প্রবাসী নারীকর্মীদের সুখ-দুঃখের সাতকাহন

প্রকাশ | ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:০১ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:৫৭

মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান

বহুকাল আগে থেকেই অধিক উপার্জন আর উন্নত জীবন জীবিকার আশায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও প্রবাসের বিভিন্ন কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর শ্রম অভিবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর এইদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি নারী ও পুরুষ কর্মী যুক্ত হচ্ছে। তার তুলনায় কর্মসংস্থানের হার একেবারে কম। তাই এর বিরাট একটি অংশ প্রতিবছর কর্মহীন হয়ে পড়ে।

কর্মহীন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নানারকম সমস্যার সূত্রপাত হয়। তখন আমাদেরকে একরকম বাধ্য হয়েই ভাবতে হয় শ্রম অভিবাসনের কথা। যদিও স্বাধীনতার পরপরই আমাদের দেশের নারীরা দেশের অভ্যন্তরে নানা কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে পারিবারিক স্বচ্ছলতা ও দেশের অর্থনীতিতে নিরন্তর অবদান রাখা শুরু করেছে। এর যাত্রা অনেক আগেই বাংলাদেশের নারী কর্মীদের শ্রম অভিবাসন শুরু হয়েছিল তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের নারীরা সরাসরি শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে নারীকর্মী প্রেরণ শুরু করে। বাংলাদেশের নারীকর্মীদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। আবার কখনো বন্ধ হয়ে ফের চালু হয়েছে। নারীকর্মী প্রেরণের এই উত্থানপতনের ধারায় বাংলাদেশ প্রায় ২০-২৫ টি দেশে মোট ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারীকর্মীকে বিদেশে চাকুরির জন্য প্রেরণ করেছে। আমরা তাদের শ্রমঘামের রেমিটেন্সও পেয়েছি প্রচুর। তাদের রেমিটেন্সই আমাদের বিকাশমান অর্থনীতিকে দেখিয়েছে নতুন গতিপথ।

আমরা কতটুকু ভাবছি তাদের কথা। রেমিটেন্সের ডলার বা টাকার গায়ে যেমন একাধিক রঙ বিদ্যমান। তেমনি বিশাল রেমিটেন্স পাহাড়ের গহীনকোণে প্রবাসী নারীকর্মীদের রেমিটেন্স অর্জনের স্মৃতিতে আছে দুটি রং- একটি সুখের, আরেকটি দুঃখের। কিছু স্মৃতি সুখময় আবার কিছু স্মৃতি রীতিমত ভয়ঙ্কর। সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসে দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা তুলে ধরছেন। গণমাধ্যমের সুবাদে তা আমাদেরকেও রীতিমতো বিচলিত করে তুলেছে।

বাংলাদেশের নারীকর্মীদের শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রথমদিককার ইতিহাস অতটা সুখকর ছিলনা। তখন যেসব নারীকর্মী বিদেশে যেতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন অদক্ষ। তাদের অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে কোন নিয়মিত চাকরি বা কর্মে নিযুক্ত ছিলেন না। তাদের অনেকে সমাজ সংসারের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পরিবারের হাল ধরার আশায় বাধ্য হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে।

তাদের কেউ কেউ দেশে মাটিতে সহায় সম্বলহীন হয়ে, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে,পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষার পাত্র হয়ে, প্রতারক প্রেমিকের প্রেম বঞ্চনার শিকার হয়ে, পাড়া মহল্লায় উঠতি মাস্তান আর বখাটে যুবকের উৎপাতে,দেশের অভ্যন্তরে কর্মক্ষেত্রে নানা লোকের কুপ্রস্তাব হতে রক্ষা পাওয়ার আশার হাতছানি দেখেছিল সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। শ্রম অভিবাসী নারীকর্মীর এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন বাগেরহাটের চার সক্ষম সন্তানের এক জননী। এই মিছিলে আজও শরিক হচ্ছে দেশের হাজার হাজার কিশোরী-তরুণী-যুবতী-মহিলা।


এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশের মাটিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে কর্মস্থলে হাসিমুখে কাজ করে গেছেন। আর হাসি ফুটিয়েছেন দেশে রেখে যাওয়া অসহায় পরিবারের মুখে। বীরত্বের সাথে নিজ কর্মস্থলে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। প্রশংসাও পেয়েছেন প্রচুর। আপন করে নিয়েছেন বিদেশকে,আপন হয়েছেন বিদেশের মানুষের। অর্জিত অর্থে দেশে গড়েছেন স্বপ্নের সিঁড়ি। সেই সিড়ি বেয়ে এগিয়ে গেছে দেশের অর্থনীতি। প্রতিবেশীর কাছে হয়েছেন অনুকরণীয় উদাহরণ।

এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বিরতিহীন ভাবে দীর্ঘ সময়ধরে কাজ করানো,সঠিক বেতনাদি সময়মত পরিশোধ না করা, দীর্ঘ সময় খেতে না দেওয়া, অবসর-বিনোদন-ছুটির ব্যবস্থা না করা, নিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি কারনে ব্যর্থতার ডালি মাথায় বিফল হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ সমাজ বা পরিবার কর্তৃক ধিকৃত হয়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কেউ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। কেউ কেউ হাসপাতালে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই তাদেরকে অচ্ছুৎ, দায় বা বোঝা জ্ঞান করছেন।

সফল হোন আর বিফল হোন-এরা কারো না কারো মা বোন। ব্যর্থ হলেও এরা কেউ ফেলনা নয়। এরা কোন ভাবেই বাংলাদেশের জন্য দায় বা বোঝা নয় বরং এরা বাংলাদেশের মানবসম্পদ। সরকার তাদেরকে এইভাবেই মূল্যায়ন করে। তাই সরকার তাদের প্রেরিত অর্থ আর অর্জিত মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে উৎসর্গ করতে চায়। এ লক্ষ্যে সরকারের সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সাথে নিয়ে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের পুনর্বাসনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার মাধ্যমে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের সবধরনের সামাজিক নিরাপত্তাসহ দেশেই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটবে।

এছাড়া সরকার ওয়েজ আর্নার্স আইন-২০১৭ নামে একটি আইন পাস করেছে। এতে বলা আছে- ওয়েজ আর্নার্স বোর্ড বিদেশে কর্মরত কোন নারী অভিবাসী কর্মী নির্যাতনের শিকার, দুর্ঘটনায় আহত, অসুস্থতা বা অন্যকোন কারণে বিপদগ্রস্ত হলে তাদের উদ্ধার ও দেশে আনয়ন, আইনগত ও চিকিৎসাগত সহায়তা নিশ্চিত দেওয়া, এছাড়া দেশে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও পূনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং দেশে বিদেশে সেফহোম ও হেল্প ডেস্ক পরিচালনা করতে পারবে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ থেকে নারীকর্মী প্রেরণ শুরু হলে প্রথম বছরই ২১৮৯ জন নারী কর্মী বিদেশে গমন করে। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল এই সংখ্যা কোনভাবেই দুই হাজারকে অতিক্রম করতে পারেনি। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই চার বছরে মোট ২৪১৮ জন নারীকর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। আবার ২০০৪ সাল থেকে এই সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তেই থাকে। প্রসঙ্গত ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীকর্মীদের সৌদিআরবে কর্মসংস্থান প্রায় বন্ধই ছিল। ২০১৫ সালে সৌদির শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার ফলে ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ সালে নারীকর্মীর বিদেশ গমনের সংখ্যা রাতারাতি লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই বছরে মোট ৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮৩২ জন নারীকর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গিয়েছে ২ লক্ষ ৪৬ হাজার নারীকর্মী।

১৯৯১ সাল ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারী কর্মী বিদেশে গমন করেছে। উল্লেখ্য ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া, যশোর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের নারীকর্মীদের বিদেশে গমনের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ সরকার নতুন করে হংকং, জর্ডান, লেবানন, ওমানসহ কয়েকটি দেশের সাথে বিভিন্ন সেক্টরে নারীকর্মী প্রেরনের কার্যক্রম সংক্রান্ত চুক্তি করেছে। অন্যান্য দেশেও নারী কর্মী প্রেরনের জন্য বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বিস্তারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

পুরুষকর্মীর তুলনায় নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসন একটু কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। সিডও সনদের ১১.৫ নং ধারায় অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার ও সমমর্যাদা সম্পর্কে বলা আছে-স্বাক্ষরকারী সদস্য রাষ্ট্রসমুহকে নারীকর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তারপরেও বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীদের হয়রানি ও নির্যাতনমূলক ঘটনা ঘটছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

যেমন-আমাদের নারীকর্মীরা গৃহপরিচারিকা পেশায় বিদেশে যায়। যেহেতু তারা কাজ করেন ঘরের ভিতরে আর নারী কর্মীরা অধিকাংশই উঠতি বয়সের কিশোরী-যুবতী হয়ে থাকেন এবং গৃহস্বামী বিমানভাড়া, মেডিকেলসহ অন্যান্য খরচ দিয়ে মনোনীত করে নারীকর্মীদের তাদের ঘরে নিয়ে যান, একারণেই হয়তো কিছু কম মানবিকতাবোধ সম্পন্ন বিত্তশালী মালিক নারীকর্মীদের নিজেদের কেনা বাদী মনে করতে পারে।

নিজের ঘরে অন্যদেশের গৃহকর্মীর উপর যাদের লোলুপ দৃষ্টিতে নির্যাতন, খুন জখম ধর্ষণ গর্ভধারণ-সত্যিই অত্যন্ত পরিতাপের। প্রতারিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নারীকর্মীরাও কিছু অংশে কমবেশি দায়ী আছেন। যেমন-কেউ কেউ আছেন যে গ্রামের অশিক্ষিত ও দরিদ্র নারী নানা লোভের বশবর্তী হয়ে পরিবারের একরকম মতামত ছাড়াই যথাযথ দক্ষতা অর্জন না করেই, ভাষা-সংস্কৃতি-আইন কানুন-খাদ্যাভ্যাস সমন্ধে কোন কিছু না জেনে কোন প্রকার ট্রেনিং না নিয়ে আগেপাছে কিছু না ভেবে বিদেশ নামক অজানার পথে পা বাড়ায়। এমন ও অনেকেই আছে যারা জীবনে একবারও দেশের রাজধানী শহর ঢাকাতেই আসেননি অথচ এক দৌড়ে চলে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে।

এদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন আধুনিক প্রযুক্তির যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে অতটা পরিচিতও নন। এমনও নারী কর্মী পাওয়া যায় যারা আরবি ভাষার অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটা শব্দও জানেনা। তারা জানেনা 'আমি বিপদে আছি' এর আরবি কি, 'আতিকা খুলুস ' এর বাংলা কি? তারা এও জানেনা সৌদিআরবের 'মামা' পুরুষ না মহিলা। যারা বাংলাটাই ঠিকমতো পড়তে লিখতে জানেনা তাদের জন্য বৈদেশিক ভাষায় যোগাযোগ রক্ষা সত্যিই দুরুহ।

আবার অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে অতিরিক্ত হোমসিকনেস, কম অভিযোজন ক্ষমতা, অধিক কাজের চাপ সহ্য করতে না পারা, চেনাপরিচিত লোকের সাক্ষাৎ না পাওয়া, খাদ্যাভ্যাস-পরিবেশ-সংস্কৃতির মিল না পেয়ে, অবসর-বিনোদন-ছুটি না পেয়ে দেশে ফিরতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন। আবার অনেকে দুধের শিশু, কোলের বাচ্চা, স্বামীর সংসার, বৃদ্ধ পিতামাতা, প্রাণপ্রিয় প্রেমিক প্রমুখের টানে সামান্য বিচ্যতিতেও নারীকর্মী দেশে ফিরে আসেন। অনেকে অভিযোগ করেন, কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই বিদ্যমান। তার মানে এই না পৃথিবীর সবাই খারাপ।

যেসব নারীকর্মী বিদেশে গেছেন তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ ভালো অবস্থায় আছেন।বাকিরা হয়ত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এর জন্য যথাযথ শাস্তির বিধানও আছে। সরকার, মন্ত্রণালয়, দূতাবাস, যথারীতি বিষয়গুলি মনিটরিং করছে। যেহেতু তারা একরকম বিনা খরচে বিদেশে যায় তাই হুটকরে দেশে ফিরে আসতে তেমন চিন্তাভাবনা বা স্ট্রাগল করার বিষয়টি বিবেচনায় আনেন না।

তবে শিক্ষিত মহিলাদের উন্নত ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে বিদেশে পাঠালে তারাও নিরাপদে কাজ করতে পারবে এবং দেশেও অধিক পরিমাণ রেমিটেন্স আসবে। দেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। আর বৈদেশিক হোক আর দেশীয়ই হোক কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নারীকর্মীকেও সচেতন ভাবে কিছু ভুমিকা পালন করতে হবে।

প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশ থেকে প্রত্যাগত হয়ে নারীকর্মীরা বাংলাদেশে আসছেন। শোনা যাচ্ছে নানা বিষাদময় সব গল্প। তখন দেশের অনেক মহল থেকেই নারী কর্মীদের বিদেশে প্রেরণের ব্যাপারে নানা উদ্বিগ্ন মতামত আসছে। কেউ কেউ আবার বিদেশে নারীকর্মী পাঠাতে সরাসরি নিষেধ করছেন। তবে অভিবাসন একটি স্বাভাবিক এবং প্রায় স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। কাজের খোঁজে মানুষ স্বউদ্যোগেই বিদেশে যায়। এই স্বাভাবিক অবস্থা অস্বাভাবিক করে তুললে পরিণামে চরম মূল্য পরিশোধ করতে হয়।

বাংলাদেশের নারী সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি ও টেকসই সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি করতে নারীকর্মীর শ্রমভিবাসন অত্যন্ত জরুরি। লক্ষণীয় যে, বিগত সময়ে নারী কর্মীর অভিবাসন বিভিন্ন কারনে ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলি থেকে যৌনব্যবসার উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে নারীপাচারের ঘটনা ঘটতো। তাই বলা হয় অভিবাসন ও মানবপাচার একে অপরের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। অভিবাসন ব্যাহত হলে মানব পাচার বেড়ে যাবে -এটাই স্বাভাবিক।

নিঃসন্দেহে সৌদিআরব বাংলাদেশের বড় একটি শ্রমবাজার এবং ভাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ। ধর্মের খাতিরে আমরা আরো কাছাকাছি ভাবি। আমাদের শ্রমিকেরাও সেখানে যেতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যেদেশে প্রেমের শাস্তি শিরশ্ছেদ, চুরির শাস্তি হাত কেটে ফেলা সেদেশে ভিন দেশের গৃহকর্মীর উপর পাশবিক নির্যাতন কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যদিও সবাই জড়িত নয়, তারপরও যেকোন বিরূপ ঘটনার তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত। আমরা সৌদিআরব কে আমাদের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধার অবস্থানে রেখেছি নিশ্চয় সৌদিআরব সে সম্মান সম্পর্কে সচেতন আচরণ করবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে।

নারীকর্মীর নিরাপদ, নিয়মিত, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশেই বিদেশ গমনেচ্ছু নারীকর্মীদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে বিএমইটি তে নারী অভিবাসী কেন্দ্র স্থাপন করেছে,দেশের প্রায় সব জেলা/উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যথাযথ ভাষা ও ট্রেড প্রশিক্ষণ প্রদান করে নারী কর্মীদের যোগ্য করে তুলছে, নারীকর্মীর অধিকার রক্ষায় দেশেবিদেশে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীকর্মীদের জন্য সেফহোম, শেল্টার হাউজ, দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা, দূতাবাস ও লেবার উইংয়ের মাধ্যমে নারীকর্মীর সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নারীকর্মীর নিরাপত্তা-নিরাপদ কর্মপরিবেশ-বেতন ও ক্ষতিপূরন আদায়ে নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত নেগোসিয়েশন করছে।

প্রত্যাগত নারীকর্মীরা বিমানবন্দরে আসার সাথে সাথে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে মেডিকেল সুবিধাসহ নানা সহায়তা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। আর সবার জন্য রয়েছে বিপদের সাথী ২৪ হটলাইন প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার যার নাম্বার (+88 01784 333 333, +88 01794 333 333 এবং +88 02-9334888)। কোনরকম প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সরকার বিদেশ গমনেচ্ছু নারী পুরুষ সকলকে জেনে বুঝে ভাষা শিখে যথাযথ ট্রেনিং নিয়ে শ্রম অভিবাসনে যুক্ত হতে আহ্বান করছে।

নারী কর্মীরা জেনে, বুঝে, ভাষা শিখে,বেসিক আইনকানুন জেনে, যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গেলে, দেশীয় প্রশিক্ষণের মান ও মেয়াদ বাড়ালে, তাদের প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন দেওয়া হলে, পাসপোর্ট ও ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো নজরদারি বাড়ালে এবং সকার ও দূতাবাসের মাধ্যমে নারীকর্মীর খোঁজ নিলে, সময়ে সময়ে মালিকের সাথে কর্মীর ব্যাপারে নেওয়া হলে,মাঝেমধ্যে ছুটি-অবসর-বিনোদনের ব্যবস্থা করা হলে, সুষ্ঠু ডাটাবেইস ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার হলে, নির্যাতন ও প্রতারণাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলে নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যাই লাঘব হতে পারে।

টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে জাপান প্রবাসী নারী কর্মী নাসরীনের গল্প দিয়েই শেষ করছি। ২০১৭ সালে আইএম জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরান ঢাকার মেয়ে নাসরীন টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে সম্পূর্ণ বিনা খরচে জাপানে যায়। নাসরীনের ব্যক্তিত্ব, আচার -ব্যবহার, জাপানী ভাষা শিক্ষণের পারদর্শিতা, কর্মস্পৃহা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে যান আইএম জাপানের সিইও কিয়োই ইয়ানাগিসাওয়া। নাসরীনও খুব সহজে জাপানী ভাষা ও সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস ও পরিবেশের সাথে নিজেকে মানানসই করে গড়ে তুলেন। এতে খুশি হয়ে ইয়ানাসান তাকে নাতনী বানিয়ে নেন। গড়ে তোলেন এক পরম আত্মীয়তার সম্পর্ক।

এবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নাসরীনের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে। সেই অনুষ্ঠানে আইএম জাপানের সিইও মহৎপ্রাণ ইয়ানাসান স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। নাতনীর বিয়ে বলে কথা! বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে নাসরীন আবার চলে গেছেন জাপানে। নাসরীন নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে শুধু ইয়ানাসান নয় পুরো জাপানকে জয় করেছে। নাসরীন সফল হয়েছে। নাসরীনই হোক বাংলাদেশের সকল প্রবাসগামী নারী কর্মীর প্রতিচ্ছবি। সব নারীকর্মীর গল্প হোক নাসরীনের গল্পের মত। সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে জয় হোক নাসরীনদের। জয় হোক সকল নারীকর্মীর।

মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান, জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।