ভারতে মুসলিম হওয়ার কারণে হোটেল থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষকদের

প্রকাশ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৫৪ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:১৯

অনলাইন ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা লাগোয়া এক এলাকার দুটি গেস্ট হাউস থেকে ১০ জন মুসলমান শিক্ষককে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অগ্রিম অর্থ দিয়ে ঘর বুকিং করার পরেও 'পাড়ার লোকেরা মুসলমানদের থাকতে দিতে চায় না' এই অজুহাতে গেস্ট হাউসের কর্মীরা তাদের চলে যেতে বলেন। পরে পুলিশ ওই গেস্ট হাউস দুটির তিনজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।

ওই ১০ জন মাদরাসা শিক্ষক মালদা থেকে সোমবার খুব ভোরে  কলকাতা লাগোয়া বিধাননগর বা সল্ট লেকে পৌঁছেছিলেন। তাদের কেউ প্রধান শিক্ষক, কেউ সহকারী শিক্ষক। রাজ্য মাদরাসা শিক্ষা দপ্তরে সরকারি কাজেই এসেছিলেন তারা।

ক্লান্ত শিক্ষকরা অগ্রিম টাকা দিয়ে বুক করে রাখা গেস্ট হাউসের ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে চাইছিলেন দ্রুত। একটু পরে রাস্তায় বেরিয়ে খাবার খেতে গিয়েছিলেন। তখনই যে পাড়ার লোক তাদের দাঁড়ি-টুপি-পাজামা-পাঞ্জাবী দেখে সন্দেহ করেছেন, ওই দলে থাকা একজন প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান এ ঘটনা পরে বুঝতে পারেন।

মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সবাই রাত জেগে এসেছি। তাই স্নান করে একটু টিফিন করতে বেরিয়েছিলাম। ফিরে এসে ঘরেই কয়েকটা কাজ করছিলাম। এমন সময়ে গেস্ট হাউসের এক বেয়ারা এসে বলে যে আপনাদের আরও ভাল ঘরের ব্যবস্থা হয়েছে। আমার সঙ্গে চলুন। আমরা সেই কথা শুনে তার সঙ্গে যাই। দ্বিতীয় ওই গেস্ট হাউসে আমাদের বসিয়েই রাখে বেশ কয়েক ঘণ্টা। যখন তাদের বলি যে 'কী ব্যাপার। এখানে নিয়ে এসে বসিয়ে রেখেছেন, ঘর দিচ্ছেন না?' ম্যানেজার তখন ফিসফিস করে বলে আপনাদের এখানে থাকতে দেয়া যাবে না মাস্টারমশাই। আপনারা চলে যান’। এ ঘটনার পর যে শিক্ষক সংগঠনের নেতার মাধ্যমে ঘর বুকিং করেছিলেন শিক্ষকরা তাকে খবর দেন।

মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তখনও আমরা কারণটাই বুঝতে পারছি না যে কেন এমন ব্যবহার করল। আমাদের সংগঠনের নেতা মইদুল ইসলামকে ফোন করি। তিনি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে আমাদের জানান যে থাকতে হবে না আপনাদের ওখানে। বেরিয়ে আসুন। পরে মইদুল ইসলাম আমাদের আসল কারণটা বলেন, যে ম্যানেজার তাকে বলেছে পাড়ার লোকজন আপত্তি করছে এদের কয়েকজনের দাঁড়ি আর টুপি দেখে। আমাদের খুবই অপমানিত লেগেছে এ ঘটনায়।’

জানা গেছে, এই শিক্ষকরা সকলেই একটি অরাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক ঐক্য মুক্তি মঞ্চ নামের ওই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মইদুল ইসলামের মাধ্যমেই ওই শিক্ষকরা ঘর বুকিং করেছিলেন।

এ ব্যাপারে মইদুল ইসলাম বলেন, ওই গেস্ট হাউসটা আমার পরিচিত। ম্যানেজারকে আমি যখন ফোন করে জানতে চাই ব্যাপারটা, তখন তিনি বলে যে ওই মাস্টারমশাইরা সবাই আপনার স্বজাতির। ওরা যখন রাস্তায় বেরিয়েছিলেন তখন পাড়ার লোকজন দেখেছে যে কয়েকজনের দাঁড়ি আছে, টুপি আর পাজামা পাঞ্জাবী পড়া। এলাকার লোকেদের আপত্তিতেই মাস্টারমশাইদের গেস্ট হাউসটায় থাকতে দেয়া হয়নি। একজন শিক্ষকের পক্ষে এটা ভীষণ অপমানজনক।

তিনি মন্তব্য করেন, আমরা স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াই 'মোরা একই বৃন্তের দুটি কুসুম - হিন্দু মুসলমান। মাদরাসা হলেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী হিন্দু, স্টাফরাও অনেকে হিন্দু। সেরকম জায়গায় দাঁড়ি-টুপি আর পাজামা-পাঞ্জাবী দেখে বয়স্ক শিক্ষকদের গেস্ট হাউস থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল- এটা কি আমাদের বাংলার সংস্কৃতি! এই ঘটনায় সত্যিই উদ্বেগজনক।

কলকাতায় সাধারণভাবে হোটেল গেস্ট হাউসে ধর্মীয় পরিচিতির কারণে থাকতে দেয়া হচ্ছে না- এমন ঘটনা খুব শোনা যায় না। যদিও বেশ কয়েকজন বলছেন, বাংলাদেশ থেকে কলকাতার হোটেলে থাকতে গিয়ে তারা বাধা পেয়েছেন শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে।

ভারতের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা ও লেখিকা মীরাতুন নাহার বলেন, ‘ আসলে আমাদের দেশের ক্ষমতায় আছে যে দলটি, তারা তো একটা বিষয়ের ওপরেই খুব মনোযোগ দিয়েছে - হিন্দু রাষ্ট্র গড়তে হবে। এদিকে রুজি নেই, চিকিৎসা নেই, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে - সেসব দিক থেকে মানুষের মন সরিয়ে একটা দিকেই মনোযোগ দেয়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। তারই ফলশ্রুতি এই ঘটনা’। 

এদিকে মইদুল ইসলাম একটি অভিযোগ-পত্র পাঠিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর দপ্তরে। ওই চিঠি পেয়েই দুটি গেস্ট হাউসের মোট পাঁচ জন কর্মীকে আটক করে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তার মধ্যে তিনজনকে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দুই দিনের পুলিশ হেফাজতের আদেশ দিয়েছে কোর্ট। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

এসএস