Mir cement
logo
  • ঢাকা বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

বরাবরই নিজের মর্জিতে চলি : অর্ষা

নাজিয়া হক অর্ষা

প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে অভিনয়ের সঙ্গে নাজিয়া হক অর্ষার নিত্য আসা-যাওয়া। একটি রিয়েলেটি শো’র মাধ্যমে রঙিলা ভুবনে তার মুখটি সামনে আসে। ধীরে ধীরে সেই মুখ পরিচিতি পায়। তবে নিয়মিত অভিনয় করেছেন, এটা বলা তার ক্ষেত্রে একটু মুশকিল। কারণ, তিনি তার মনের বাইরে পথ চলতে তেমন একটা পছন্দ করেন না। পছন্দ ছাড়া চলেনই না তিনি। প্রশ্ন যতই কঠিন হোক, তার সোজাসাপ্টা উত্তর। রং-তুলির আঁচড়ে যেভাবে ভাবনার ডালপালা সাজানো থাকে, তা কিন্তু শিল্পের কাছে বরাবরই অগোছালো। কিন্তু সেটা একমাত্র শিল্পীই ভালো জানেন যে, এটা গোছালো। ঠিক তেমনই কখন শিল্পকে বিকিয়ে দিয়ে তিনি তার অভিনয় জগতে কোনো ছাড় দেননি বরং কাজ কম করেছেন। যে চরিত্রে তিনি রূপ ধারণ করেন, সেটি শুধু তার বেলায় প্রযোজ্য কি না, তা কিন্তু ঠিকই যাচাই করে নেন।

এমন একটা সত্য মেনেই সময়ের ওপর বরাবরই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। সেই গল্পে আছে কিছু আঘাত ঘাত-প্রতিঘাত। প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে বর্তমান সময়ে ধারণ করেছেন নিজেকে, যেখানে অভিনয় ছাড়া আর কোনো কিছুরই প্রাধান্য নেই। অনলাইনের এই সময়টাতে দর্শক যার অভিনয়ের প্রশংসা করে রীতিমতো গলা ফাটিয়ে দিচ্ছেন, এই চিৎকার অভিনেত্রী অর্ষার কান অব্দি পৌঁছেছে। অভিনয়ের সেই গর্জন, সমসাময়িক কাজ ও ব্যক্তিজীবনের নানান অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন আরটিভি নিউজের সঙ্গে। আলাপ করেছেন কুদরত উল্লাহ

আরটিভি : সাম্প্রতিক সময়ের ব্যস্ততা নিয়ে জানতে চাই?

অর্ষা : আসলে এখন ব্যস্ততা নেই। বিশ্রামে আছি। কিছুদিন আগে জি-ফাইভের একটা কাজ শেষ করলাম। তাই লম্বা একটা শিডিউল ছিল। ওটা শেষ করে পুরো টিম বলতে গেলে এখন সবাই আমরা বিশ্রামই নিচ্ছি।

আরটিভি : জি ফাইভের নতুন কোনো কাজ?

অর্ষা : হুম, যদিও এখন বলে দেওয়ার অনুমতি নেই। কারণ, প্রডাকশনের নিয়মের মধ্যে পড়ছে না। তবুও আপনাকে বলছি, সম্প্রতি জি ফাইভের নতুন একটি ওয়েব ফ্লিম আমি শেষ করলাম। এটার নাম হচ্ছে ‘কুহেলিকা’। পরিচালনা করেছেন সামিউর রহমান। আশা করি কিছুদিনের মধ্যেই এই ফ্লিমের পোস্টার এবং ট্রেলার সবাই দেখতে পাবেন। কথা আপতত এতটুকুই থাক। আর ডিটেল বলার অনুমতি নেই। প্লিজ, আর জানতে চাইবেন না (মুচকি হাসি)।

আরটিভি : ওয়েব ফ্লিম কিংবা সিরিজে আপনি বেশ নিয়মিত এখন। এ বিষয়ে একটু বলবেন কি?

অর্ষা : হ্যাঁ, এটা সত্যি কথা, গত দুই বছর ধরে টেলিভিশন প্রোডাকশনে কাজ করা কমিয়ে দিয়েছি। এখন একটু ওয়েবেই কাজ বেশি করা হচ্ছে।

আরটিভি : কারণটা কী?

অর্ষা : কারণটা তো আপনি কম-বেশি জানেন। একদমই খোলাশা করে বলার মতো তেমন কিছু নেই। ভালো গল্প, যে চরিত্রে অভিনয় করব সেটা নিয়ে ভাবতে পারছি। প্রতিটি প্রোডাকশনের আগে তিন-চার মাস প্রিপারেশনের একটা টাইম থাকে। টিমের সঙ্গে গল্প, স্ক্রিপ্ট নিয়ে গ্রুমিং করা, লুক টেস্ট। অনেক ডিটেল প্রি-প্রোডাকশনের একটা ব্যাপার আছে ওয়েবে। যেটা হচ্ছে আমাকে রেডি হতে অনেক হেল্প করে।

আরটিভি : হেল্পটা কেমন করে?

অর্ষা : প্রথম কথা হচ্ছে বাজেট ভালো থাকে। এটা কিন্তু একটা ফ্যাক্ট। তাই পুরোপুরি প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য খুব ভালো হয় একটা গোছানো কাজের জন্য। আর এ জন্যই সবাই ওয়েবে কাজ করতে খুব আগ্রহ পাচ্ছে, সেটা অভিনয়শিল্পী বলেন আর মেকআপ আর্টিস্টসহ সবারই কাজের অনেক অপশন আছে। পুরো টিমেরই গল্পের সঙ্গে যোগাযোগটা ঘটে। কোন তাড়াহুড়া নেই, সময় করে ধরে ধরে কাজটা করতে হয়। একটা লট নিয়ে আইসোলেটেট হয়ে শুটিং শেষ করে আবার ফিরে আসা। তাই এটা আসলে পুরোটাই একটা প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, যেটা এতদিন বন্ধ ছিল, এই প্রসেসটা আবার ঘুরে আসছে ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই ওয়েবে কাজ করে একটা তৃপ্তি পাওয়া যায়।

আরটিভি : ওয়েবে শুটিং অভিজ্ঞতা কেমন আপনার?

অর্ষা : একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে অবশ্যই বলতে হচ্ছে ভালো। কারণ হিসেবে বললে বলতে হয়, নাটকগুলোতে যেটা দেখে এসেছি, নির্মাতা কল করেন। শুটিং শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ থেকে দেড় সপ্তাহ আগে স্ক্রিপ্টটা পাঠালেন। ফোনে ফোনে কথা হলো, সেটে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, দুদিনের কাজ, তারপর শুটিং শেষ করে চলে আসলাম। এই একটা প্রোডাকশন করে তার সঙ্গে কিংবা গল্পের সঙ্গে তেমন একটা সক্ষতা তৈরি হয় না। মোটামুটি একটা টেস্ট বুঝে কাজ শেষ করে ফেলার মতো। কিন্তু ওয়েবে এটা হওয়ার সুযোগ নেই। একটা প্রোডাকশন শুরু হওয়ার আগে টিমের সঙ্গে তিন থেকে চারবার মিটিং করতে হচ্ছে। গল্পটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে হচ্ছে। নিমার্তা আমার চরিত্রটা পর্দায় কীভাবে দেখতে চাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। অনেক সময় চরিত্রটা ভালো করার জন্য রেফারেন্স নিয়ে কথা হচ্ছে। শুটিংয়ের আগেই টিমের সঙ্গে বেশ সক্ষতা তৈরি হয়ে যায়। যার জন্য খুব আরামেই নির্মাতাসহ গল্প, চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া যায়। এর জন্য শুটিং করতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ লাগে।

আরটিভি : তাহলে বোঝাতে চাচ্ছেন, ওয়েব আর টেলি প্রোডাকশনের মধ্যে পার্থক্য এটাই?

অর্ষা : পার্থক্যের জায়গায় না গিয়ে আসলে আমি আমার কথাটাই বলি। যেহেতু আমি দুই মাধ্যমেই কাজ করেছি। আর এখন স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জায়গাটা ওয়েবে তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বলা যায়, যে চরিত্রে অভিনয় করব সেটা নিয়ে যদি বহুবার শুটিংয়ে যাওয়ার আগেই আলোচনা হয় নির্মাতার সঙ্গে তাহলে সেটা আরামের হয়। এটা আমার জন্য ভালো একটা দিক। টিম নতুন হোক কিংবা পুরনো, একটা নতুন কাজ নিয়ে সবাই মিলে বোঝাপড়ার বিষয়টাই তো হচ্ছে টিমওয়ার্ক। এই টিম ওয়ার্কের ব্যাপারটা নিয়ে একটু পড়াশোনা করার সময় পাওয়া যায়। যার জন্য বলতেই হচ্ছে টেলিভিশনের থেকে ওয়েব অন্তত আমার জন্য অনেক ভালো। এখানে সব শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা কাজ করছে। তারা বর্তমান সময়ের সঙ্গে তালমিলিয়ে একটা গল্পকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ওটিটি প্লাটফর্মের সঙ্গে মার্চ করার চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতাটা কিন্তু সুন্দর। ভালো কাজ করার তাগিদে সব জায়গা থেকে নিখুঁত কাজটাকে খুঁজে বের করে এনে একসঙ্গে রেখে আনার যে প্রচেষ্টা এটা খুব চমৎকার ওয়েবে। এটা আমার জন্য খুব ইন্টারের্স্টিং, নতুন এবং দিনশেষে মনে হয় এটাই ভালো আমার জন্য।

আরটিভি : ব্যক্তি জীবনে অভিনেত্রী অর্ষা কেমন?

অর্ষা : বরাবরই ভালো। কারণ, আমি আসলে কাজের প্রেসারে কখনও থাকি না। যখন রেগুলার টেলিভিশনে কাজ করেছি তখনও আমি অনেক গ্যাপ দিয়ে কাজ করেছি। এখন ওটিটিতে কাজ করছি একই ভঙ্গিমায় হয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে একমাস ধরে একটা কাজ করা তারপর একটা ভালো বিরতি নেওয়া। এরপর আবার পরবর্তী একটা নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া। তাই এটা খুব আরামদায়ক। আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকটা শিল্পীর জন্য একই। এতে ব্যক্তিগত অনেক সময় পাওয়া যায় এবং সুন্দর কাটে। এ ক্ষেত্রে বলা চলে আমার এখন খুব একটা সময় যাচ্ছে, কারণ মাত্রই একটা প্রোডাকশন শেষ করে এখন রিলাক্সে আছি। এ কারণে এই সময়টাতে একটু নিজের মতো করে থাকা, পরিবারকে সময় দেওয়া। নতুন কোনো প্রোডাকশন থাকলে সেটা কেমন হতে পারে, এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। সো ইট ইজ এ ভ্যারি গুড টাইমিং।

আরটিভি : এমন জীবনের খোঁজেই ছিলেন এতদিন?

অর্ষা : খোঁজেই ছিলাম কি না, তা ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে আমি এমনই। খুব বেশি কিছু খোঁজাখুঁজির মধ্যে নেই। কোনো ব্যস্ততা নেই আমার মধ্যে। দিনশেষে নিজেকে সময় দেই কিংবা দিতে পারি। আসলে আমাদের সমাজ এমনটা নিয়মের মধ্যে রেখেছে যে সবাই খুব চাপে থাকে। তাই আমি একটু ধারার বিপরীতেই থাকা মানুষ। আমি নিয়ম-নীতির কোনো চাপের মধ্যে নেই। আমি সময়ের গতি দ্বারাও দখলকৃত মানুষ নই। আমি বরাবরই নিজের মর্জির মালিক। সেই জায়গা থেকে আমার হাতে অনেক ভালো সময় আছে। যার জন্য নিজেকে ভালো সময় দিই। নিজেকে নতুন নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করি। নতুন নতুন প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে নিজেকে নিয়ে যাই। ভালো না লাগলে আমি জোর করে কিছু করি না। যার জন্য আমার কাছে অফুরন্ত সময় থাকে। আবার যখন দেখি সামনে নতুন কোনো ব্যস্ততা কিংবা পদক্ষেপ আসছে ঠিক তখনই দ্রুত মাইন্ড সেট করে ফেলতে পারি। সেই গতিতেই সামনে এগিয়ে যাই।

আরটিভি : ধরুন, আপনি আপনাকে দেখতে পাচ্ছেন। এখন নিজেকে দেখে কীভাবে নিজেই ব্যাখ্যা করবেন?

অর্ষা : (কিছুক্ষণ ভেবে) নিজেকে নিজে দেখাই তো খুব কঠিন একটি বিষয়। আর যদি ব্যাখা করতে বলেন তাহলে তো আরও বেশি জটিল হয়ে গেল বিষয়টা। মানুষ তো মানুষকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ সারাটা জীবনই তো নিজেকে খুঁজতে হয়, বুঝতে হয়। নিজেকে নিয়ে স্টাডি করা। তাই এটা আসলে বলে শেষ করার মতো কোনো বিষয় নয়। জীবনের শেষ পর্যন্ত আসলে নিজেকে বুঝে ওঠা যায় না। কারণ, ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত বেড়ে উঠতে উঠতে তো আমার টেস্ট চেঞ্জ হয়েছে অনেক। মানুষের স্বভাব চেঞ্জ হয়, অভ্যস্থতা চেঞ্জ হয়। ভালো লাগা মন্দ লাগা চেঞ্জ হয়। তাই আপনি এখন ধরুন, নিজেকে আসলে কোন মানদণ্ডেই দাঁড় করাতে পারবেন না আপনি। তবে আমি এতটুকুই বলতে পারি নিজের সম্পর্কে যে, আমি পাঙচুয়াল, লয়েল, এবং খুব অনেস্ট থাকার চেষ্টা করি সবসময়। সেটা আমার ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে প্রফেশনাল জীবন পর্যন্ত থাকে। এই তিনটা সাধারণ জিনিশই মূলত আমি মেনে চলার চেষ্টা করি।

আরটিভি : ইদানীং দেখা যাচ্ছে একটু এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এর একটা কারণ শুটিংয়ের সেটা জানি কিন্তু নিজে থেকেই ঘুরতে বেশি পছন্দ করেন?

অর্ষা : রিসেন্টলি দুটো প্রডাকশনের কাজ করেছি। যেগুলোর শুটিং ছিল ঢাকার বাইরে। একটা ছিল রাঙামাটি কাপ্তাইতে, আরেকটা ছিল সিলেটে। তার আগের মাসে গিয়েছিলাম বান্দরবানে। এভাবে ভেঙে ভেঙে প্রায় তিন মাসের বেশি আউটডোরেই বেশি শুটিং করেছি। এটা খুব ভালো এক্সপেরিয়ান্স আমার। এখন সামনে আসলে ঘুরতে নাকি শুটিং করতে যাওয়া হবে কি না, তা আমি জানি না। তবে যেহেতু শীত এসেছে। এই সময়টাতে সবসময়ই ব্যক্তিগত জায়গা থেকেই ঘুরতে যাওয়া হয়। তো এইবার আমি একটা পরিকল্পনা করেছি। ঘুরতে এই শীতে উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া হতে পারে। এখন দেখা যাক, এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারি। ঘুরতে আসলেই পছন্দ করি (হাসি)।

আরটিভি : শুটিং শেষে তো বাসায় ফিরতেই হয়। বাসায় নিজের অভিনীত কাজ কিংবা অন্যেরটা দেখার সময় পান?

অর্ষা : হ্যাঁ, এইকাজটা তো করে থাকি। নিজের কাজ দেখার পাশাপাশি, অন্যের কাজও দেখি বেশি। তবে গত চার পাঁচ বছর ধরে টেলিভিশনের সামনে বসা হয় না, মানে দেখাই হয় না। তবে আগে থেকেই ওয়েব প্লাটফর্মের সিনেমা, ওয়েব সিরিজ নিয়মিত দেখতাম। এখন তো আমাদের দেশীয় ভালো কাজ ওটিটিতেই হচ্ছে। তাই বিদেশি কাজের পাশাপাশি দেশীয় প্রচুর কাজ দেখা হচ্ছে। নিজের শুটিংয় শেষে যখন ফ্রি থাকি, যে কাজগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়, সেগুলো ডাউনলোড দিয়ে রাখি। যখনই সময় পাচ্ছি, দেখছি। নয়তো বই পড়ছি, ঘুরতে যাচ্ছি। এই অভ্যেসটা অনেক পুরনো।

কেইউ/টিআই

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS