Mir cement
logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১, ১২ শ্রাবণ ১৪২৮

কম খরচে বেশি লাভ, নরসিংদীর কৃষকরা ঝুঁকছেন লটকন চাষে

কম খরচে বেশি লাভ, নরসিংদীর কৃষকরা ঝুঁকছেন লটকন চাষে
ছবি: আরটিভি

নরসিংদীতে প্রতি বছরই বাড়ছে লটকন চাষ। অল্প খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় অনেক কৃষকই ঝুঁকছেন লটকন চাষে। লটকন চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্যও পেয়েছে অনেকে। এছাড়া এই লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী হচ্ছে দেশের সীমানা পেড়িয়ে বিদেশেও। তবে, এবছর লটকনের উৎপাদন ভাল হলেও করোনা সংক্রমণের কারণে বাজারদর ছিল কিছুটা কম।

আকারে বড়, রং সুন্দর ও সুস্বাদু হওয়ায় এই নরসিংদীর লটকনের চাহিদা বেশি। জেলায় এবছর ১ হাজার ৬শত ১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লটকন চাষ হয়েছে শিবপুর উপজেলায়। সুস্বাধু লটকন ঔষধিগুণ সম্পন্ন হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এর চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এছাড়া অন্যান্য ফসলের তুলনায় কয়েকগুণ লাভ বেশি হওয়ায় লটকন চাষে ঝুঁকছে কৃষকরা। বাজারে আকার ভেদে প্রতি কেজি লটকন বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত।

নরসিংদী জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান, তাই এখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৬শত ১০ হেক্টর জমিতে লটনকনের বাগান করা হয়েছে। যা হেক্টর প্রতি ১৫ টন হারে ২৪ হাজার মেট্রিক টন লটকনের ফলন পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ। আর উৎপাদিত এ লটকন পাইকারি ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার মূল্য পাওয়া যাবে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, রোপণের তিন বছরের মধ্যে লটকন গাছে ফলন আসে। প্রতিটি গাছ ফল দেয় টানা ২০ থেকে ৩০ বছর। লটকন গাছের রোগবালাই তেমন দেখা যায় না। ফল সংগ্রহের ৬০ দিন আগে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছের গোঁড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা ও আকার বৃদ্ধি পায়। এ ফল চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিক্রির জন্য কোন টেনশন করতে হয় না। পাইকারী ব্যবসায়ীরা লটকন কাঁচা থাকা অবস্থায় চাষিদের কাছ থেকে বাগান খরিদ করে নেয়। বাগান খরিদের পদ্ধতিতে রয়েছে ভিন্নতা। প্রথমে বাগানের মালিকের কাছ থেকে একদল পাইকার দাম-দর করে বাগান ক্রয় করেন, পরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পাকা লটকন বাগান থেকে সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। প্রকারভেদে পাইকারি মণ প্রতি দাম ওঠে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে নরসিংদীর সু-স্বাদু এ লটকন ফল। কিন্তু এ বছর মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের বাইরে রপ্তানি করার সম্ভব হবে কি তা নিয়ে সংশয় রয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতাদের মাঝে।

এদিকে মৌসুমী এ ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরার মরজাল, বেলাবরের বাড়ৈচা, পলাশের রাবান ও শিবপুর উপজেলা সদরে ও যোশরে বসছে লটকনের পাইকারী বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে কিনে নিয়ে যায় লটকন। পর্যায়ক্রমে হাত বদল হয়ে লটকন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে। অনেকে সরাসরি বাগান থেকে লটকন কিনে সরবরাহ করছেন।

শিবপুরের চৈতন্যা গ্রামের শামিম মিয়া বলেন, লটকন গাছ সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়। বর্ষার শেষের দিকে অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাসেও গাছ লাগানো যায়। লটকনের গাছ লাল মাটিতে ঝোপের মতো হয়ে থাকে। প্রতিবছর মাঘ-ফাল্গুনে লটকন গাছে মুকুল আসা শুরু হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে এ ফল পরিপক্বতা পায়। এটি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। স্ত্রী গাছ লাগিয়ে দিলেই হয়। সময়ে সময়ে একটু পরিচর্যা করতে হয়। গোঁড়ার চারদিকে জৈব সার দিলে ফলন ভালো হবে। পিঁপড়া বা পোকামাকড়ের হাত থেকে ফল বাঁচাতে ছত্রাকনাশক দিতে হয়।

শিবপুরের কামরাব গ্রামের মিলন মিয়া বলেন, কম খরচে লাভজনক ফসলের মধ্যে লটকন একমাত্র। লটকন বাগান শুরু করতে প্রথমে খরচ বেশি পড়লেও পরবর্তী সময়ে বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না। সে তুলনায় লাভ বেশি হয়। এছাড়া লটকন ফলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাছের কাণ্ডে ফল ধরে। কখনও কখনও এত বেশি ফল আসে যে গাছের ডাল পর্যন্ত দেখা যায় না। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামের বাগান মালিক মানিক মোল্লা জানান, লটকন ফল বিক্রির ভাবনা ভাবতে হচ্ছে না তাদের। স্থানীয় বাজার ছাড়াও লটকনের ফল ধরার পর বাগান বিক্রি করে দেওয়া যায়। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দুই একর জমিতে লটকন বাগান করেছেন। এ বছর একটি লটকন বাগান ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং আরেকটি বাগান ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।

বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবসায়ী হারিছ মিয়া বলেন, এবছর আমি ধার-দেনা করে ৭ লাখ টাকায় ৩ টি বাগান কিনেছি। শুরুর দিকে ভাল দাম পেলেও বর্তমানে এর অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফল নিয়ে ঢাকা নিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু ফেরার সময় পুলিশের কাছে অনেক হেনস্থা হতে হয়। এ অবস্থায় হিসাব করলে দেখা যাবে প্রায় তিন থেকে আড়াই লাখ টাকা লোকসান দিতে হবে আমাকে। ধারে টাকা কিভাবে শোধ করবো সেটাই এখন আমার দু:চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাগান থেকে লটকন কিনতে আসা ফরিদ হোসেন নামে অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, শুরু দিকে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা মন ধরে বিক্রি করতে পারলেও বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে তা বিক্রি করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। তাছাড়া পরিবহন খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, লটকন চাষ বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চারা উৎপাদন করাসহ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়াতে কৃষকরা লটকনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন । চলতি মৌসুমে ১৬১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিকটন ফলন হিসেবে লটকনের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার মেট্রিকটন যার পাইকারি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি টাকা।

মানুষের শরীরে একদিনে যে পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন মাত্র তিন থেকে চারটি লটকন সে চাহিদা মেটাতে পারে। ছোট এ ফলটি ভিটামিন ‘বি-টু’, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদানে ভরপুর। যা এই করোনাকালে আমাদের সবার শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

তিনি আরও বলেন, নরসিংদীতে বর্তমানে কোন হিমাগার নেই। যদি হিমাগার থাকতো তাহলে লটকনের বহুমুখী ব্যবহার করা যেত এবং লটকনের মূল্য বৃদ্ধি করা যেতো। আমি সরকারের কাছে জোরদাবি জানাচ্ছি নরসিংদীতে একটি হিমাগার অতি প্রয়োজন। এখানে একটি হিমাগার স্থাপন হলে স্থানীয় ফলের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের সবজী, লেবু সংরক্ষণ করা গেলে কৃষকরা অনেক লাভবান হবার সম্ভবনা থাকে।

এসজে

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS