করোনায় প্লাজমার পরিসংখ্যান তাক লাগাতে পারে আপনাকে

প্রকাশ | ০২ জুন ২০২০, ২০:৪০ | আপডেট: ০২ জুন ২০২০, ২৩:১৮

মাজহারুল ইসলাম ভুঁইঞা
ছবি- সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের মহামারী প্রকোপে গোটা পৃথিবী আজ নাজেহাল। সব দেশই চেষ্টা করছে ঔষধ আবিষ্কারের তবে এখনও সফল হতে পারেনি কেউ। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।

গত ৭ মার্চ ৩ জনের আক্রান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রকাশ পায় করোনাভাইরাস। এরপর হুহু করে বেড়ে চলছে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা। ৩ জন থেকে এখন দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারের কাছে। মৃতের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়, প্রায় ৭শ’র কাছে।

যুদ্ধ কেবল শুরু, বাকি আছে অনেকটা পথ। এই যুদ্ধের যোদ্ধা কিন্তু আমরা সকলেই। যেমন সাধারন মানুষ ঘরে অবস্থান করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে, তেমনি ডাক্তাররা কাজ করছেন সামনে থেকে দলনেতার ভূমিকায়। নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করছেন সরকারও। এভাবেই আমরা করোনার বিপক্ষে জয়ী হবার চেষ্টা করে চলছি।

এমন অবস্থায় আপনি যদি করোনা জয়ী হয়ে থাকেন, তাহলে কি জানেন আপনি এই যুদ্ধে একজন মূল্যবান সৈনিক। শুনতে অবাক লাগলেও আপনিই এখন আরেকজন মৃত্যুপথ যাত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারেন এই পথ থেকে।

এতদিনে নিশ্চয় ‘প্লাজমা থেরাপি’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছেন। জেনে নিই এর বিস্তারিত।

রক্তের দুটি উপাদানের একটি রক্তরস এবং অন্যটি রক্তকনিকা (শ্বেত,লোহিত,অণুচক্রিকা)। এই রক্তরসের অপর নামই প্লাজমা। এই প্লাজমা একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকেই আমরা প্লাজমা থেরাপি বলে জানি।

ডিপথেরিয়া রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্লাজমার ব্যবহার করে প্রায় ১০০ বছর আগে এমিল ভোন বেহরিং ফিজিওলজি এবং মেডিসিন এ নোবেল অর্জন করেন। বর্তমানে রক্তক্ষরণের চিকিৎসা, পুড়ে যাওয়া রোগী, হার্ট সার্জারি, লিভার প্রতিস্থাপন, কোয়াগুলেশন ফ্যাক্টর এবং প্লাজমা প্রোটিনের ঘাটতি, থ্রম্বোসাইটিক পারপুরা সহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে কভিড-১৯ চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করে রোগীর তুলনামূলক অবস্থার উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। করোনার ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপিতে ব্যবহৃত প্লাজমা সুস্থ করোনা রোগীর শরীর থেকে অসুস্থ করোনা রোগীর শরীরে স্থানান্তর করা হয়, যা অসুস্থ রোগীর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে প্লাজমা থেরাপি করোনা রোগীর করোনা জটিলতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক ভাবে জানা যাচ্ছে, করোনা রোগী প্লাজমা থেরাপি ব্যবহারের কারনে তুলনামূলক দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে।

পরীক্ষামূলকভাবে আরো জানা গেছে, একজন করোনা থেকে সুস্থ রোগীর দান করা প্লাজমা ৩ জন করোনা রোগীর শরীরে স্থানান্তর সম্ভব। আর ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে করোনা থেকে সুস্থ রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে এই প্লাজমা নেওয়া সম্ভব, রোগী যদি রক্ত দেওয়ার উপযুক্ত হয়।

তাহলে ভাবুন আপনি যদি একজন করোনা জয়ী হয়ে থাকেন, তবে আপনি পারেন ৩ জন করোনা রোগীকে করোনা জয়ে অনেক দূর এগিয়ে দিতে। তেমনই করোনা জয়ীদের সম্মিলিত অনুদান, এই পরিসংখ্যানকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে ভাবুন। আমরা যদি ১ জুন পর্যন্ত পরিসংখ্যান দেখি। দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৫৩৪ (সুস্থ বাদে আক্রান্ত ৩৮ হাজার ৯৩৭ জন)। মোট সুস্থ্য ১০ হাজার ৫৯৭ জন।

এই ১০ হাজার ৫৯৭ জন সুস্থ থেকে নূন্যতম ৬ হাজার ৫০০ জন যদি ১৮-৫৫ বছর বয়সের মধ্যে রোগমুক্ত হয়ে থাকেন তবে ৬ হাজার জনের প্লাজমা ১৯ হাজার ৫০০ রোগীকে করোনা যুদ্ধে জয়ী হতে এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ যদি এমন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয়, যেখানে একজন রোগী করোনা নিয়ে চিকিৎসাধীন হওয়ার আগেই চুক্তিবদ্ধ হয়ে যায়, যে তিনি যদি করোনা যুদ্ধে জয়ী হন, তবে তিনি প্লাজমা দানের উপুযুক্ত হলে প্লাজমা দানে বাধ্য থাকবেন। তিনি সুস্থ হয়ে ফেরার পথেই প্লাজমা দিয়ে যেতে পারবেন কারন, একজন করোনা রোগী সুস্থ হয়েই প্লাজমা দান করতে সক্ষম।

রোগীর শরীরের অবস্থার কথা চিন্তা করে এই প্লাজমা ১ থেক ২ সপ্তাহ পরেও সংগ্রহ করা যেতে পারে। আর যদি একদল সেবক প্লাজমা সংগ্রহনে নিয়োজিত করা যায় তাহলে দেশের করোনা পরিস্থিতির অবস্থার অনেকাংশেই উন্নতি হবে বলে সম্ভব মনে করি।

সেবক দল করোনায় সুস্থ পূর্ববর্তী রোগীদের রেকর্ড অনুযায়ী অবস্থান করে প্লাজমা সংগ্রহ করতে থাকবেন। কারন আমরা যদি ১ জুন এর পরিসংখ্যানটাই দেখাই আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩৮১ জন, সুস্থ ৮১৬ জনের যদি ৬০০ জন প্লাজমা দেওয়ার উপযুক্ত থাকেন, তবে আজ নতুন করে ১ হাজার ৮০০ জন প্লাজমা চিকিৎসার আওতাভুক্ত হতে পারবেন। তাহলে প্রতিদিনের আক্রান্ত আর প্লাজমা থেরাপির আওতাভুক্ত হওয়ার পরিসংখ্যানটা দেখুন। যা একটি বড় সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।

কারন, একজন রোগী যখন জটিল রোগের জন্য অপারেশন থিয়েটারে যায় তখন কিন্ত সে তার জীবনের জন্য ডাক্তার দায়ী থাকবে না, এমন চুক্তিবদ্ধ হয়েই অপারেশন থিয়েটারে যায়। যেখানে প্রশ্ন জীবন মরনের, সেখানে একটু পদ্ধতি থাকতেই পারে। বিভিন্ন বাহিনীতে একজন সৈনিক যোগদানের জন্য, বিভিন্ন যুদ্ধে জীবন বলি রাখবে এমন চুক্তি করেই যোগদান করে। পদ্ধতি থাকে সেখানেও।

তবে করোনা যুদ্ধে যখন আমরা সকলেই সৈনিক, সেক্ষেত্রে কেন আমরা একটা পদ্ধতির মধ্যে থাকতে পারি না! আশা করি আমরা সকলের সম্মিলিত উদ্যেগে করোনা মোকাবেলা করে অনেকাংশেই জয়ী হতে সক্ষম হব।

মোঃ মাজহারুল ইসলাম ভুঁইঞা, শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

তথ্য সহযোগীতায়: ডাঃ আদনান আশকারী।

এমআর/