Mir cement
logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮
discover

প্রতিবন্ধী হয়েও মাউন্টেন বাইকিংয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চায় তাহমিদ

তাহমিদ

প্রতিবন্ধী শব্দটি শুনলে সবার আগে আমাদের চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে একজন মানুষের শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতার চিত্র। কিন্তু অনেকেই এ সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। ফটিকছড়ির তাহমিদ আহমেদ চৌধুরী তেমনই একজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী যিনি সীমাবদ্ধতার সব সূত্রকে মিথ্যা প্রমাণ করে নিজেকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

২০১৯ সালে নেপালে সাউথ এশিয়ান গেমস ডাউনহিলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিল ফটিকছড়ি ভূজপুর থানার দাঁতমারা নিচিন্তা এলাকার আহমেদ আবু রাহাত চৌধুরী ও নুরুন্নেচ্ছা বেগম দম্পতির বড় ছেলে জন্মগতভাবে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তাহমিদ আহমেদ চৌধুরী। ভূজপুর থানার দাঁতমারা নিচিন্তা এলাকায় হলেও থাকেন নগরের পাচঁলাইশ থানার হামজারবাগে। ২০০০ সালের জন্ম নেওয়া তাহমিদ দুই ভাই চার বোনের মধ্যে সবার বড়। তাহমিদ খেলাধুলার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেছিল।

উইকিপিডিয়ায় সূত্রে জানা যায়, মাউন্টেন বাইকিং হচ্ছে একধরনের স্পোর্টস বা খেলা। এই খেলায় প্রতিযোগীদেরকে একটি পাহাড়ি বা অসমতল রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত সাধারণ সাইকেলের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের সাইকেল, যা অসমতল বা পাহাড়ি রাস্তায় চলাচল উপযোগী, এমন সাইকেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অসমতল বা উঁচু-নিঁচু রাস্তায় চলাচলের উপযোগী করে তোলা বাইসাইকেল সর্বপ্রথম ১৮৮৬ সালের আগস্টে বাফেলো সোলজারদের মন্টানার মিসৌলা থেকে ইয়োলোস্টোন অভিযানের সময় ব্যবহার করে দেখা যায়। মাউন্টেন বাইকিং বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে- ক্রস কান্ট্রি, অল-মাউন্টেন/এনডিউরা, ডাউনহিল, ফোর-ক্রস, ফ্রি রাইড, ডার্ট জাম্পিং, ট্রায়ালস, ট্রেইল রাইডিং ইত্যাদি।

মাউন্টেন বাইকিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৫’শর অধিক সাইক্লিস্ট মাউন্টেন বাইকিং সঙ্গে জড়িত আছে। তাদের অধিকাংশই তরুণ এবং উদ্যমী সাইক্লিস্ট। এসব তরুণ মাউন্টেন বাইকারদের উদ্দেশ্য হলো এই দেশে মাউন্টেন বাইকিং স্পোর্টসকে দেশে জনপ্রিয় করে তোলা। ক্রিকেট বা ফুটবলের মত একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বয়ে আনা।

জন্মগতভাবে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী জন্মের এক বছরের পর থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়েছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই চিকিৎসা থাকলেও ব্যয় বহুল ও অপারেশন করলে জীবন হুমকির মুখে পড়বে। ছোটবেলা থেকেই কথা বলতে ও শুনতে না পারা তাহমিদকে মুখোমুখি হতে হয়েছে শত প্রতিবন্ধকতার। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ব্রেইলে লেখা বই না পড়ে সাধারণ বই নিয়ে পড়ালেখা করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় মুখের ব্যাম নিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল খুলশী চাইল্ড গ্রামার কে.জি স্কুলে। সেখানে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল, হঠাৎ ২০১৮ সালে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে অংশ গ্রহণ করেছেন সাউথ এশিয়ান গেমস ডাউনহিলে। তরুণদের মাঝে এই স্পোর্টসে উৎসাহিত করতে অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

ছোটবেলা থেকেই সাইকেল চালাতেন তাহমিদ। ২০১২ সালের দিকে ফেসবুক ও ইউটিউবে মাউন্টেন বাইকিং ভিডিও দেখে সাইকেল নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সেই থেকে এমন মাউন্টেন বাইকিং নিয়ে রেকর্ড গড়ার নেশা তাহমিদের মাথায় এসে চাপে। তখন বয়স মাত্র ১২ বছর। একদিন তিনি তার নানার কাছে বায়না ধরলেন তারও একটি সাইকেল চাই। তিনি নাতিকে সাইকেল ক্রয় করে দেন। ২০১৬ সালের দিকে সাইকেলটি নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে রাইড দেওয়া শুরু করেন একটি সাইক্লিং কমিউনিটি গ্রুপের মাধ্যমে। এভাবেই সাইক্লিং জগতে প্রবেশ করেন তিনি। মায়ের মুখে নানা ধরণের সাহসের গল্প বুঝে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি। এমটিবি সাইকেল দিয়ে সাইক্লিংয়ের কসরতগুলো টিমের মেম্বারদের সঙ্গে চর্চা শুরু করেছি। ধীরে ধীরে সাইকেলের কসরতের প্রাথমিক স্কিলগুলো তার আয়ত্ত্বে চলে আসে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম উপলক্ষে টিমের সাথে তার সাইকেল দিয়ে অর্জিত কসরত প্রদর্শন করা হতো জনসম্মুখে। ২০১৮ সালে ফটিকছড়ির হাজারীখীলের একটি পাহাড়ে এমটিবি এন্ডুরো রেস আয়োজন করেছিল, সেই রেইসে ৪০ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তাহমিদ তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। এটিই তার প্রথম অর্জন। পরবর্তী কয়েকটি রেস ইভেন্টে ধারাবাহিকভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল। ২০১৯ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ডাউনহিলে অংশ গ্রহণ করেছিল। সেখানে ইনজুরির মধ্যেও অংশ গ্রহণ করে অষ্টম হয়েছিল। এমটিবি বাংলাদেশ এন্ডোরো চ্যাম্পিয়শিপ বাংলাদেশ-২০২১ প্রথম হয়েছিল তাহমিদ।

তাহমিদ আহমেদ চৌধুরী অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ভাবপ্রকাশ করে বলেন, ছোটবেলা থেকেই সাইক্লিং ভালো লাগা ও সেই থেকে সাইক্লিং করা ছিলো আমার শখ। ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের একটি সাইক্লিং রোড স্টান্ট গ্রুপ আর এস আর জেড টিমের সাথে জয়েন হয়ে আমার শখের সাইক্লিং প্রাথমিক ধাপ শুরু করেছিলাম। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে যখন দেখলাম একদল সাইক্লিস্ট পাহাড়ে ভালো সাইকেল চালায়। তখন তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পাহাড়ে সাইকেল চালানোর উৎসাহ আমার ভিতরে নতুনভাবে জন্মেছিল। তবে নেপালের পেশাদার মাউন্টেন বাইকার রাজেশ মাগার ও দেশের অন্যতম মাউন্টেন বাইকার প্রয়াত তারেকুর রহমানকে দেখে মাউন্টেইন বাইকিংয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

তিনি আরও বলেন, দেশে মাউন্টেইন বাইকিংকে একটি জনপ্রিয় স্থানে নিয়ে যেতে চাই। আমার নিজের স্বপ্ন মাউন্টেন বাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্টিত করা ও পাশাপাশি একজন ভালোমানের ফটোগ্রাফার হতে চাই। উদীয়মান রাইডারদেরকে উৎসাহ দিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশে এই মাউন্টেইন বাইকিংকে একটি পেশাদার স্পোর্টসে রূপান্তরিত করতে চাই।আমাদের প্রশিক্ষণ দরকার। সবসময় ইউটিব দেখে নিজেরাই চর্চা করে থাকি। সরকারী ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে মাউন্টেন বাইকিং অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।চট্টগ্রামে আমাদের "রকস্লেয়ারস" নামে একটি স্থানীয় মাউন্টেইন বাইক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছি ২০১৯ সাল হতে। গ্রুপটির আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও পরিচালক এবং গাইড হিসেবে সাপোর্টে রয়েছেন হাবিব।১৫ জন উদ্যমী মাউন্টেইন বাইক রাইডার নিয়ে এই আমাদের এনডিউরা মাউন্টেইন বাইকিং টিমটি পরিচালিত হয়।

