• ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৪

বাড়ছে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা

রাফিয়া চৌধুরী
|  ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:১৯ | আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৩১
শহরে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট আর গ্রামে কাঠ পোড়ানোর বিকল্প হিসেবে দিন দিন বাড়ছে জ্বালানি তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি)  ব্যবহার। কিন্তু এখন প্রায়ই এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি।

অসতর্কভাবে চুলা জ্বালানোর জন্য বাড়ছে এসব দুর্ঘটনা। এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।

সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করার অনুমোদন রয়েছে ৬০টি কোম্পানির।  এর মধ্যে ১৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না ।  বসুন্ধরা, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি নিজেরাই সিলিন্ডার তৈরি করে। শুধু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি। আর দেশে তৈরি হয়েছে ১১ লাখ ৪ হাজার ৩৩৫ সিলিন্ডার। গত পাঁচ বছরে বোতলজাত করণ হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ সিলিন্ডার। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সিলিন্ডার অনুমোদন ও ব্যবহার বিধি প্রচার করে বিষ্ফোরক পরিদপ্তর।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে চুলা থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৩৮টি, আর গ্যাস লিকেজের জন্য ঘটেছে ৬৫০টি দুর্ঘটনা।

অবৈধভাবে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা বা ক্রস ফিলিং এর কারণে এলপিজি সিলিন্ডারে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে। অভিযান চালিয়ে এর জন্য দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনলেও এখনও অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে, ব্যবহারকারীর অসচেতনতা ও সিলিন্ডারের ত্রুটির কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রতি ১০ বছরে মাত্র একবার সরকারি পরীক্ষায় আসে একেকটি সিলিন্ডার।

সিরিজ কানেকশনের মাধ্যমে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস ভরার নাম ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিং। আইনত দন্ডনীয় হলেও, দেশের বিভিন্ন জায়গায়, ৩৩ বা ৪৫ কেজি ওজনের সিলিন্ডার থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা হচ্ছে নিয়মিত। এক কোম্পানির গ্যাস যায় অন্য কোম্পানির সিলিন্ডারে।

এ বিষয়ে ওমেরা সিলিন্ডার লিমিটেডের সিইও শামসুল হক আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিং এর অবৈধ কারখানা থাকার কথা আমরা জেনেছি। ছোট ছোট কিছু কোম্পানি এসব ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিং করে থাকে। এখন দেশে সিলিন্ডারের কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তার বেশিরভাগই অবৈধভাবে সিলিন্ডার ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিং করার কারণেই হচ্ছে। 

২০১৭-১৮ অর্থবছরে, এলপিজি সংক্রান্ত ৫টি দুর্ঘটনার তদন্ত করেছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। এসব দুর্ঘটনার দুটি ঘটেছে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার কারণে। ঝুঁকিপুর্ণ ক্রস ফিলিং সবচেয়ে বেশি হয় চট্টগ্রাম বিভাগে। বৈধ স্থাপনাতেও অবৈধ কাজের অভিযোগ আছে।বিস্ফোরক পরিদপ্তর কখনো কখনো এসব অবৈধ কাজে হানা দেয়।

তবে একমাত্র ক্রস ফিলিং এর কারণেই যে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে, তা নয়। সঠিক মাপের ভাল্ব ব্যবহার না করা, রেগুলেটরের সংযোগস্থলে ছিদ্র, অসতর্কতায় চুলার চাবি খুলে রাখাসহ বিভিন্ন কারণেও সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

বাংলাদেশ বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক সামসুল আলম বলেন, সরকার ৫৫টি কোম্পানিকে ডিক্যান্টিং বা ক্রস ফিলিং এর অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু ১৬টির বেশি কোম্পানি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, লোকাল মার্কেটে যেসব চুলা তৈরি করা হয়, সেগুলো তেমন মানসম্মত নয়। কিছুদিন ব্যবহার করার ফলে এসব চুলা থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। এর ফলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

বেঙ্গল এলপিজি লিমিটেডের হেড অব অপারেশন প্রকৌশলী হোসনি মোবারক জানান, সিলিন্ডারে মূলত ২০ মি.মি. এবং ২২ মি.মি. এই দুই ধরনের ভাল্ব ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারকারীরাও অনেক সময় ২০ মি.মি. রেগুলেটরের জায়গায় ২২ মি.মি. এর রেগুলেটর ব্যবহার করে থাকে। এর ফলেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

তিনি বলেন, আমাদের এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করার সকল যন্ত্রপাতি রয়েছে। এছাড়াও ভাল্ব পাইপ লিকেজ এগুলো প্রতিটা সিলিন্ডারে গ্যাস দেওয়ার আগে পরীক্ষা করা হয়।

দেশে ব্যবহার করা এলপিজি সিলিন্ডারগুলোর সর্বোচ্চ পুরত্ব ২.৫ মিলিমিটার। একবার একটি সিলিন্ডার পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হলে দশ বছর আর পরীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা নেই। এই সময় আরও কমিয়ে আনা দরকার বলে মনে করে বিষ্ফোরক পরিদপ্তর।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক  ম. তামিম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস যেগুলো লাইনের গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। সেই গ্যাসটা হালকা সহজে বাতাসের সাথে মিশে যায়। ফলে পাইপ লাইনের গ্যাস যদি লিক হয় তাহলে রান্নাঘরের দরজা জানলা খুলে দিলে গ্যাস চলে যায়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে না। কিন্তু সিলিন্ডারে যে গ্যাসটা থাকে সেটা বাতাসের থেকে ভারি । এটা নিচে পড়ে থাকে। ঘরের দরজা জানলা খুলে দিলেও সহজে বাইরে যায় না। প্রচুর বাতাস দিতে হয় এবং সময় দিতে হয়। তবে যদি সিলিন্ডারের বিষ্ফোরণ ঘটে তাহলে সেটা প্রস্তুতকারক কোম্পানির দোষ। এর দায়ভার নিয়ন্ত্রক কোম্পানিকেই নিতে হবে । 

এছাড়াও তিনি বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস যে পাইপের মাধ্যমে যায়, সেটা প্লাষ্টিকের পাইপ। চুলার চারপাশে গ্যাসের পাইপ লাইন জড়িয়ে রাখা হয়। চুলা থেকে পাইপের দুরত্ব রাখতে হবে। সেটা যদি না হয় তাহলে চুলার তাপে পাইপ গলে। গ্যাস লিক হতে পারে। এইভাবে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক সামসুল আলম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমরা এলপিজি সিলিন্ডার প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে বার বার সর্তক করছি। সচেতনতামুলক ক্যাম্পেইন করছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। বেশির ভাগ ব্যবহারকারী সচেতন নন। রাজধানীর মহানগরের রেস্তোরাঁগুলোতে এলপিজি সিল্ডারগুলো যেন চারপাশ থেকে চুলাকে চেপে ধরেছে। চুলার তাপে কোনোভাবে সিলিন্ডারের ভালব রেগুলেটর গরম হয়ে গেল ঘটতে পারে ভয়ানক দুর্ঘটনা।

তবে এলপিজি বোতলজাত ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করা দরকার।

ওমেরা সিলিন্ডার লিমিটেডের সিইও শামসুল হক আহমেদ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো ঠিকমত কাজ করছে কিনা এটা নজরদারির দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের।  

আরসি/এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়