logo
  • ঢাকা বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন যে মুসলিম প্রিন্সেস

Noor Inayat Khan The Muslim princess who fought the Nazis
আল জাজিরা থেকে নেয়া
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটেনের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন এবং শেষপর্যন্ত নাৎসিদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ১৮ শতকে মহীশুরের মুসলিম শাসক টিপু সুলতানের বংশধর নূর ইনায়াত খান কয়েক দশক ধরে অজানাই রয়ে গিয়েছিলেন।

তবে ২০০৬ সালে লেখক শ্রাবণী বসু নূরের জীবনী ‘স্পাই প্রিন্সেস’ লেখার পর যুদ্ধে তার অবদানের বিষয়টি সামনে আসে।

ফ্রান্সে স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভ (এসওই) হিসেবে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেন এজন্য প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে চলতি বছর তাকে ব্লু প্লাক সম্মানে ভূষিত করে ব্রিটেন। নাৎসি জার্মানির আনুষ্ঠানিক গুপ্ত পুলিশ গেস্টাপোর হাতে তিনি প্যারিসে ধরা পড়েন এবং তাকে জার্মানিতে নিয়ে গিয়ে ১৯৪৪ সালে হত্যা করা হয়।

২০১৪ সালে তার সম্মানে একটি স্ট্যাম্প ইস্যু করা হয়। এমনকি খুব শিগগিরেই ব্রিটিশ মুদ্রায় তার চেহারা অঙ্কিত হতে পারে এমন খবরও সামনে আসে।

তার বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার জন্য নূরকে ১৯৪৯ সালে মরণোত্তর যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার জর্জ ক্রস এবং ১৯৪৬ সালে ফ্রান্সের দেয়া সামরিক সম্মান ফ্রেঞ্চ ক্রিক্স ডি গুয়েরে ভূষিত করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনজন নারী ব্রিটিশ গুপ্তচরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ২ অক্টোবর আ কল টু স্পাই নামে একটি বায়োপিক মুক্তি পায়। ওই বায়োপিকে নূরের জীবনও তুলে ধরা হয়, যিনি একাধারে শিশু গল্প লেখক এবং শান্তিবাদী ছিলেন।

ওই ফিল্মে নূরের চিত্রে অভিনয় করেছেন রাধিকা আপ্তে। লন্ডন থেকে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আমি মনে করি যে নূর ইনায়েত খান আমার জানাশোনা লোকদের মধ্যে অন্যতম অসাধারণ মানুষ।

নেট ফ্লিক্স সিরিজ লাস্ট স্টোরিজ নামে জনপ্রিয় একটি ওয়েব সিরিজে কাজ করা, যেটির জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অ্যামি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পেয়েছেন রাধিকা, বলেন, তিনি শান্তবাদী হওয়ার মতো ইন্টারেস্টিং এক মুহূর্তে ছিলেন এবং কিছু না করে তার নিষ্ক্রিয় থাকার চেষ্টা যুদ্ধের পরিণতির জন্য হতে পারে।

২০১২ সালে নূরের নামে একটি স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠা করেন শ্রাবণী। তিনি লন্ডন থেকে আল জাজিরাকে বলেন, নূরকে যুদ্ধে লড়াই না করলেও হতো তবে তিনি ‘অহিংসা, ধর্মের সার্বিকতা, ফ্যাসিবাদ এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে’ লড়াইয়ের মূল নীতিগুলোর জন্য এটি করেছিলেন।

যুদ্ধের আগে নূর সাধারণত শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতেন এবং বড় হয়ে শিশুদের গল্পের লেখক হয়ে ওঠেন। তিনি স্থানীয় ফরাসি রেডিও এবং ম্যাগাজিনে নিয়মিতভাবে কন্ট্রিবিউটিং করে যাচ্ছিলেন।

তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে- বুদ্ধের পুনর্জন্ম নিয়ে ইংরেজি অনুবাদ গল্প সংকলন ‘টুয়েন্টি জাতকা টেলস’।

‘অন্তর্নিহিত নিঃস্বার্থ’

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন নূর। তার বাবা ছিলেন ইনায়েত খান, একজন সংগীতশিল্পী এবং সুফি প্রচারক এবং মা আমিনা বেগম (আগে নাম ছিল- ওরা রে বাকের)। ওই বছর  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের পরিবার ইংল্যান্ডে চলে যায়।

ভারতপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্রিটিশদের অব্যাহত নজরদারি মধ্যে ১৯২০ সালে পরিবারকে প্যারিসে পাড়ি জমান ইনায়েত। সেখানে তার তিন ছোট ভাইবোনের সঙ্গে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত বেড়ে ওঠেন নূর। তার পরদাদা টিপু সুলতান ১৭৯৯ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত হন।

১৯৪০ সালে নাৎসিরা ফ্রান্স দখল করার পর হঠাৎই থমকে যায় নূরের জীবন। তখন অন্যান্য হাজার হাজার ফরাসি বাসিন্দার সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি ব্রিটেন পালিয়ে যান।

ব্রিটেন পৌঁছেই যুদ্ধ প্রচেষ্টা যোগ দেন নূর। যুক্তরাজ্যের রয়েল এয়ার ফোর্সের নারী সহায়ক উইং উইমেন্স অক্সিলারি এয়ার ফোর্সে একজন ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে যোগ দেন তিনি। শ্রাবণীর ভাষায় এ কাজে বেশ সিদ্ধহস্ত ছিলেন নূর।

স্পাই প্রিন্সেসে শ্রাবণী লিখেন, ইহুদিদের বিরুদ্ধে নাৎসিদের মতাদর্শ এবং তাদের কর্মকাণ্ড নূর তার বাবার কাছ থেকে যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নীতির শিক্ষা পেয়েছিলেন সেগুলোর বিরোধী ছিল। তিনি জন্মগতভাবে মুসলিম ছিলেন কিন্তু ভালোবেসেছিলেন একজন ইহুদি পুরুষকে। কিন্তু যুদ্ধে কিছু একটা করার তাগিদ বোধ করেছিলেন নূর।

নূরের বাবা ইনায়েত একজন সুপরিচিত সুফি প্রচারক। এটি ইসলামের একটি আধ্যাত্মিক ধারা।

শ্রাবণীর ভাষায় ইনায়েত অহিংসা এবং সব ধর্মের একত্বের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, আর বড় হতে হতে এই শিক্ষাই পেয়েছেন নূর। ১৯২৭ সালে এক ভ্রমণের সময় ভারতে মারা যান ইনায়েত। পরে ১৩ বছর বয়সী নূরকে তার ছোট ভাইবোনকে মায়ের সঙ্গে মিলে দেখভালের দায়িত্ব কাঁদে তুলে নিতে হয়।

নূরের ভাতিজা এবং ইনায়েতি অর্ডারের নেতা পীর জিয়া ইনায়েত খান আল জাজিরাকে বলেছেন, খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি অত্যন্ত স্বার্থহীন এবং আত্মত্যাগী হয়ে উঠেছিলেন। তার পরিচয় যাই হোক না কেন নূর সবসময়ে নিপীড়িতের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন পীর জিয়া।

তিনি বলেন, নূর নিপীড়িতদের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ না হয়েও তাদের পক্ষে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষেও দাঁড়াতেন।

উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অবসানের জন্য ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধীর সংগ্রামের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন নূর। স্পাই প্রিন্সেসের মতে, যুক্তরাজ্যের সেনা নিয়োগকারীদের নূর বলেছিলেন যে- যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তিনি ব্রিটেনের উপর ভারতকে সমর্থন করতে পারেন।

‘কাজের জন্য যোগ্য ছিলেন’

ইউরোপে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনে সহায়তা করতে গুপ্তচর পাঠায় ব্রিটিশ একটি গুপ্ত সংস্থা। ওই গুপ্ত সংস্থা স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভ (এসওই) দ্বারা নিয়োগ পেয়েছিলেন ফরাসি ভাষায় সাবলীল নূর।

কাজ যে কতটা বিপজ্জনক এবং এজন্য ক্ষতিপূরণ যৎসামান্য পাবেন জেনেও তাৎক্ষণিক এসওই-র প্রস্তাব গ্রহণ করেন তিনি।

১৯৪৩ সালের জুন মাসে ‘মেডেলিন’ কোড নামে নূরকে ফ্রান্সে পাঠায় ব্রিটেন। তিনিই প্রথম নারী ওয়্যারলেস অপারেটর যাকে ফ্রান্সে মোতায়েন করেছিল ব্রিটেন। লে ম্যান্স শহরে প্রবেশের পর সেখানে থেকে প্যারিস যান নূর। সেখানে গিয়ে ফ্রেঞ্চ প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক ‘প্রোসপার’র সঙ্গে কাজ করেন তিনি।

তাকে মোতায়েনের কয়েকদিন মধ্যেই প্রোসপারের সব উচ্চ পদস্থ এজেন্ট নাৎসিদের হাতে ধরা পড়ে। নাৎসিরা তাদের ওয়্যারলেস জব্দ করে। ফলে পরবর্তী কয়েক মাস ফিল্ডে তিনি একমাত্র অপারেটর হিসেবে থেকে যান।

আপাতদৃষ্টিতে তার এক সহকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতার পর একই বছরের অক্টোবরে গেস্টাপো তাকে বন্দি করে এবং এক মাস পরে জার্মানি নিয়ে যায়।

বইয়ে বলা হয়েছে, গেস্টাপো নূরকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বন্দি হিসাবে বিবেচনা করতো, কেননা তিনি জার্মানদের কাছে কোনও তথ্য দেননি এবং তাদের নজরদারির থেকে দুইবার পালানোরও চেষ্টা করেছিলেন।

তার প্রায় এক বছরের বন্দিদশায় তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। পরে তাকে কার্লসরুহে দাচাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আরও তিন এসওই এজেন্টের সঙ্গে নূরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

স্পাই প্রিন্সেসের মতে, ১৯৫২ সালে নূরের জীবনী লেখক ও বন্ধু জ্যঁ ওভারটন ফুলারকে প্যারিসে নূরকে জিজ্ঞাসাবাদকারী আর্নস্ট ভোগট্ বলেছিলেন, তিনি কখনও নূরের মতো কাউকে দেখেননি এবং ‘তার সাহস, সাহসিতকা ও দয়া’ প্রশংসা করেছেন।

তিনি (ভোগট্) একবার নূরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি তার জীবন নষ্ট এবং ত্যাগ বৃথা যাচ্ছে কিনা। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি তার দেশের সেবা করেছেন এবং এটাই তার প্রতিদান।

ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাচ্ছেন

রাধিকা আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধে নারীর অবদান সম্পর্কে খুব একটা আলোচনা হয় না এজন্য তিনি আ কল টু স্পাইয়ের জন্য সাইন আপ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি মনে করি যখন আমরা যুদ্ধের বিষয়ে কথা বলি, তখন আমরা প্রায়ই পুরুষদের নিয়ে কথা বলি এবং নারীদের লড়াই এবং প্রচেষ্টা নিয়ে কিছু বলি না।

নূরের কাজের স্বীকৃতি ছাড়াই এতগুলো দশক পার হয়ে গেছে। তবে এখন তার গল্প নিয়ে মানুষজনের আগ্রহ বাড়ছে।

শ্রাবণীর নেতৃত্বে একটি প্রচারণার জেরে গত আগস্টে প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী হিসেবে ব্লুমসবারিতে যেখানে থাকতেন নূর, সেখানে মর্যাদাপূর্ণ ব্লু প্লাক তার ফলক লাগানো হয়। সম্মানটি হলো একটি লন্ডন প্রকল্প যেখানে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির ফলক ওই ব্যক্তি কাজ বা বাস করতেন এমন ভবনের কাছে লাগানো হয়।

শ্রাবণী বলেন, সাহসিকতার এবং নিজের নীতির পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তিনি এই সম্মানের অধিকারী। তিনি কখনই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি। ২০১২ সালে লন্ডনে নূরের একটি স্ট্যাচু উন্মোচন করেন প্রিন্সেস অ্যান। যুদ্ধের বীরদের সম্মানে তিনি এমনটা করেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই লেখক বলেন, নূর এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের লাখ লাখ মিত্রের সাহায্য ছাড়া এই যুদ্ধ জেতা সম্ভব হতো না এটা উপলব্ধি করা জরুরি, যদিও প্রায়ই এটা এড়িয়ে যাওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষ এবং কালো বর্ণের মানুষদের অবদানকে খুব কমই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু যখন ডানপন্থী সরকারের অধীনে জাতিগত সংখ্যালঘুরা ক্রমবর্ধমান কোণঠাসা হয়ে পড়ছে তখন এটা জরুরি।

শ্রাবণী বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে ব্রিটেন একাই এই যুদ্ধ জিতেছে, চার্চিল তাদের জয় এনে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের জানা দরকার যে ভারতীয় উপমহাদেশের ২৫ লাখ মানুষ এই যুদ্ধের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হয়ে এগিয়ে এসেছিল।

ভিক্টোরিয়া এবং আবদুল নামে আরেকটি বই লেখা শ্রাবণী, যে গল্পের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র হয়েছিল, বলেন, এসব ভারতীয়দের পিঠে চড়েই জয় অর্জিত হয়েছিল এবং নূরও তাদের অংশ ছিলেন।

এ/ এমকে

RTVPLUS