Mir cement
logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮

সংস্কারের অভাবে ধংসের প্রান্তে বালাপুর জমিদার বাড়ি

সংস্কারের অভাবে ধংসের প্রান্তে বালাপুর জমিদার বাড়ি
বালাপুর জমিদার বাড়ি

শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী নরসিংদীর বালাপুর জমিদার বাড়ি। বিট্রিশ আমলের ইট, সুরকি ও রড দিয়ে তৈরী বাড়িটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জমিদার বাড়িজুড়ে নান্দনিক, দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর কারুকাজ ঐতিহ্যের নিদর্শন ও প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী। জেলার সদর উপজেলার পাইকারচর ইউনিয়নের মেঘনা নদীর পাড়েই বালাপুর জমিদার বাড়ির অবস্থান। বালাপুর গ্রামে প্রায় ৩২০ বিঘা জায়গায় জমিদার নবীন চন্দ্র সাহা প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী এই জমিদারবাড়িটি। দেবোত্তর সম্পত্তি হওয়ায় সরকারি ভাবে তেমন কোনো সুনজর নেই ওই বাড়িটির উপর। তবে স্থানীয়রা বলছে বালাপুর জমিদার বাড়িটি সরকারি ভাবে সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে দিনে দিনে বিলীন হয়ে যাবে। ইতিহাস থেকে নাম মুছে যাবে ঐতিহ্যবাহী এই জমিদারবাড়ির। নতুন প্রজন্ম দেখতে পারবে না শেষ স্মৃতিটুকুও।

ইতিহাস ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, বালাপুর জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা এবং অঞ্চলের প্রধান জমিদার নবীনচন্দ্র সাহা। তবে কবে নাগাদ এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয় তা জানা যায়নি। প্রায় ৩২০ বিঘা জমির উপর এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। এখানে একটি একতলা ভবন, একটি দোতালা ভবন ও একটি তিনতলা ভবন তৈরি করা হয়েছিল যা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই জমিদার বাড়ির জমিদাররা ছিলেন সংস্কৃতিমনা। সন্ধ্যা নামলেই জমিদার বাড়িতে প্রতিদিন ডাক ঢোলের বাজনা বাজা শুরু হত। বিভিন্ন ধরনের নাটক, পালা গানসহ আরো অনেক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হলে তারা তাদের জমিজমা মন্দিরের নামে উইল করে দিয়ে এই দেশ ছেড়ে ভারতের কলকাতায় চলে যান।

জমিদার নবীন চন্দ্র সাহার তিন পুত্র ছিলেন। কালীমোহন সাহা, আশুতোষ সাহা ও মনোরঞ্জন সাহা। বাবা জমিদার নবীন চন্দ্র সাহা মারা যাওয়ার পর বড় পুত্র কালীমোহন সাহা জমিদার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশদের শাসনামলে ভারত উপমহাদেশে জমিদারি প্রথা চালু থাকলেও ব্রিটিশরা এই জমিদারি প্রথা দিয়ে ভারত উপমহাদেশকে আরো সহজভাবে শাসন করার জন্য একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ "চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত" নামে ১৭৯৩ সালে জায়গিরদারি প্রথা বিলুপ্ত করে জমিদারি প্রথা চালু করেন। যার ফলে এটি "জায়গিরদারি" প্রথা থেকে "জমিদারি" প্রথায় রূপ নেয়। কর্নওয়ালিশ নিজেও ব্রিটিনের একজন জমিদার পরিবারের সদস্য ছিলেন। তার এই জমিদারী প্রথা চালু করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো ভারতবর্ষ থেকে সহজে সরকারি রাজস্ব আদায় করা। এছাড়াও সহজে ভারতবর্ষের মানুষকে তাদের শাসনকার্যের আওতায় রাখা। মধ্যযুগীয় বা মুঘল শাসনামলের জমিদারি প্রথা এই জমিদারি প্রথার সাথে একদম আলাদা ছিল। তখনকার সময় ব্রিটিশদের কাছ থেকে যারা জমিদারি ক্রয় করে প্রজাদের উপর তাদের শাসনকার্য চালানোর জন্য একটি নির্ধারিত স্থানে প্রাসাদ তৈরি করে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন এবং বসবাস করতেন। ঐ জমিদারদের তৈরি করা ঐ বাড়িকেই জমিদার বাড়ি বলা হতো । জমিদাররা প্রজাদের উপর তাদের শাসনকার্য চালাতেন এই বাড়ি থেকেই।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এই বিলাসবহুল নান্দনিক কারুকার্য সমৃদ্ধ জমিদারবাড়ির ভবনটিতে ১০৩টি ছোট বড় কক্ষ ছিল। যার প্রতিটি কক্ষেই ছিল মোজাইক করা। ঘরের সব দরজা-জানালাগুলোতে ফুল লতা-পাতাসহ বিভিন্ন মনোমুগ্ধকর কারুকার্য মণ্ডিত ছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এসব কারুকার্য, অধিকাংশ দরজা জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। ভবনটির পূর্বদিকে তিনতলা যার দরজা-জানালা ধসে পড়ছে , উত্তর দিকে একতলা জরাজীর্ণ অবস্থা, দক্ষিণে দ্বিতীয় তলা এবং পশ্চিম দিকে দ্বিতীয় তলা একেই অবস্থা। পশ্চিম পাশে একটি বিশাল আকারের গেট রয়েছে।

বিশাল এই জমিদার বাড়িতে আরও আছে সান বাঁধানো পুকুরঘাট, কারুকার্য সমৃদ্ধ দুর্গাপূজার মণ্ডপ। মন্ডপের ভিতরের কারুকাজ দেখেই ধারণা করা যায় জমিদারবাড়ির অতীত ইতিহাস।

জমিদারবাড়িতে সেই সময় অতিথিদের থাকা-খাওয়া ও ঘুমানোর জন্য ছিল দূর্গা মন্দিরের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর দিকে কয়েকটি সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন ভবন। যা বর্তমানে এক একটি ইট, দরজা-জানালা একটি ইতিহাস। মন্দিরের দক্ষিণ দিকে রয়েছে একটি ছোট খাল।

এছাড়াও জমিদার নবীন চন্দ্র সাহা বাড়ির মূল গেইটের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রী শ্রী মদন মোহন জিউ ঠাকুরের মন্দির রয়েছে। বাড়িটি তত্ত্বাবধায়নে না থাকার কারণে চারদিক লতাপাতায় জরাজীর্ণ হয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কারুকার্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে ধসে পড়ছে।

৩২০ বিঘা জমির উপর একটি একতলা, একটি দুইতলা ও একটি তিনতলা ভবন রয়েছে। তিনতলা ভবনটি একশত এক (১০১) কক্ষ বিশিষ্ট ভবন। ৯২ শতক জমি জুড়ে একটি পুকুর রয়েছে। পুকুরটিতে পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি ঘাট রয়েছে। বর্তমানে সান বাঁধানো পুকুরঘাটগুলো ইট সুরকি উঠে গিয়ে অনেক স্থানে ধসে গেছে।

বাড়ির পাশেই আছে বিশাল আকারের খেলার মাঠ। এ ছাড়াও ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বালাপুর নবীন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। দৃষ্টিনন্দন বালাপুর জমিদারবাড়ি এরই মধ্যে সংস্কারের অভাবে পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

জমিদার বাড়ি ঘুরতে আসা প্রিতম রায় আরটিভি নিউজকে বলেন, ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি নরসিংদীর কাছে বালাপুর জমিদার বাড়ির কথা। তাই বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে আসলাম। ঘুরতে এসে বর্তমানে জমিদার বাড়ির অবস্থা দেখে আমরা হতাশ হলাম। এক সময় যে বাড়িটির সুন্দর একটা পরিবেশ ছিলো তা আজ ধ্বংসের মুখে। আমি মনে করি সরকারের অন্যন্য প্রকল্পের মতো বাংলাদেশের সকল জমিদার বাড়িগুলোকে সংরক্ষণ করা উচিৎ। প্রয়োজন হলে সংরক্ষণ করে টিকেটের বিনিময়ে করা হলে আগামী প্রজন্ম নিজ চোখে দেখে ইতিহাস থেকে ধারণা নিতে পারবে।

জমিদার বাড়ি ঘুরতে আসা শান্ত ঘোষ আরটিভি নিউজকে বলেন, নরসিংদী বালাপুর জমিদার বাড়ি ফেসবুক, ইউটিউব দেখে ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা নিতে আসলাম। আমি একজন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। নরসিংদীর লক্ষণ সাহার জমিদারসহ অনেক স্থানে ঘুরেছি। জমিদার বাড়ির কারুকাজ, ইট, সুরকি আর রড দিয়ে তৈরী শত শত বছর আগের বাড়িটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিহাসকে ধরে রাখতে জমিদার বাড়িটি সংস্কার করে রক্ষণাবেক্ষণের দ্বায়িত্ব রাষ্ট্রের।

