‘মানুষ যত ওপরে ওঠে, তত ভদ্র হতে হয়, হাম্বল হতে হয়। আর আমাদের এখানে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো। এটা তখনই হয়, যখন হঠাৎ পয়সার জোরে মানুষ নিচ থেকে ওপরে উঠে যায়। তখন তারা ভাবে ‘মুই কী হনুরে’। সমাজের এই জায়গাটায় একটি আঘাত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। অসৎ উপায়ে অর্জিত অর্থের বাহাদুরি, সে সম্পদের শো-অফ করা, আর যারা সৎ পথে চলবে তারা একেবারে মরে থাকবে এটা তো হতে পারে না।’ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন।
নীতি আদর্শের বাক্য শুনে বাঙালির প্রতিটি সন্তানই বড় হয়। বিনয়ী হও, ভদ্র হও এসব কথা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা হরহামেশাই বলে থাকেন। এবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সেই কথা বলছেন। এসব কথা বলার পেছনে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজি আমি। আমাদের সব শুভ কাজে শুভ ইচ্ছার বাধাটা কোথায়? আমরা কেন হাম্বল/বিনয়ী নই? কেন বিরোধী মতকে পিটিয়ে হত্যা, কেন ব্যাংক লুট, কেন জুয়া, কেন কেন কেন? নৈতিকতার স্খলন আর মানবতার এই পতনে নির্লজ্জ সমাজের বাসিন্দা কি আমরা?
দেশের জন্য যেখানে সাধারণ কারও উদ্বেগ হতে নেই। কথা বলতে নেই, আর চিৎকার সেখানেতো তাদের মুখে সুপারগ্লু। রাজনৈতিক ব্যবস্থার কটু দৃষ্টিগুলো ধরিয়ে দিয়েতো প্রয়োজন অগ্রসর চিন্তার।
‘মানি ইজ নো প্রবলেম- এমন কথা বলেই তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে রাজনীতিকে নষ্ট করা হয়েছে। ...তারাই ঘুষ খাবে, দুর্নীতি করবে, সবকিছু করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার আঘাতের এই পদক্ষেপ সময়োচিত। তবে এটা যদি কেবলই লোক দেখানো বা সাময়িক হয়, তাহলে হয়তো এর উল্টো ফল পাবে দেশ। নির্দ্বিধায় বলা যায় ব্যর্থ হবে সাময়িক পদক্ষেপেরও অর্জন।
‘মসজিদে যাবে নামাজ পড়তে, সেখানে গিয়েও তার ফুটানি দেখাতে হবে, তার বডিগার্ড থাকবে, তার জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে, তার গাড়ি ঢুকবে বলে সব গাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে, তার স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স- যাদের কোনও লাইসেন্স নেই, কোনও নিয়ম নেই, কিছু নেই, মনে হয় কোনও দেশের রাজা এসেছে নামাজ পড়তে। এমন বৈষম্য কেন থাকবে? আপনার মতো এমন প্রশ্ন মুখে মুখে। স্বাধীনতার পর ৭৫ এর হোঁচট আমাদেরকে থামিয়ে দিয়েছিলো। সামনের দরজা বন্ধ করে খুলেছিল পেছন দরজা। পেছনের দরজায় আশ্রয় নেয়া ব্যক্তিরাই ফাকফোঁকড় খুঁজতেই আবারও পেছনে টানছে। তাদের আধিপত্যে যেহেতু আঘাত এনেছেন সেই আঘাত প্রসারিত হোক। আর যেন তারা পথ উল্টে চলতে না পারে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এখন বিষয়টি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। টেন্ডারবাজি , চাঁদাবাজি, হত্যা, মদ, জুয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস, শেয়ার বাজার লুটেরা আনুগত্যের খাতিরে পার পাবে নাকি অসত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণের সাজার মতই সেও আইনের আওতায় আসবে।
দেরি অথবা ধীর যেটিই বলি না কেন শুরুটা হয়েছে এটাই সত্য মানতে চায় সাধারণ মানুষ। এমন পদক্ষেপে ভুলতে চায় এমন প্রশ্ন, এদের সংখ্যা কম তাহলে কেন কোটি মানুষের লক্ষ্য অর্জন সফল হচ্ছে না?’ প্রধানমন্ত্রী, প্রশ্নটা এ কারণে আপনার সেই আঘাতের পরও কেন আবরারের লাশ বহন করতে হলো বাংলাদেশকে?
সমাজকে কানাগলি থেকে বের করে আনতে এই আঘাতের অর্ধপথে হাঁটার ফল ভালো হবে না। কঠিন হলেও মূলোৎপাটনেই মনোযোগ রাখতে হবে। আর আঘাতের সফল পরিণতির প্রত্যাশায় বিশ্বাস করতে চাই সামগ্রিক স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর সমাজ এগিয়ে নেবার আঘাত, দানবীয় সব পরিস্থিতির অবসান হবে। সেই অবসানে পাশে থাকবে সৃষ্টিশীলরাই।
সব শেষ ভুপেন হাজারিকা দিয়ে শেষ করতে চাই.. উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে লক্ষজনেরে সবল সংগ্রামী আর আগ্রগামী করে তোলো না কেন? নিশ্চয় আর শব্দহীন থাকবে না আপনার প্রশাসন।
মুক্তা মাহমুদ
সিনিয়র রিপোর্টার, আরটিভি




