logo
  • ঢাকা শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

শিক্ষক হত্যার পর ফ্রান্সে ইসলাম ভীতি বাড়ার আশঙ্কা

After teacher’s killing, French Muslims fear rising Islamophobia
সংগৃহীত
ফ্রান্সে ৪৭ বছর বয়সী শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটিকে গত শুক্রবার দিনে দুপুরে তারই স্কুলের সামনে মাথা কেটে হত্যা করা হয়। রাজধানী প্যারিস থেকে প্রায় ১৫ মাইল দূরে একটি শহরতলী কোনফ্লান্স-সেইন্ট-হোনোরিনে এ ঘটনা ঘটে।

চেচনীয় বংশোদ্ভূত ১৮ বছর বয়সী একজন সন্দেহভাজন ওই শিক্ষককে হত্যার পর ফ্রান্সে ইসলাম ভীতি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমন্বিত শাস্তিও আশঙ্কা করছে দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

প্যাটিকে হত্যার ঘটনায় ফ্রান্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা শোক ও হতবিহবল হয়ে গেছে। এমনকি ওই ঘটনার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। আর বুধবার প্যাটিকে মরণোত্তর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা লিজিয়ন ডি’অনার দেয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে ম্যাক্রোঁ উপস্থিত ছিলেন।

স্কুলে নিজের শিক্ষার্থীদের কাছে মহানবী (সা.)-র ব্যঙ্গচিত্র দেখানোর পর প্যাটির হামলার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তবে প্যাটিকে হত্যার পর মুসলিম সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে ফরাসি সরকার। দেশটিতে বিক্ষোভকারীদের হামলার শিকার হয়েছে বেশ কয়েকটি মসজিদ।

কিছু কিছু স্থানে হুমকির মুখে মসজিদে পুলিশ প্রোটেকশন দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খুব আতঙ্কে আছে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিম থাকা দেশটির সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়। কারণ হামলার পর মূলত রাষ্ট্র ও মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

গত ২ অক্টোবর ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন যে, তার সরকার ‘ইসলামিস্ট সেপারেটিজম’ বিরোধী অভিযান শুরুর পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ইসলাম ‘সংকটে’ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যের পর এমনিতেই কোণঠাসা ছিল দেশটির মুসলিমরা, তারপর এই হামলা আরও বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে তাদের।

ফ্রান্সের মুসলিম কমিউনিটি মনে করছে, প্যাটির মর্মান্তিক মৃত্যুকে ইতোমধ্যেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ইসলামকে ‘সন্ত্রাসবাদের’ সঙ্গে এক করে ফেলে সরকারি নীতি এগিয়ে নেয়া যাবে। ফরাসি একজন মুসলিম অধিকার কর্মী ইয়াসের লোয়াটি বলেন, মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে। আর এজন্য ম্যাক্রোঁ ‘ইসলাম ভীতি’ ব্যবহার করছেন বলেও মনে করেন তিনি।

সোমবার ফরাসি সরকার জানিয়েছে, তারা সন্দেহভাজন ‘চরমপন্থীদের’ বিরুদ্ধে অভিযান শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে দেশটি থেকে ২০০-র বেশি মানুষকে বের করে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে ফরাসি সরকার। ৫০টির বেশি মুসলিম সংগঠনকে টার্গেট করা হয়েছে। ওই হামলার পর শেখ ইয়াসিন কালেকটিভ নামের একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্যাটিকে অপমান করে ইউটিউবে ভিডিও পোস্ট করার অভিযোগ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আবদেলহাকিম সেফরিওউইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওই তালিকায় আরও অবাক করা ব্যক্তির নাম রয়েছে। এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড ডারমানিন অ্যান্টি মুসলিম হেইট ক্রাইমস ট্র্যাককারী সংস্থা কালেকটিভ অ্যাগেনেইস্ট ইসলামোফোবিয়া ইন ফ্রান্স (সিসিআইএফ) নামে একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছেন।

ফ্রান্সের ৫০টির বেশি সিভিল সোসাইটি গ্রুপ এবং অ্যাকাডেমিকস এটি নিয়ে সতর্ক করার পর ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন প্রস্তাব করলেন। ফ্রেঞ্চ রেডিও স্টেশন ইউরোপ ওয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডারমানিন সিসিআইএফ-র কঠোর সমালোচনা করে সংস্থাটিকে ‘প্রজাতন্ত্রের শত্রু’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত অনুরোধে যেসব প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হবে সিসিআইএফ সেগুলোর তালিকায় রয়েছে বলে জানান ডারমানিন। তবে সিসিআইএফ ডারমানিনের শব্দ প্রয়োগের সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, ‘ইসলাম ভীতির বিরুদ্ধে করাকে এখন অপরাধ’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিচ্ছে সরকার।

