• ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬

চীনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ম পালন নিষিদ্ধ!

মাইদুর রহমান রুবেল
|  ০২ জুন ২০১৯, ১৭:১৮ | আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ১৮:২১
ক্লাসে চলছে গানের রেওয়াজ, পাশে চলছে নাচের মুদ্রা রপ্তের প্রশিক্ষণ। হাসি আনন্দে মেতেছেন ক্লাসে মনযোগী ছাত্র ছাত্রীরা। যদিও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে অন্ধকার এক অধ্যায়।

whirpool
চীনের এই ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রত্যেকটি ছাত্রের অতীত জড়িত কোন না কোন অপরাধের সাথে। এসব প্রতিষ্ঠানে মূলত দেশের আইন শৃঙ্খলা, সংবিধান, নাচ-গান, ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটি পারলার-ম্যাসেজিং কোর্স করানো হয়। যাতে ফিরে গিয়ে ফের অপরাধে না জড়িয়ে কাজে মনোযোগী হয় তারা।  

ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত থাকা কিংবা সন্ত্রাসবাদ উস্কে দেয়ার অপরাধে চীনের বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো করা হয়েছে এসব শিক্ষার্থীদের।

অপরাধীদের সংশোধনের জন্যই মুলত এমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে চীনা সরকার।দেশের নাগরিকদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতেই সরকারের এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান।

তবে চীনে যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরত অবস্থায় যদি কোনো মুসলিম আবাসিক হোস্টেলে অবস্থান করেন তাহলে সেখানে তিনি নামাজ ও রোজা রাখতে পারেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে ব্যক্তিগত জীবন অর্থাৎ বাড়ি ফিরে গেলে ধর্মের কাজে কোনো বাধা নেই। ছাত্র শিক্ষক সবাইকে এ নিয়ম মেনে চলতে হয়।

সম্প্রতি চীনের শিংজিয়ান প্রদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের কাশগিরে মুসলিম প্রধান অঞ্চলে গিয়ে এমনটিই জানতে পারে আরটিভির সিনিয়র রিপোর্টার মাইদুর রহমান রুবেল।

চীন সরকারের পক্ষ থেকে একটি ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে নেওয়া হলে সেন্টারের পরিচালক মিজিদ মাহমুদ এসব তথ্য জানান।

ভকেশনাল পরিচালক বলেন, ২০১৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০ থেকে ৪০ বছরের যেসব মুসলিম সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়।

মিজিদ মাহমুদ বলেন, প্রায় ১৪০০ শিক্ষার্থী এখানে নয় মাস থেকে এক বছরের আবাসিক ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসবিরোধী শিক্ষা নেন। সপ্তাহে তারা পাঁচদিন ক্যাম্পাসে থাকাকালীন কোনো প্রকার ধর্মীয় অনুশাসন পালন করতে পারে না।

কারণ চীনের সংবিধান ধর্মকে প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতি থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু ছাত্ররা সপ্তাহে দু’দিন বাড়ি ফিরে গেলে তখন নামাজ পড়তে পারেন ও রোজা রাখতে পারেন। সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য এখানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়। এটি একটি মুক্ত ট্রনিং সেন্টার। এখানে চীনা ভাষা, আইন এবং সন্ত্রাস বিরোধী শিক্ষা দেওয়া হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে পরিচালক মিজিদ মাহমুদ বলেন, এখানে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা হয়েছে। সব শিক্ষার্থী সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রভাবিত ছিলেন। প্রথমে তারা ছোট অপরাধ করে। বড় অপরাধে জড়িয়ে পরার আগে এই সেন্টারে তাদের আনা হয়। পরিবার কিংবা প্রতিবেশিদের অভিযোগের ভিত্তিতে দেশটির পুলিশ পরিবারের মতামতের ভিত্তিতে নিয়ে এসে এই সেন্টারে ভর্তি করা হয়। বিনে পয়সায় তাদের সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে কাজ করে সরকার।

সেন্টারে পাঠদানরত শিক্ষিকা মাইনর চুনা বলেন, আমি পর্যটন নিয়ে ছাত্র ও ছাত্রীদের পাঠদান করছি। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন, বিবাহ আইন, শিশু আইন নিয়ে তাদের ধারণা দেই। সিভিল আইন নিয়ে পড়ানো হচ্ছে। এখানে যারা রয়েছেন তারা সবাই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র আলম জান বলেন, এখানে আসার আগে আমি ইন্টারনেট থেকে সন্ত্রাসবাদের ভিডিও দেখে প্রভাবিত হয়েছিলাম। অনেক ভিডিও আমি শেয়ারও করি। পরে এখানে এসে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী শিক্ষা লাভ করছি। এখন আমি ভাল আছি।

ছাত্র সেরজাত মহিত বলেন, আমি চীনের সংবিধান মানতে বদ্ধপরিকর। এখানে যখন থাকি তখন সাংবিধানিক নিয়ম থাকায় নামাজ পড়তে ও রোজা রাখতে পারি না। তবে সপ্তাহের ছুটির দুই দিন বাড়িতে গিয়ে রমজান মাসে রোজা রাখি ও নামাজ পড়ি।

শিংজিয়ানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উইঘুর বললেই আজকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। উইঘুরের বর্ণমালাও আরবি। তবে এখানে উইঘুরে অন্য জাতির লোকও আছে।

ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের ঘুরে দেখা গেলো, এখানে শিক্ষার্থী লেখাপড়ার মাঝে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা লাভ করছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে উইঘুর মুসলিমরা তুর্কি ও আরবি ভাষা দ্বারা প্রভাবিত। উরুমকি বর্তমান শিংজিয়ানের রাজধানী। কাশগির অন্যতম বৃহৎ শহর।

উইঘুর জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর আগের। মূলত, এরা স্বাধীন পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী। পূর্ব তুর্কিস্তান প্রাচীণ সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার একটি দেশ, যার চতুর্পাশ্বে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান।

এখানে সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দেওয়ার বেশ কিছু ঘটনার পর চীন সরকার উইঘুর মুসলিমদের পুর্নবাসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলে কতৃপক্ষ জানায়।

এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়