logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

‘বরকতউল্লাহর ‘কোথাও কেউ নেই’ মাইলফলক হয়ে থাকবে’

  কাজল রিপন

|  ০৪ আগস্ট ২০২০, ১১:১৮ | আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২০, ১৩:২৯
Bijori Barkatullah,
ছবি লেখকের ফেসবুক থেকে।
বরেণ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বিটিভির সাবেক জিএম, স্বনামধন্য প্রযোজক, পরিচালক ও নৃত্যশিল্পী বরকতউল্লাহর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করি।

ছোটবেলার কথা। বিটিভির অনুষ্ঠান দেখে মুগ্ধ হয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে অপেক্ষা করতাম টাইটেলের শেষ নামটা দেখার জন্য। সেই নামটাই হলো প্রযোজকের, যিনি সেই চমৎকার অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। সেই থোকা থোকা নামগুলোকে ভালোবাসতে বাসতে বড় হয়েছি। মনের অজান্তেই সেই নামগুলো কখন যে টিভির পর্দা থেকে মনের পর্দায় সোনার অক্ষরে লেখা হয়ে গেছে, জানি না। তাদের একজন, অসম্ভব প্রিয় - প্রযোজক বরকতউল্লাহ। সদালাপী সজ্জন মেধাবী পরিচালক।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বরকতউল্লাহর অভিষেক ঘটে ষাটের দশকে, নৃত্যশিল্পী হিসেবে। ১৯৬৭ সালে ডি আইটি ভবনে ঢাকা টিভিতে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন তিনি। কাজ শুরু করেন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বিচিত্রা’ দিয়ে। উপস্থাপনায় ছিলেন খ্যাতিমান উপস্থাপক ফজলে লোহানী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন বরকতউল্লাহ। কালো পতাকা হাতে ‘বাংলার রূপে টেলিভিশন সাজো’ স্লোগান সহকারে রাজপথে নেমে পড়েন। ১৯৭২ সালে বিবিসিতে টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণের প্রশিক্ষণ নিতে বিলেতে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ক ডকুমেন্টরী নির্মাণ করে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বরকতউল্লাহ ৭০ দশকে কিছু সংখ্যক তথ্য ও প্রতিবেদনমূলক অনু্ষ্ঠান, নাটক, ম্যাগাজিন, নৃত্যানুষ্ঠান ও শিশুদের অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। ৮০ দশকের শুরুতে প্রথম সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সিরিজ নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’ প্রযোজনা করে। শহুরে যৌথ পরিবার ও একক পরিবারের বিভিন্নরকম মানুষের প্রতিদিনের খুব সাধারণ গালগল্প নিয়ে সাজানো সেই নাটক, দর্শকদের মাঝে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। বলা যায় প্রথম সিরিজ নাটক, যেটা সব শ্রেণির মানুষের মনে গেঁথে আছে। পরিবারের ছোট বড় সবাই মিলে উপভোগ করতো সেই নাটক।  স্বনামধন্য প্রযোজক বরকতউল্লাহর দক্ষ পরিচালনা ও নির্দেশনায় ‘সকাল সন্ধ্যা’ এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি।

তার আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৮৭ সালে উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার ১০টা গান নিয়ে সাজানো ঈদের একক সঙ্গীতানুষ্ঠান ‘উপহার’। আজো দর্শকদের মনের মণিকোঠায় জেগে আছে সেই অনুষ্ঠানের গানগুলো। সেই অসাধারণ পরিচালনা বিটিভির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সিরিজ নাটক ‘সকাল-সন্ধ্যা’র অসামান্য সাফল্যের পর স্বনামধন্য প্রযোজক বরকতউল্লাহর দ্বিতীয় অনবদ্য সৃষ্টি, সিরিজ নাটক ‘ঢাকায় থাকি’। ১৯৮৪/৮৫ সালে প্রচারিত এ নাটক রচনা করেছিলেন নাজমুল আলম। ঢাকা শহরে বসবাসকারী নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত - তিনশ্রেণির মানুষের জীবনের নানা টানাপোড়েন অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে  সেই নাটকে। সেই সময়ের জনপ্রিয়, মেধাবী, সুন্দরী ও সু-অভিনেত্রী তারানা হালিমের বিপরীতে প্রায় নবাগত সুদর্শন অভিনেতা ডাবলু আনোয়াকে মূলনায়কের ভুমিকায় অভিনয়ের সুযোগ করে দেন বরকতউল্লাহ। আরও ছিলেন আরিফুল হক, ফাল্গুনী হামিদ, মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, ডালিয়া রহমান, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, মিনতি হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, লুনা, শাকিল প্রমুখ।

অল্পকিছু সাপ্তাহিক নাটক পরিচালনা করেছিলেন গুণী প্রযোজক বরকতউল্লাহ। বেশিরভাগই প্রশংসিত হয়েছে। যেমন, ১৯৮৫ সালে মোর্শেদ চৌধুরী রচিত, হুমায়ুন ফরীদি, লুবনা আহমেদ, আরিফুল হক ও আলেয়া ফেরদৌসী অভিনীত মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত ‘এরা ছিলো এধারে’ নাটকের কথা বহু দর্শক আজো মনে রেখেছে। মোর্শেদ চৌধুরী রচিত আরেকটা স্মরণীয় নাটক ‘সুখের ছাড়পত্রে’র পরিচালক ছিলেন বরকতউল্লাহ। আফজাল হোসেন ও লুবনা আহমেদ অভিনীত সেই নাটকের একটা সংলাপ – ‘ওহ বয়....’ মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। নাটকের গল্প, পরিচালনা ও অভিনয়ও উচ্ছসিত প্রশংসা পেয়েছিলো। মোর্শেদ চৌধুরী রচিত আরও দুটো নাটকের সুপরিচালনা করেছিলেন তিনি। ‘দূরের বাঁশী’ এবং ‘ওহে পরবাসী’ নামের সেই নাটকদুটো প্রশংসার দাবিদার। আজিজ মিসির রচিত অল্পকিছু নাটক পরিচালনা করে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন বরকতউল্লাহ। দুটো নাটকের কথা খুব মনে পড়ে। একটা ছিল তারানা হালিম, পিযুষ বন্দোপাধ্যায় ও নায়লা আজাদ নূপুর অভিনীত 'ক্যাকটাস', আরেকটা জাহিদ হাসান ও শমী কায়সার অভিনীত ‘ছবি শুধু ছবি নয়’।

১৯৮৭ সালে প্রচারিত ড. আবদুন নুর রচিত এবং বরকতউল্লাহ প্রযোজিত ‘কয়েকদিনের ছুটি’ সুধীমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। খ্যাতিমান প্রযোজক, নির্দেশক ও পরিচালক বরকতউল্লাহর অসংখ্য সৃজনশীল কাজের মধ্যে ‘কয়েকদিনের ছুটি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজ কাজী মাহমুদুর রহমান রচিত, আফজাল হোসেন ও শান্তা ইসলাম অভিনীত বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘হারজিত’। মজাদার গল্পের সেই নাটকের স্মৃতি আজও অম্লান।

স্বনামধন্য প্রযোজক বরকতউল্লাহর কালজয়ী পরিচালনা হুমায়ূন আহমেদ রচিত সিরিজ নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’। সেই যুগোত্তীর্ণ সৃজনশীল কাজ, বিটিভির ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। তিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন সিরিজ নাটক পরিচালনা করে। ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘ঢাকায় থাকি’, ‘কোথাও কেউ নাই’ – এক একটা অভিনব সৃষ্টি।  সেইসব নাটকের কথা ভোলা যাবেনা কোনোদিন। স্মৃতির জানালা খুললে পরিষ্কার ভেসে উঠে মানসপটে।

আজ (৩ আগস্ট) সেই সদালাপী সরল সহজ হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল সৃজনশীল নাটকের করিগর চিরবিদায় নিয়েছেন। তার অসাধারণ কাজগুলো জেগে আছে আমাদের মনে। আমরা শ্রদ্ধাভরে সেগুলো স্মরণ করি। আর প্রিয় বরকতউল্লাহর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনা করি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে জান্নাতবাসী করুন।

এম

 

RTVPLUS
bangal
corona
দেশ আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ৩৫৫৪৯৩ ২৬৫০৯২ ৫০৭২
বিশ্ব ৩,২১,৯৬,৬৫৫ ২,৩৭,৫১,১৩৪ ৯,৮৩,৬০৯
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • বিনোদন এর সর্বশেষ
  • বিনোদন এর পাঠক প্রিয়