মন্ত্রিসভায় রদবদলের পর গত জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ডারমানিন। রক্ষণশীল ও চরম-ডানপন্থী দলগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করতে তিনি মাঝে মধ্যেই এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন। মঙ্গলবার বিএফএমটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সুপারমার্কেটে তিনি হালাল এবং কোশের খাদ্য পণ্য দেখে ‘হতবাক’। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে বিচ্ছিন্নতাবাদ তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। কিন্তু এমন মন্তব্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসির পাত্রে পরিণত হন তিনি।

কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কারণে মুসলিমদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছে অনেকে। অধিকার কর্মী এবং সিসিআইএফ-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা মারওয়ান মুহাম্মদ বলেছেন, এই মুহূর্তে ফ্রান্স যা করছে তা নজিরবিহীন। মৌলিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে কারণ সরকার মুসলিম কমিউনিটিকে ‘স্টিগমাইজ এবং ক্রিমিনালাইজ’ করায় ব্যস্ত রয়েছে।

অনেকেই মনে করছে যে, শুক্রবারের ওই হামলার পর সরকারের কঠোর ও ত্বরিত প্রতিক্রিয়ার অর্থ হচ্ছে যে আইন করা হবে সেটি মূলত মুসলিমদের টার্গেট করেই করা হবে। ২০১৫ সালে প্যারিসে ইসলামিক স্টেটের ভয়াবহ হামলার পর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল ফরাসি সরকার। অধিকার কর্মীরা ওই অভিযানের সমালোচনা করে বলেছিল যে, জরুরি আইনের আওতায় অভিযান চালিয়ে গণ গ্রেপ্তারের ফলে খুব কমই অর্জন হয়েছে বরং মুসলিমরা নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বোধ করেছে।

বুধবার প্যাটিকে স্মরণকে ম্যাক্রোঁ বলেছেন, তিনি ‘বই ভালোবাসতেন, জ্ঞানার্জনকে ভালোবাসতেন’। তিনি গবেষক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বাবা-মায়ের পথ অনুসরণ করে শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্যাটি। ‘শিক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্তের কারণে’ শেষপর্যন্ত তাকে মরতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ম্যাক্রোঁ।

ক্লাসে বাক স্বাধীনতা নিয়ে পড়ানোর সময় মহানবী (সা.)-র কার্টুন দেখান প্যাটি। মহানবী (সা.)-র যেকোনো ধরনের চিত্রাঙ্কনকে ধর্ম অবমাননাকর বলে বিশ্বাস করে মুসলিমরা।

খবরে বলা হয়েছে, যেসব মুসলিম শিক্ষার্থীর আপত্তি আছে তারা চাইলে ক্লাস থেকে বের হয়ে যেতে বা অন্যদিকে নজর ঘুরিয়ে রাখতে পারবে বলে উপদেশ দিয়েছিলেন প্যাটি। স্পর্শকাতরতার বিবেচনায় তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলে খবরে বলা হয়েছে।

প্যাটিকে হত্যাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার আগে ওই কার্টুন টুইটারে পোস্ট করেছিলেন। ফরাসি মিডিয়া জানিয়েছে, হত্যার আগে প্যাটির সঙ্গে ওই কিশোরের যোগাযোগ ছিল। প্যাটিকে হত্যায় ঘটনায় সন্দেহভাজন হামলাকারীর পরিবারের সদস্যসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর আগে গত মাসে ব্যঙ্গ ম্যাগাজিন শার্লি এবদোর পুরনো অফিসের বাইরে দুটি ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। গত সেপ্টেম্বর মাসে তারা মহানবী (সা.)-র কার্টুন পুনঃপ্রকাশিত করে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি ওই কার্টুন প্রকাশ করার পর শার্লি এবদোয় হামলায় ঘটনায় ঘটে। এতে ১৭ জন নিহত হয়। তবে সেপ্টেম্বরে ওই হামলার বিচার শুরু হওয়ার পর তারা আবারও ওই কার্টুন ছাপে।

কার্নেজি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রেঞ্চ স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক মেম-ফাতৌ নিয়াং বলেছেন, সরকার আসলে শুধু ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই’ ঘোষণা করেনি। বরং তারা সন্ত্রাসীদের বোনা বিভাজনের বীজ থেকে পুরোপুরি মেরুকৃত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এটা কেবল মৌলবাদীদের বিরুদ্ধেই নয়, সাধারণভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা।

(আল-জাজিরা থেকে অনূদিত)

RTVPLUS