তাহমিদের মা নুরুন্নেচ্ছা বেগম বলেন, সমাজে প্রতিবন্ধী সম্পর্কে নেতিবাচক মানসিকতা বদলাতে হবে। মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশেরও সুযোগ দিলে প্রতিবন্ধীরা ভাল ফলাফল করে। তাদের জন্য জলন্ত উদাহরণ তাহমিদ। সে সবকিছু আমার চেয়ে আরও ভালভাবে করতে পারে। মোবাইল ও ল্যাপ্টবের সব কাজগুলো ভালভাবে বুঝতে পারে। আমাদের তাহমিদকে ছোটবেলা থেকে সাধারণ স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে সে প্রতি ক্লাসে এক,দুই ও তিনের মধ্যে রেজাল্ট করত। স্কুলের খেলাধুয়া সবসময় ভাল করত। ছেলে মাউন্টেন বাইকিং নিয়ে ক্যারিয়ার করতে চাই, তাকে সে সুযোগ দিয়েছি। সে দেশের হয়ে সাফ গ্যামসে অংশ গ্রহণ করেছিল। আশা করি ভবিষ্যৎকালে সে ভাল করবে। মাউন্টেন বাইকিংকে সরকারী ও বেসরকারী ভাবে এগিয়ে আসলে খেলা দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

তাহমিদের সবসময়ের সহযোদ্ধা মাউন্টেন বাইকার আহসান হাবীব বলেন, তাহমিদ একজন বাক-প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সে সদা একজন হাস্যজ্বল এবং যে কোনো বিষয়ে খুবই মনোযোগী একজন ছেলে। আমার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল সাইক্লিং এ আসার পর থেকেই, তখন আমি মাউন্টেইন বাইকিং করতাম শখের বসে, তাহমিদ তখন সদ্য মাউন্টেইন বাইকিং এ যুক্ত হয়েছিল, এর পূর্ববর্তী সময়কালে তাহমিদ তার সাইকেল দিয়ে অসাধারণ কিছু কসরত দেখাতো আমাদের, আমি সত্যিই তখন অবাক হয়েছিলাম। যখন দেখলাম সে একজন বাক-প্রতিবন্ধী তখন আমি আরো কৌতূহল হয়েছিলাম তার চলাফেরা , কথা বলার ভঙ্গিতে মনোভাব প্রকাশ করা এবং তার সাইকেলের কসরতগুলো দেখে। যখনই তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল তখন থেকেই তার হাস্যজ্বল চেহেরা, তার ভাব-ভঙ্গি, মনোভাব প্রকাশ এবং সাইক্লিং এর প্রতি তার দৃঢ় ভালো লাগা এসব দেখে তার প্রতি যেকোনো কাজেই অনুপ্রেরণা বা সাপোর্ট দেওয়ার মন মানসিকতা একদম শুরু থেকেই তৈরি হয়েছিল। আজও অবধি তাকে যে কোনো কাজেই অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। তাকে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন সে যেন একজন দেশ সেরা পেশাদার মাউন্টেইন বাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সেই সাথে দেশে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে আমাদের বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে। আমরা সবসময় তার রাইডিং স্কিলগুলো দেখে অনুপ্রাণিত হই এবং দারুণ উপভোগ করি।

তার অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে একজন সাধারণ মানুষের মতই চলাফেরা করতে পছন্দ করে। আমরা যে কোনো পরিস্থিতিতে তার সাথে সবসময় স্বাভাবিক থাকি। সে মাঝেমাঝে আমাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মজা করে স্বাভাবিকভাবেই, আমরাও মজা করি তার সাথে এবং দারুণ কিছু সময় আমরা একসাথে সবাই মিলে উপভোগ করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় তাকে আমার একজন নিকটস্থ একজন ছোটভাই হিসেবে আমি তাকে যে কোনো কাজে সাপোর্ট এবং আমার পক্ষ থেকে যতটুকু পারি সহায়তা করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই সে তার প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মতই চলাফেরা করুক নিজেকে সবময় স্বাভাবিক মনে করুক এবং সেরা একজন মাউন্টেইন বাইকার হিসেবে সবার কাছে অনুপ্রেরণার বিষয় হিসেবে থাকুক।

এফএ

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS