• ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

কেন 'ধর্ষকদের' হত্যা করছে হারকিউলিস?

আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট
|  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৫:১৪ | আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:১৭
গ্রীক পূরাণের বীর ‘হারকিউলিস’ তার ইতিবাচক-নেতিবাচক বীরত্বের গল্পের কারণে বিখ্যাত। গেলো কয়েকদিন ধরে তিনি হঠাৎই বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায়। ‘হারকিউলিস’ ছদ্মনামে তিনি ধর্ষণ মামলার আসামিদের হত্যা করে চলেছেন। কিন্তু কে এই হারকিউলিস? কেন ধর্ষণ মামলার আসামিদের হত্যা করে চলেছেন তিনি।

whirpool
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ পর্যন্ত এমন তিনটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহের গলায় ঝুলানো থাকছে চিরকুট। চিরকুটের দাবিমতে, খুন হওয়া ব্যক্তিরা ধর্ষক। প্রথম দ্বিতীয় মরদেহের সঙ্গে কোনো দায় স্বীকার না করলেও তৃতীয় মরদেহের সঙ্গে একটি চিরকুটে নিজেকে হারকিউলিস বলে দাবি করে হত্যাকারী।

ঘটনার শুরু গেলো ১৭ জানুয়ারি। রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভার থেকে একজন নারী গার্মেন্টস শ্রমিককে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন রিপনের (৩৯) গলায় চিরকুট ঝোলানো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ৭ জানুয়ারি রিপন ও অপর তিন সহকর্মীর বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়েরের পর আশুলিয়ার বেরুন এলাকায় নিজ বাড়িতে ১৮ বছর বয়সী ওই নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। এরপর ওই নারীর বাবা তার মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রিপন ও অপর তিনজনকে অভিযুক্ত করে আশুলিয়া থানায় অপর একটি মামলা করেন।

এরপর ১৮ জানুয়ারি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা থেকে রাকিব (২০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায়ও ঝোলানো ছিলো চিরকুট। তিনিও সন্দেহভাজন ধর্ষণকারী। নিহত রাকিব একজন মাদ্রাসা ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় ভান্ডারিয়া থানায় দায়েরকৃত মামলার আসামি ছিলেন। রাকিব একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। রাজাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাকিবের মরদেহ পাওয়া গেছে। সম্ভবত কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে গুলি করা হয়েছিলো।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তবে হারকিউলিসের ব্যাপারে তিনি অন্ধকারে আছেন বলে জানান ওসি জাহিদুল। এরপরের ঘটনা ঘটে ২৪ জানুয়ারি। ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলায় গলায় চিরকুট ঝোলানো সজলের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্তান হত্যার ঘটনায় গত ২৬ জানুয়ারি সজলের বাবা শাহ আলম জমাদ্দার কাঠালিয়া থানায় একটি মামলা করেন বলে জানান ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এনামুল হক। 

তিনি বলেন, মামলায় ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর বাবাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের বরাতে ওসি বলেন, গত ২২ জানুয়ারি ঢাকা থেকে সজলকে অপহরণ করা হয়। পরে তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়।’ এ মামলাটিও তদন্তের আওতাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।

আইনজীবী পুলক আশরাফ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, একটি অপরাধ চাপা দিতে গিয়ে অন্য একটি অপরাধ ঘটছে। আইনত কাউকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। দুজনেই সমান অপরাধী। দুজনেই একই শাস্তির অপরাধ করেছেন। ধর্ষণ জঘন্যতম অপরাধ। তবে তা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। কোনো মানুষ বা গোষ্ঠী অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি দিতে পারে না। এতে আইনের শাসন থাকছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, এভাবে চিরকুট রেখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। এ ধরণের ঘটনা কোনো ঘটছে তা আমাদের খুব সাবধানে বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত।

মনোবিজ্ঞানী আশীক মোহাম্মদ বলেন, ধর্ষণ দেশে নতুন নয়। গণমাধ্যমের কারণে এ বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে মাত্র। এটা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই বহিঃপ্রকাশ। আর দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যাওয়া আর বিপরীতে যথাযথ বিচার না হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই কেউ আইন হাতে তুলে নিয়ে থাকতে পারে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ধর্ষককে ভয় দেখাতে হলে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কোনো লাভ হবে না।  ধর্ষকের শাস্তি আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রেখেই নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলছেন, মূলত অনেকে অজ্ঞতার কারণে আর বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনেকেই আদালত বা পুলিশের দোড়গোড়ায়া পৌঁছাচ্ছেন না। ফলে এসব অপরাধ ঘটছেই। অনেক নারী জানে না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। আর অনেকে দেখছেন অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে কিন্তু বিচার তো হচ্ছে না। বাইরে মিটমাট হয়ে যাচ্ছে। 

বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক দেশে কিন্তু দ্রুত বিচার আইনে সাজা হয় এবং মানুষ তা দেখে সচেতন হয়। তবে সেটা না হলে ভবিষ্যৎ জীবনে এ ধরনের ঘটনায় প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে ধর্ষণের শিকার নারী বা তার স্বজন অপরাধে জড়ানোর শংকা থাকে।

এসজে/ এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়