logo
  • ঢাকা বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সব স্মৃতিই কি ভালো লাগায় ডুবিয়ে দেয়?

মইনুল হক রোজ, সিনিয়র বিনোদন সাংবাদিক
|  ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৪৫ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৫৮
আইয়ুব বাচ্চু,
ছবি সংগৃহীত
কী দিয়ে শুরু করবো? কোথা থেকে শুরু করবো? খুব কঠিন একটা লেখা লিখতে হচ্ছে আমাকে। আসলে জীবনের খুব বেশি ভালোবাসার বা পছন্দের কেউ যদি হঠাৎই চলে যান তখন তাকে নিয়ে যদি স্মৃতিচারণ করতে হয় তা খুব কঠিন হয়ে যায়। কারণ স্মৃতি তখন মধুর না হয়ে কষ্টের রূপে ধরা দেয়। আমার অবস্থাটা এখন সেরকমই। যদিও আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ প্রায়ই আমাকে বলতো 'এই যে একসাথে আমরা ঘুরছি, সুন্দর সময় কাটাচ্ছি - এই স্মৃতিগুলোই থাকবে। হয়তো কোনও সময় যোগাযোগ থাকবে না, দেখা হবে না, মিস করব একজন আরেকজনকে, দেখবে তখন এই সুন্দর স্মৃতিগুলো মনে করলে ভালো লাগবে।'  কিন্তু আসলেই কি তাই?  সব স্মৃতিই কি ভালো লাগায় ডুবিয়ে দেয়?

আসলে জীবনে চলার পথে কিছু মানুষের সাথে সবারই দেখা হয়ে যায়। সেই মানুষগুলো অদ্ভুত একটা ছাপ রেখে যায় তাদের এমনভাবে যে চাইলেই আপনি ভুলতে পারবেন না তাদের। আর তারা এতটাই অদ্ভুত হয় যে তারা আপনার জীবনের সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে হুট করে চলে যায় আপনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই! আমার এই ছোট্ট জীবনে সেরকমই একটা মানুষের সাথে দেখা হয়েছিল। অদ্ভুত একটা মানুষ। তাঁকে ভালোবাসতো অগণিত মানুষ। ভুল বললাম 'ভালোবাসতো' না তাঁকে এখনও ভালোবাসে অগণিত মানুষ,বাসবেও চিরকাল। মানুষটাই যে অমন। নিজে যেমন কাঙাল ছিল ভালোবাসার জন্য, ঠিক তেমনি যাদেরকে তিনি আপন ভেবে কাছে টেনে নিতেন তাদের জন্যও তাঁর ভালোবাসা ছিল অসীম। তিনি আইয়ুব বাচ্চু, 'বস'। আমার 'বস', আমাদের 'বস', কোটি মানুষের ভালোবাসার 'বস'।

অদ্ভুত এই মানুষটার প্রতি ভালোবাসা, ভালোলাগার সবটারই শুরু গান দিয়ে। আমাদের স্কুল-কলেজের লাইফে ব্যান্ড শব্দটা ছিল এক ঘোর লাগা উন্মাদনার নাম। এই উন্মাদনার নেশায় আব্বা-আম্মার হাতে মার খেয়েছি মেলা। কিন্তু তাতে উন্মাদনা কমেনি কখনও, বরং বেড়েছে তা সবসময়। এখনকার মতো চাইলেই ইউটিউব বা অনলাইনে সার্চ করে গান শোনার সুযোগ আমাদের ছিল না তখন। বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে ৩৫ টাকা দিয়ে একটা ক্যাসেট কিনে (অনেক সময় ভাগেও কেনা হতো সেই ক্যাসেট), তা বাসায় এনে আব্বা-আম্মার হাতে - পায়ে ধরে হয়তো ১ ঘন্টার অনুমতি মিলতো ক্যাসেট প্লেয়ারে তা শোনার। সেই ১ ঘন্টা ছিল প্রথম প্রেমে পড়ে প্রথম চিঠি পাবার অনুভূতির মতো! সে আবেগ, সে ভালোলাগা বোঝাতে পারবো না এই ফেসবুক বা ইউটিউবের যুগে।

যাই হোক ১৯৯২ সালে পল্টন সুপার মার্কেটের দোতালায় জাহাঙ্গীর ইলেক্ট্রনিক্স এ এক বিকেলে গিয়েছিলাম এমনি ঘুরতে। পুরো পল্টন এলাকায় ওই একটাই তখন অডিও ক্যাসেটের দোকান। যেহেতু সবসময় ক্যাসেট কেনার মতো টাকা থাকতো না সেহেতু বিকেলে ওই দোকানের আশেপাশে ঘুরতাম ফ্রি গান শোনার লোভে। যেহেতু অডিও ক্যাসেটের দোকান প্রায় সারাক্ষণই হিন্দি বা বাংলা গান বাজতই। মাগরিবের আজান পর্যন্ত সেই ফ্রি গান শুনে ফিরে আসতাম বাসায়। তো সেরকমই এক বিকেলে গিয়েছিলাম সেই দোকানে। দোতালার সিঁড়ি বেয়ে উঠার সময়ই কানে ভেসে আসলো একটা গান। গানটা হলো 'ঢাকার সন্ধ্যা'। এই গানের শুরুতে একটা হাসি ছিল-সেটা শুনলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যেত। খোঁজ নিয়ে জানলাম এটা এল.আর.বি নামের একটা নতুন ব্যান্ডের গান। সেই নতুন ব্যান্ডের প্রথম ডাবল অ্যালবামের সবগুলো গানই এক নতুন নেশার জন্ম দিয়েছিল তখন। সেই যে ভালোবাসলাম গানের মানুষটাকে তা বুকের ভেতর বহমান এখনও।

আইয়ুব বাচ্চু- এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। এই বিশাল মাপের মানুষটির সাথে টানা ২০টি বছর মেশার, তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ভক্ততো তার ছিলামই আগে থেকে কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় আসার পর কর্মসূত্রেই পরিচয়ের শুরু। জানিনা কোনও এক অজানা কারণে 'বস' আমাকে পরিচয়ের প্রথমদিন থেকেই বেশ পছন্দ করেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে সেই পছন্দটা পেশাগত সীমারেখার বাইরে যেয়ে হয়ে উঠেছিল পুরোপুরিই আত্মিক। আসলে সেই সম্পর্কের নামটা যে কি তাই বলা কঠিন আমার জন্য।

---------------------------------------------------------------
আরো পড়ুন: এই আঘাতে নির্লজ্জ সমাজ কতটা সাবধানী হবে? (ভিডিও)
---------------------------------------------------------------

সময় যতো গড়িয়েছে আমার প্রতি বসের ভালোবাসা, বসের প্রতি আমার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা চক্রাকারে বেড়েই চলেছে। বস কোনও এক কারণে আমাকে শুরু থেকেই খুব আদর করতেন। আমি আজও জানিনা সেই কারণটা কি। আমার এই ছোট্ট জীবনে কি নাই তার সাথে? রাগ,অভিমান, সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা কত কত স্মৃতি। প্রায় ২০টা বছর এই মানুষটা আমাকে আগলে রেখেছিলেন সন্তানের মমতায়, ছোট ভাইয়ের ভালোবাসায়। শেষের দিকে একটু কথা কম হতো বসের সাথে। তবে দেখা হতো নানা অনুষ্ঠানে। দেখা হলেই বা কথা হলেই প্রথমেই বলতেন 'কি রে ভুলেই তো গেলি?' আমি বলতাম 'কি যে বলেন বস? আপনারে ভুলবো আমি?'  বস দেখেন আমি আপনাকে ভুলি নাই। কিন্তু আপনি আমাকে ভুলে চলে গেলেন। বস আমি এখন কাকে বলবো 'বস একটু কথা আছে, একটা ঝামেলা হইসে। আপনি আছেন কিচেনে?'  কে আমাকে বলবে 'আয়, আছি আমি।' এই স্মৃতি আমাকে কোনও ভালোলাগায় ভাসাবে? এর জবাব বা উত্তর কোনোটাই আমার কাছে নেই, জানাও নেই।

এই যে আপনার চলে যাওয়ার একটা বছর হয়ে গেল। আপনাকে হারানোর হাহাকার, ব্যথা, কষ্ট কোনোটাইতো কমেছে না আমাদের। এখনও মন খারাপ হলে আপনার গান শুনি, মন ভালো থাকলেও আপনার গান শুনি। বন্ধু, সহকর্মীদের আড্ডায় অবধারিতভাবে আপনার গল্প উঠে আসে। মুহূর্তেই তখন দেখি খানিক আগের হাসিখুশি মানুষগুলোর মুখে বিষণ্ণতা, কষ্টর ছাপ। চোখের কোণে জলের আভাস।

আপনি এমন এক মানুষ যে কিনা চলে যেয়েও হৃদয়ের রাজ্যের 'বস' হয়ে বসে আছেন। আমি, আমরা সেই 'বস'কে ভালোবাসি, ভালোবাসবো আজীবন। এক বছর না ,দশ বছর না, যুগ যুগ ধরে আপনিই থাকবেন আমাদের হৃদয়ের রাজ্যের 'বস' হয়ে। ভালো থাকুন 'বস'। ওপার থেকে ভালোবাসা দিয়েন আমাদেরও।

(লেখক- সিনিয়র বিনোদন সাংবাদিক এবং আইয়ুব বাচ্চুর ঘনিষ্ঠজন)

এম 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • মুক্তমত এর সর্বশেষ
  • মুক্তমত এর পাঠক প্রিয়