কথা হয় জমিদার বাড়িতে বসবাস করা সুজন ভুইঁয়ার সাথে, তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, এক সময় পুরো জমিদার বাড়ি জুড়ে লোকজন বসবাস করতো। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পরপরই নরসিংদী জেলা প্রশাসক বাড়িটি ঝুঁকিপুর্ণ ঘোষণা করেন। তখন বসবাসরত সবাইকে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তারপর থেকে জমিদার বাড়ির আশেপাশে বর্তমানে ২৭টি হিন্দু পরিবারের বসবাস। এক সময় আমাদের দাদা-বাবারা এখন আমরা সবাই মিলে শতবছরেরও বেশি মনোমুগ্ধকর কারুকাজ করা ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী দূর্গা মন্দিরটি দেখা শোনা করে আসছি। আর্থিক সংকটের জন্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শতাধিক বছরের এই মন্দিরটি। মন্দিরের ছাদ দিয়ে জল পড়ে কারুকাজগুলো খসে পড়ছে।

গোপাল আচার্য্য আরটিভি নিউজকে বলেন, ইতিহাসের সাক্ষীকে বাঁচাতে হলে জমিদার বাড়ি ও দূর্গা মন্দিরটি অতিদ্রুত সরকারি ভাবে সংস্করণ করার দরকার। যদি সরকার হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট এর পক্ষ থেকে অনুদান দেওয়া হয় তাহলে এই মন্দিরটি সংস্কার করে রক্ষণাবেক্ষণ করা যেতো। জমিদার বাড়িটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দ্বায়িত্ব নিলে এটি হতে পারে একটি পর্যটন কেন্দ্র।

কথা হয় জমিদার বাড়িতে ৭০ বছর ধরে থাকা প্রবীন ব্যাক্তি রতন সরকারের সাথে। তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, আমার দাদা ও বাবা এই জমিদার বাড়িতে কাজ করতো। দেশ ভাগের পর জমিদার তার সকল সম্পতি মন্দিরের নামে দিয়ে যায়। এরপর থেকেই আমরা এখানে বসবাস করছি। নয়-দশ বছর আগে আমরা সবাই জমিদার বাড়ির ভিতরে বসবাস করতাম। একদিন সরকারি লোকজন এসে আমাদেরকে বাড়ির ভিতরে থেকে সরিয়ে দেন। বাড়িটি এখন ধংসের মুখে, সরকার যদি একটু সুনজর দিতো তাহলে পূর্বপুরুষের কাজ করার স্থানটি নিয়ে আগলে বাঁচতে পরতাম।

ভাই গিরিস চন্দ্র সেন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহিনুর মিয়া আরটিভি নিউজকে বলেন, জমিদার নবীন চন্দ্র সাহা প্রতিষ্ঠা করেন এই বালাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির পাশেই মেঘনা ঘাট আর এই ঘাটকে কেন্দ্র করেই নবীন চন্দ্র সাহা এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন। শত শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটির নির্মাণশৈলী দারুণ দৃষ্টিনন্দন ও চমৎকার। বর্তমানে জমিদার বাড়িটির অধিকাংশ জমি ভূমি খেকোদের দখলে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেবোত্তর সম্পত্তি নিজ নামে করে নিয়েছে। এই সমস্ত সম্পত্তি সরকার দখল মুক্ত করে জমিদার বাড়ি পূর্ণ উদ্ধার করে ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে ইতিহাস থেকে চিরতরে জমিদার বাড়ি বা জমিদার প্রথা প্রচলিত ছিল তা ইতিহাস থেকে মুছে যাবে।

নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদি মোর্শেদ আরটিভি নিউজকে বলেন , এবিষয়ে আমি আমার উদ্বর্তন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবো । কোনো কিছু করা যায় কি না দেখবো।

কীভাবে যাবেন? রাজধানীর গুলিস্তান থেকে মেঘালয় বাসে করে যেতে পারবেন নরসিংদী। ভাড়া পড়বে ৯০ টাকা। আর সায়দাবাদ থেকে সিলেটগ্রামী লোকাল বাসে করে গেলে ৪০-৫০ টাকার মধ্যেই পেঁছাতে পারবেন।

সেখান থেকে মাধবদী বাসস্ট্যান্ড নেমে রিকশায় বালাপুর জমিদার বাড়িতে সরাসরি যেতে পারবেন ৪০-৫০-টাকায়। অথবা মাধবদী বাসস্ট্যান্ড থেকে ১০-১৫ টাকা দিয়ে মাধবদী গরুরহাট সিএনজি স্টেশন যেতে হবে। সেখান থেকে বালাপুরগামী সিএনজিতে চড়ে মাত্র ২০ টাকায় পৌঁছাতে পারেন বালাপুর জমিদার বাড়িতে।

এমএন

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS