logo
  • ঢাকা সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনা আপডেট

  •     গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৪০ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ২৫৪৫ জন, সুস্থ ৪০৬ জন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

করোনা মহামারি : পরিবর্তনের বার্তা

স্বপন নাথ
|  ২৭ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৪০ | আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ১৬:৪৬
করোনা মহামারি : পরিবর্তনের বার্তা
বিপরীতের বাস্তব বলে একটি কথা আছে। প্রথমে তা আমরা পড়ি কথাবিদ দেবেশ রায়ের লেখায়। লেখাটি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। প্রথমে এ শব্দবন্ধ দেখে খটকা লেগেছিলো। পুরো লেখাটি পড়ে শেষ করার পর স্বচ্ছ হয়ে যায় কেন তিনি ‘বিপরীতের বাস্তব’ ব্যবহার করেছেন। আজ মনে হয় দেবেশ রায় ঠিকই উপলব্ধি করেছেন রবীন্দ্রদর্শনের রহস্যটি। রবীন্দ্রনাথ তো জগতে বিদ্যমান বিপরীতের সৌন্দর্যকে সারাজীবন অবলোকন করেছেন।

এ মুহূর্তে বিপরীতের বাস্তব অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করছি সরাসরি। একদিকে আতঙ্ক, উদ্বেগ, শঙ্কা আর ভয়ে দিনানিপাত করছে মানুষ। এক্ষেত্রে সকলেই খুব অসহায়। তবে হতদরিদ্র, দিনমজুর, ভিক্ষুক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যৌনকর্মী, ফেরিওয়ালাসহ স্বল্প আয়ের মানুষ অসহায়ত্বে পড়েছে বেশি। তাদের কোনো কাজ নেই, আয়ও নেই। ঘরে খাবার নেই। উচ্চআয়ের মানুষেরা বাঁচবে কিনা, এ নিয়ে শঙ্কায়। কিন্তু নিম্নআয় ও সম্বলহীন মানুষের বাঁচার চিন্তা নয়, খাবার নিয়ে শঙ্কা। তারা মৃত্যুকে ভয় করছে না। তারা বাঁচবে কি না, এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আজ খাবার পাবে কিনা, আগামীকাল সন্তানের মুখে খাবার দিতে পারবে কিনা, এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায়। এ লকডাউনের মধ্যে তারা ক্ষুব্ধ। তারা নানা জায়গায় খাবারের জন্য ধরনা দিচ্ছে, বিক্ষোভ করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে নানাভাবে। বর্তমান সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাধারণ মানুষের কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। সোজা কথা এরকম একটি বিপর্যয় সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। এ পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ ও মহামারি কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। এর প্রতিরোধ হলো মূলত প্রতিষেধক। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিস্কৃত হয়নি। ফলে, সামাজিক দূরত্ব, মেলামেশা, সরাসরি সাক্ষাতে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও সবাইকে বাইরে বের না হয়ে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশে অবরোধ (লকডাউন)আরোপ করা হয়েছে। কোনো কিছু দিয়ে এ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা কী হলে কী হবে- অনুমান করেই যাচ্ছেন। কিছু কিছু ইংগিতও দিচ্ছেন। আসলে মানবসভ্যতার এ সংকটে কোনো ইতিবাচক তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এ-সময় পার করা হচ্ছে মাত্র।

পৃথিবীর সকল দেশের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ এখন বন্ধ। ফলে, আন্তঃদেশীয় পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও নানাবিধ যোগাযোগ অচল। দেশের ভেতরেও ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির এবং সমাজের অভ্যন্তরস্থ বিভিন্নমুখি সম্পর্ক এখন বন্ধ রয়েছে। সকল আনুষ্ঠানিকতা স্থগিত রাখা হয়েছে। বস্তুত, সবকিছু স্থবির হয়ে আছে। এ স্থবিরতা, স্তব্ধতার শেষ কোথায় তা কেউ বলতে পারছে না। বিভিন্ন দেশে পণ্য বিনিময় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে মালামাল পরিবহনে রক্ষণশীল অবস্থা বিরাজমান। এ সুযোগে মুনাফাখোর, ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা মালামাল গুদামজাত করে দাম বাড়াচ্ছে। সরবরাহ নেই বলে পণ্য আটকে রেখে বিক্রি করছে না। উন্নত বিশ্বেও এখন খাদ্যসংকট চরমে। খাদ্য উৎপাদন যেমন বন্ধ হয়ে আছে; তেমনি চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। একেতো ঘরে থাকতে হচ্ছে আবার অন্যদিকে ভয়, আতঙ্কে সরবরাহের কাজে যেতেও শ্রমজীবীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। সবকিছু মিলিয়ে জীবনের গতি স্তব্ধ, থেমে আছে।

ইউরোপ ও পশ্চিমাবিশ্ব মূলত শিল্পনির্ভর। শিল্প সেখানে মৌল শক্তি হওয়ায় নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। সেখানে কৃষি আর এখন ওইভাবে নেই। বিনোদনের বিষয়বস্তু হয়ে গেছে নগরকেন্দ্রিক। গড়ে উঠেছে পাব, ক্লাব, ক্যাসিনো, সুপারশপ, মেগাশপ ইত্যাদি। এক্ষেত্রে নাগরিক জীবনে সামাজিক যোগাযোগ ও ঘনত্বের কারণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুততর হয়েছে। এবারেও আগের মতো মহামারি প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সংগনিরোধ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এ-অর্থে শারীরিক বিচ্ছিন্নতায় যেতে হয়েছে। ফলে ইউরোপে যান্ত্রিক জীবনের সীমানায় তাদেরকে এ বিচ্ছিন্নতা ও অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। সীমাবদ্ধ পরিসরে থাকা, বিনোদনের ভোগবিলাসী আচরণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের জনসাধারণ ভীষণ চাপে পড়েছে। আবার তারা হলো দৈনন্দিন আয় ও ব্যয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। প্রতিটি উপার্জনক্ষম মানুষ এ কারণে স্বনির্ভর। তারা অপরের কাছে নির্ভরশীল নয়। এর ফলে এখন তারা ব্যাপক অসহায়ত্ববোধ করছে। পেশাগত দায়িত্বে ছকেবাধা কাজে অভ্যস্ত হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তারা প্রথাগত আচরণে অভ্যস্ত নয়। ফলে এ পর্যায়ে এসে তারা মানসিক চাপে পড়েছে বেশি। মানুষের করুণ মৃত্যুর মিছিল দেখে আরও বেশি চাপে পড়েছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিক থাকাও কষ্টকর। ইতালি ও স্পেনে এমন কোনো পরিবার নেই যে তার কোনো সদস্য বা স্বজনের মধ্যে কাউকে হারায়নি। এ ভয়াবহ দৃশ্য যে-কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। এ অবস্থায় শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে আছে। অনেকেই এ ক্ষতির পর আর দাঁড়াতে পারবে না। যে আয় দিয়েই চলে ক্লাব, পাব, বিনোদনমূলক এবং সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলো। যে কারণে রেস্তোরাঁ, শপিংমলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও এগুলোতে কেন্দ্র করে প্রচুর লোক কাজ করতো। ইউরোপের পর্যটনশিল্পও এখন হুমকির মুখে। সব মিলিয়ে উৎপাদনহীনতায় জীবন ও খাদ্য সংকট চরমে।

আমাদের জীবনের সাথে তাদের চলাফেরার বিশাল ফারাক। আমরা শিল্পের দিকে দৌড়াচ্ছি কেবল। ফলে, আমাদের নগরায়ণ হচ্ছে মাত্র। ওই নগরের লোভে অনেক মানুষ আয়, জীবনের তাগিদে শহরে, নগরে চাকরিতে নিয়োজিত হয়েছে। ভাসমান ব্যবসায় জড়িত হয়েছে। রয়েছে সেখানে নানা ধরনের শ্রমজীবী। এরা সকলেই স্বল্পআয়ের মানুষ। করোনা সংক্রমণের কালে শুধু নয় এর আগেও আমরা দেখেছি সংকটকালে এ ধরনের লোকজনের সমস্যা হয় খুব বেশি। এরা নানামুখি সংকট ও ঝামেলার শিকার হয়। এমনিতেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে বুঝে না-বুঝে নিজেরাও বঞ্চনার কিছু নকশা, উপাদান তৈরি করে। ফলে, তারা বাঁচার আশা বা জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এ হতাশা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই করোনা বাস্তবতায়ও এসব খেটে খাওয়া মানুষের খুব সমস্যা হচ্ছে। আরেকটা বিষয় জরুরি যে, প্রতিকার নেই বলে ওই ভাইরাস প্রতিরোধে সকলকে ঘরে থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেকেই আছে যাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই। এরা ভাসমান জীবনযাপন করে। এতিম যারা, তাদের স্বজন নেই, বাড়িও নেই। এদের পক্ষে বেঁচে থাকাটাই এখন চরম কষ্টের। আছে নিম্নবিত্তের লোকজন। তারা সামাজিক দূরত্বের কারণে আটকে আছে। এবং কারও কাছে হাতও পাততে পারে না। এভাবে বহুবিধ সংকটে আমরা কারোনা প্রাদুর্ভাবকে আটকাতে চেষ্টা করছি, নিজেরাও আটকে আছি। (প্রথম পর্ব)

স্বপন নাথ : লেখক ও শিক্ষক

RTVPLUS

সংশ্লিষ্ট সংবাদ : করোনাভাইরাস

আরও
corona
দেশ আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪৭১৫৩ ৯৭৮১ ৬৫০
বিশ্ব ৬১৮৪৭২১ ২৭৫৪৬০৯ ৩৭১৩৮৩
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • মুক্তমত এর সর্বশেষ
  • মুক্তমত এর পাঠক প্রিয়