুব বেশি উল্লেখযোগ্য নয়।

আকবর বলেন, আমাদের শহরে অন্য যে মসজিদ আছে সেটি মুসলিম পরিবারগুলোর জন্য যথেষ্ট। কয়েক বছর আগে অন্য একটি গোষ্ঠী প্রশ্নবিদ্ধ মসজিদটি নির্মাণ করে।

পরে মে মাসে পুরনো মসজিদের সদস্যরা একটি সভায় মিলিত হয়ে সর্বসম্মত হয়ে বিতর্কিত মসজিদটি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে স্থানীয়রা সেটি ধ্বংস করে।

তিনি বলেন, মিনার, নামাজ কক্ষ ধ্বংস করে ভবনটি পুরনো মালিকের হাতে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

শ্রীলংকায় ৭০ ভাগ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। আর মুসলিম আছে ১০ ভাগের মতো।

এদিকে মসজিদ ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত সবাই ভালোভাবে নেয়নি। শ্রীলঙ্কায় মুসলিমদের সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ অল সিলন জামিয়াতুল উলামা বলছে, প্রার্থনার জায়গার ক্ষতি করা উচিত নয়।

তারা এক বিবৃতিতে জানায়, মসজিদ আল্লাহর ঘর। এর ধ্বংস বা ক্ষতি করা ইসলামি চেতনার পরিপন্থী। শ্রীলঙ্কা সরকার বলছে, দেশটিতে প্রায় দুই হাজার ৫৯৬টি রেজিস্টার্ড মসজিদ আছে।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আ রামিজ বলছেন, মসজিদ ধ্বংসের পন্থা বেছে নিলে এমন শত শত মসজিদ ধ্বংস করতে হবে। তার ধারণা, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মসজিদ উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো চালায়। কারণ গত দুই দশকে বেশ কিছু গোষ্ঠী ওয়াহাবী মতাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেকদিন ধরেই শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা উগ্রবাদীদের সহ্য করে আসছিল। কিন্তু তারা চুপ থাকায় উগ্রবাদীরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

শ্রীলঙ্কার সরকার ওই হামলার পর এখনও অভিযান চালাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমেও মুসলিম নারীরা এখন বেশি করে শরীর ও মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ ঢেকে চলাফেরা করছে। তবে বোমা হামলার ঘটনার পর মুখ ঢেকে রাখায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার।

শ্রীলঙ্কায় এখনও জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। তবে আগামী ২২ জুন এটির অবসান হবে। কিন্তু দেশটির মুসলিমরা সবদিক থেকেই বেশ চাপের মধ্যে আছে। ওই ঘটনার পর বহু জায়গায় মুসলিমদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে।

ড. রামিজ বলছেন, তিনি নিজেও হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তবে মাদাতুগামায় কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মসজিদটি ধ্বংসের পর আমাদের কম ক্ষোভের শিকার হতে হচ্ছে। সিংহলিজ ও তামিলরা আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে সম্পৃক্ত করছে ফলে উত্তেজনাও কমছে বলে জানান তিনি।