Mir cement
logo
  • ঢাকা শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

কুড়িগ্রাম উত্তর প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

  ১৬ জুলাই ২০২১, ১৭:৩৬
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২১, ১৭:৪৩

আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টায় কারাগারে চার দিনমজুর!

ভুক্তভোগী পরিবার

পাঁচ অসহায় দিনমজুর পরিবারের ১৭ জন সদস্যের চোখে এখন শুধু অশ্রুর বন্যা। কাঁদছেন তাদের আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীরাও। গত ১৫ দিন ধরে খাওয়া-নাওয়া ভুলে গেছেন তারা। একদিন কাজ না করলে যাদের পেটের ভাত জোটে না তারা এখন শোকের মাতমে দিন পার করছেন। সরকারি টাকা প্রতারণার মামলায় এখন জেল হাজতে আছেন পাঁচ পরিবারের সদস্যরা।

গাজীপুর কারাগারে থাকা ৪ দিনমজুরের মধ্যে বিধবা ফুলমনি রানী (৩৭), কমল চন্দ্র রায় (৩৩), প্রভাস চন্দ্র রায় (৪৫) ও রনজিত কুমার রায় (৩৭)। বাড়ি ছাড়া হয়েছেন সুবল চন্দ্র মোহন্ত (৩২) নামের আরেক দিনমজুর। তাদের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা নদীর নিকটবর্তী বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবাঁশ শল্লীধরা গ্রামে। তারা এই গ্রামের অসহায়-দিনমজুর বাসিন্দা। সামান্য বসতভিটার জমি ছাড়া তাদের কোনো নিজস্ব সহায়-সম্বল নেই। দিনমজুরি করে প্রতিদিনের আয়ের উপর নির্ভরশীল তারা।

গত ২ জুলাই সকালে ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার পুলিশের একটি টিম অসহায় চার দিনমজুরকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। তাদের অপরাধ- প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা। এ অভিযোগে ১ জুলাই গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানায় দুই সরকারি কর্মকর্তাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন শ্রীপুর সোনালী ব্যাংকের হেডকোয়ার্টার শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক। এদের মধ্যে ৫ আসামি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা, তারা সবাই দিনমজুর। পাঁচ দিনমজুরের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

এছাড়াও মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রতারক চক্রের সদস্য শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসাবরক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন ও ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার শাহেনা আক্তারকে।

জানা যায়, শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টাররোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা তানভীর ইসলাম স্বপন (৩২) করোনায় সরকারি প্রণোদনা পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখান এসব দিনমজুরদের। ১৬ জুন ৫ দিনমজুরকে নিয়ে সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায় গিয়ে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। এরপর তাদের শ্রীপুরে নিয়ে ব্যাংকের চেক বই ও বিভিন্ন কাগজপত্রে সহি ও টিপসহি নেন। তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রণোদনার টাকা পাঠানো হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। প্রণোদনার টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় দিনমজুরেরা প্রতারক চক্রের সদস্য স্বপনের কথা বিশ্বাস করেন।

সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখার ব্যবস্থাপক শরিফুল আজম জানান, ব্যাংক হিসাব চালুর কিছুদিন পর ৫ দিনমজুরের হিসাব নম্বরে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা চলে আসে। টাকা আসে সোনালী ব্যাংক হেডকোয়ার্টার শাখা থেকে। কয়েকদিন পর অপরিচিত ৩-৪ জন লোক এসব হিসাব নম্বর থেকে টাকা তুলতে এলে তাদের সন্দেহ হয় এবং শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয়। অপরিচিত লোকগুলোকে আটক করার আগেই তারা ব্যাংক থেকে সটকে পড়েন। শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের ভুয়া অ্যাডভাইসের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের এই টাকা এসব হিসাব নম্বরে জমা করা হয়। হিসাব নম্বরধারী দিনমজুরেরা এসবের কোনোকিছুই জানতেন না বলে তিনি জানান।

প্রভাসের স্ত্রী অঞ্জলী রানী (৪২) অশ্রু ভেজা কণ্ঠে জানান, স্বামীসহ নির্দোষ দিনমজুরদের মুক্তি চান। যারা এদের ফাঁসিয়েছেন তাদের শাস্তির দাবি করেন।

রণজিতের স্ত্রী ভারতী রানী (৩০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার দিনমজুর স্বামী জেলে। দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার কেনার টাকাও নেই। কিভাবে তিনি স্বামীকে বিপদ মুক্ত করবেন? স্বামীসহ ৫ জনই নির্দোষ বলে দাবি করেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ময়েজ উদ্দিন (৭৫) ও রহিমা বেগম (৫৫) জানান, পুলিশ যাদের ধরে নিয়ে গেছে তারা সবাই গরীব-অসহায়। একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। এদের অনুদানের লোভ দেখিয়ে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে পরিবারের বাকি সদস্যরা খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করছে না। সব সময় কান্নাকাটি করছে।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তদন্ত সারওয়ার পারভেজ জানান, শ্রীপুর থানা আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে এবং আসামি আমাদের ফুলবাড়ী উপজেলার হওয়ায় চার দিনমজুরকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তদন্ত মাহফুজ ইনতিয়াজ শুক্রবার (১৬ জুলাই) দুপুরে মোবাইল ফোনে জানান, ১ জুলাই শ্রীপুর থানায় একটি প্রতারণার মামলা হয়। পরদিন ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে গাজীপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। সেই সঙ্গে মামলাটি ব্যাপকভাবে সুষ্ঠু তদন্তের কাজও চলছে।

এসআর/পি

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS