smc
logo
  • ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭

প্রফেসর এমাজউদ্দীনের প্রস্থানে অপূরণীয় ক্ষতি 

  মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার

|  ২৭ জুলাই ২০২০, ১৮:৪৭ | আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২০, ১৯:৩৬
Professor Emajuddin
প্রফেসর এমাজউদ্দীন
রাজনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজ, শিক্ষা ও প্রশাসন নিয়ে প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের মতো সুচিন্তক এ দেশে আর জন্মাবে কি-না, সেটা একেবারে ভবিষ্যত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর এমাজউদ্দীন আহমদ যেন প্রায় কাছাকাছি শব্দ। রাজনীতির লেখা মানে এমাজউদ্দীন আহমদ। কাউকে আহত না করে রাজনীতির গুছানো বক্তৃতা মানেও তিনি। রাজনীতির নানা কথা তিনি আর শোনাবেন না। লিখবেন না।

গেলো ১৭ জুলাই ৮৭ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। স্যারের অকৃত্রিম স্নেহ আমি পেয়েছি। পরম মমতায় এই প্রাজ্ঞজনের মুখ থেকে 'বাপু' ডাকটি আর শোনা হবে না। ২০১৭ সালে ৮ জুলাই বাবার মৃত্যুর পর খুব ভেঙে পড়েছিলাম। এমাজউদ্দীন স্যার আমার ওই কষ্টকর সময়ে তখনকার ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই আমি বাড়ি থেকে ঢাকায় যেদিন এসেছি সেদিনেই তিনি পরম মমতায় তার কাঁটাবনের বাসায় ডাকলেন। 

মাথায় হাত বুলালেন। বুকে জড়িয়ে নিলেন। বললেন, আমি তোমার জন্মদাতা নই। এরপরও আমি আজ থেকে তোমার বাবা। তুমি আমার সন্তান। আমি যেন পুনর্জন্ম নিলাম সেদিন। স্যারের সঙ্গে সম্পর্ক আরো আগে হলেও সেদিন থেকে সুযোগ হয় তাকে আরো চেনার, আরো জানার । আমার  পথচলায় প্রদর্শক হিসেবে স্রষ্টার দানের মতো আবির্ভুত হন তিনি। 

স্নেহের সঙ্গে তার কাছ থেকে প্রাপ্তি যোগ হয়েছে দুটি জিনিস। ২০১৭ সালের একুশে গ্রন্থ মেলায় বাংলাদেশের সুনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দি ইউনিভার্সেল একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘গণতন্ত্র এখন’ এবং ‘গণতন্ত্রের শত্রু মিত্র’ বই দুটির সত্ত্বাধিকার ( কপিরাইট -) মালিকানা আমার নামে দিয়েছেন। প্রকাশের আগেই এই দান সম্পন্ন করেছেন তিনি। কেবল তা নয়, বইয়ের কবারের ফ্ল্যাপ ও ভুমিকায়ও তা উল্লেখ করে দিয়েছেন। 

আমার জীবনে এই দুই প্রাপ্তি তার বিশাল দান। এর চেয়ে সেরা উপহার আর কী হতে পারে! মৃত্যুর দুদিন আগে ১৫ জুলাই সকালেও স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে আগামী বছরের একুশে গ্রন্থ মেলায় নতুন বই প্রকাশনা নিয়ে। এটাই জীবনের সর্বশেষ কথা ১৫ জুলাই বুধবার। কে জানতো সেটাই হবে তাকে শেষ দেখা। নিজের বাবাকে হারানোর কষ্ট কিছুটা লাগব হয়েছিল এমাজউদ্দীন আহমদকে বাবা হিসেবে পেয়ে। এই শোক হাল্কা করার আর কিছুই থাকলো না আমার। 

শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, প্রশাসক- তিন অঙ্গণেই ছিলেন সফল। রাজনীতি ও রাষ্ট্র-সংক্রান্ত তার সব লেখাই ছিল স্পষ্ট এবং নিরপেক্ষ। যা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তিনি সব দলের লোকদের দেখেছেন সমানভাবে। সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন এই মানুষটি সবার সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করতেন। কেবল শিক্ষার্থদের নয়, ছিলেন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকামী মানুষের কল্যাণ চেয়েছেন সব সময়।  

দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে নিজের অগাধ জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন কর্মজীবনে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার উজ্জ্বল ভূমিকার কথা মর্মে মর্মে স্মরণ করছেন ওই আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। সেই বিবেচনায় জাতি হারিয়েছে রাজনীতির উপরে থাকা এক রাষ্ট্রচিন্তক, উদার চিন্তার ধারক, আলোকবর্তিকাকে। আর আমি হারিয়েছি পিতৃতুল্য অভিভাবককে। 

আমার দৃঢ়বিশ্বাস দেশকে আরো অনেক কিছু দেয়ার ছিল তার। যার সুযোগ নিতে পারতো বিএনপি। বিএনপি সেইভাবে কাজে লাগায়নি। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির আসনে প্রফেসর এমাজউদ্দীন থাকলে ওয়ান ইলেভেনের বিপর্যয় না-ও ঘটতে পারতো। জীবন দিয়ে হলেও সেই অপশক্তি রুখে দিতেন তিনি। অথবা তার ব্যক্তিত্বের তেজ-মহিমায় সেই দুঃসাহসই হতো না তাদের। অবধারিতভাবে ইতিহাসটা তখন ভিন্ন হতে পারতো। জাতি থাকতো কলঙ্কমুক্ত। 

এমাজউদ্দীনের ভিন্নমতালম্বীরাও জানেন, নির্মোহভাবে দেশের কল্যাণ সবসময় চেয়েছেন তিনি। সেটা অবশ্যই বহুদলীয় ভিত্তিতে। সবাইকে নিয়ে, সবাইকে দিয়ে এবং সবার জন্য। তাঁর দেশপ্রম ছিল নিখাদ। দেশের রাজনীতির দূরাবস্থা সবসময় তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। তবে তিনি ছিলেন আশাবাদী মানুষ। প্রতিটি বক্তৃতা এবং লেখায় উল্লেখ করতেন, ‘রাজনীতির এই অসুস্থতা শিগগিরই দূর হবে। দূর হবে সমাজজীবনে অগ্রহনযোগ্য শত উপসর্গ। আবারও এ সমাজে দেখা দেবে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি।"

সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় না দেয়াতেই এতো আশাবাদ ছিল তার। একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ দেখতে অপেক্ষমান ব্যক্তিটি এভাবে বিনা নোটিশে চলে যাবেন-ভাবনায়ও ছিল না কারো। জীবদ্দশায় মেধা ও নানা গুণে-মানে, বিশেষ করে শিক্ষকতায় নিজের একটা ভিন্ন উচ্চতা তৈরি করেছেন। নিজের যোগ্যতা-বৈশিষ্ট্যে এ অর্জন তার। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, ১৯৫২-এর পরবর্তী সময়ে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা। 

তখন কারাবরণও করতে হয় তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে পরে তিনি এই বিদ্যাপীঠেরই শিক্ষক হন। রাজনীতি, প্রশাসনব্যবস্থা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক বাহিনী সম্পর্কে তার গবেষণাগ্রন্থ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে সমাদৃত। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা (১৯৬৬), মধ্যযুগের রাষ্ট্র চিন্তা (১৯৪৫), তুলানামূলক রাজনীতি : রাজনৈতিক বিশ্লেষণ (১৯৮২), বাংলাদেশে গণতন্ত্র সংকট (১৯৯২), সমাজ ও রাজনীতি (১৯৯৩), গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ (১৯৯৪), শান্তি চুক্তি ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৯৮), আঞ্চলিক সহযোগিতা, জাতীয় নিরাপত্তা (১৯৯৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০০০) উল্লেখযোগ্য। ইংরেজিতেও কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের  জন্য অমূল্য পাঠ হয়ে থাকবে। 

বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকলেও ভিন্নমতকে বরাবরই শ্রদ্ধার এক অনন্য গুণ ছিল তার। কাউকে আহত বা অসম্মান না করেও যে সঠিক কথা বলা যায়, পরামর্শ দেওয়া যায়- তা সবার পক্ষে আসলে সম্ভব নয়। এ জন্য মেধা-সততার সঙ্গে শালীনতা চর্চার বিষয়ও থাকে, যা ভরপুর ছিল এমাজউদ্দীন স্যারের মধ্যে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এমাজউদ্দীন আহমদই ঢাকায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে পৌঁছে দেন চিঠি। 

মোটকথা দলান্ধ ছিলেন না। নিজের চিন্তাচেতনা, ভাবনায় নিজস্বতা চর্চার পাশাপাশি সবাইকে সম্মান করেছেন। মুক্ত মত ও বিবেকবোধের স্বাতন্ত্র্যের কারণে তার আলাদা আমল ছিল প্রতিপক্ষ মতের কাছেও। বাংলাদেশের রাজনীতির এমন টানা পর্যবেক্ষণসম্পন্ন দ্বিতীয়জন নেই বললেই চলে। জীবনের ৫০টি বছর মন-মনে-মগজে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন দেশ, সমাজ ও রাজনীতি চর্চায়। 

রাজনীতির শত দুরবস্থায়ও সবসময় তাকে দেখা গেছে আশাবাদী হিসেবে। প্রতিটি লেখায়ই দেখতেন-দেখাতেন রাজনীতির সুবাতাসের দিশা। বলতেন, এই অসুস্থতা কেটে যাবে। দেখা দেবে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি। দেশে স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক দুটি দলকে সহিষ্ণুতার তাগিদ দেওয়া থেকে বিরত হননি কখনো। উসকানি বা অসিষ্ণুতার লেশমাত্র কখনো দেখা যায়নি তার স্বভাবে। গণতন্ত্রের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধাবোধের কারণে একটি দলের সঙ্গে সম্পৃক্তার পরও এমন সব মতামত ও বিশ্লেষণ তিনি প্রকাশ করেছেন, যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। 

কয়েক বছর ধরে দেশে টানা অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তার বক্তব্য ছিল- দেশের রাজনীতিকে সুস্থ করতে হলে, অনৈক্য থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে দুই বড় দলকে কাছাকাছি আসতে হবে। গত নির্বাচনের আগে তার কিছু থিওরি বেশ আলোচিত হয়েছিল। এক রাজনৈতিক মূল্যায়নে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরকে নির্মূল করতে চাইলেও তারা কেউ তা পারবে না। আগামী ২৫-৩০ বছরের মধ্যে এই দল দুটিই সম্ভাবনাময় অবস্থানে থাকবে। 

বামপন্থী, রাজাকার বা স্বৈরাচারের পরিচয় যাদের আছে, তারা কেউ তাদের বিকল্প হবে না। বিএনপির আন্দোলনের নামে উত্তেজনার বিপক্ষে ছিলেন এমাজউদ্দীন। এক লেখায় বলেছিলেন, পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগ বিএনপিকে সময় দিয়েছিল। এখন আওয়ামী লীগকে সময় দিলে ক্ষতি কী? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে বলে স্বাধীন মত দিয়েছিলেন তিনি, যা বিএনপি-জামায়াতের অনেককে আহত করেছে। তার এসব উদার মত ও পরামর্শ বুঝতে অনেকেরই প্রচুর সময় লেগেছে। তবে, তার চলে যাওয়ার অপূরণীয় ক্ষতি বুঝতে হয় তো বেশিদিন লাগবে না। 

মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার, প্রকাশক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আরটিভি নিউজ এবং আরটিভি-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

এসজে

RTVPLUS
bangal
corona
দেশ আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৯০২০৬ ৩০৫৫৯৯ ৫৬৮১
বিশ্ব ৪,০৩,৮২,৮৬২ ৩,০১,৬৯,০৫২ ১১,১৯,৭৪৮
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • মুক্তমত এর সর্বশেষ
  • মুক্তমত এর পাঠক প্রিয়