logo
  • ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬

সিলেট-আখাউড়া রেলপথে স্লিপারে স্লিপারে মৃত্যুফাঁদ

চৌধুরী ভাস্কর হোম, মৌলভীবাজার
|  ০১ জুলাই ২০১৯, ১৯:৩১ | আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৯, ২০:০৭
রেল পথে স্লিপারে মৃত্যুফাঁদ
সিলেট-আখাউড়া রেল পথে স্লিপারে স্লিপারে মৃত্যুফাঁদ
মৌলভীবাজারের বড়মচালে ট্রেন দুর্ঘটনার ৯ দিন পার হলেও এখনো বের হয়নি দুর্ঘটনার প্রকৃত রহস্য। এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন হলেও শেষ হয়েছে তাদের তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার মেয়াদ।

ত্রুটিপূর্ণ এ লাইন ব্যবহার করেই বছরের পর বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন সিলেট বিভাগের চারটি জেলার প্রায় কয়েক লাখ মানুষ। সামান্য ঝড়বৃষ্টি হলেই রেল লাইন থেকে মাটি সড়ে গিয়ে মরণফাঁদে পরিণত হয় এ লাইনটি। 

বিভিন্ন সময় ধারাবাহিক দুর্ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি নিয়ে কোনও মাথা ব্যথাই নেই রেল কর্তৃপক্ষের। তবে সিলেটের রেল ডুয়েল গেজ হচ্ছে আর তখন সবই পরিবর্তন হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন রেল মন্ত্রী! 

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় গত ২৩ জুন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আন্তনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন চারজন। আহত হন শতাধিক যাত্রী। এ ঘটনার পরের দিন পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ দুই তদন্ত কমিটিকে ঘটনার দিন থেকে (২৩ জুন) তিন কার্যদিবসের মধ্যে (২৬ জুন) তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু নয় দিনেও তদন্ত কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানা যায়নি। 

রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই একদিনের মধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া যাবে। রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তবে রেল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আতাউল হক ভূঁইয়া বলছেন, বগি ও রেল এই দুটির যেকোনো একটির কমিউনিকেশনে বাঁধাগ্রস্ত হয়ে এটি হয়েছে। 

১৭৬ কিলোমিটারের ঢাকা-সিলেট রেলপথটি সেই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। সম্প্রতি ঢাকা থেকে ভৈরব পর্যন্ত ডাবল লাইন স্থাপন করা হলেও ভৈরব থেকে সিলেট পর্যন্ত লাইনটি রয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। শত বছরের পুরনো এ লাইনটি মাঝে-মধ্যে নাম মাত্র সংস্কার করা হলেও অধিকাংশ স্থানের অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। নড়বড়ে প্রতিটি সেতুতে ট্রেন উঠলেই কাঁপতে শুরু করে সব বগি! প্রায়ই পাহাড়ি ঢলে রেল লাইনের নিচ থেকে মাটি সড়ে আবার কখনো ব্রিজ ভেঙে ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা। তবে সব চেয়ে বেশি ঘটে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুতের ঘটনা। 

ট্রেন লাইনচ্যুত কিংবা বিভিন্ন ত্রুটির কারণে দিনব্যাপী সারাদেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়া যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

অন্যদিকে গত তিন বছরে অন্তত ২০/২৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা-সিলেট রেল পথে। কদিন পর পর এই রুটে স্লিপার লাইনচ্যুত হলেও দুর্ঘটনা কবলিত এসব স্থানগুলোতে কোনোরকম জোরা-তালি দিয়ে সংস্কার করে ফের চালু করে দেয়া হচ্ছে ট্রেন যোগাযোগ। 

স্থানীয়রা জানান, ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন ৬টি আন্তনগর ও ২টি লোকাল ট্রেন অন্তত ১৫/১৬ বার যাতায়াত করে। দুর্বল রেল লাইন ও বগির কারণে এসব যাত্রীরা প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হন। 

মানুষের এই ঝুঁকির কথা চিন্তা করে রেল মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, দ্রুতই এ লাইনের সংস্কার করা হবে এবং রেল সড়কটি যথা সম্ভব ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) আতাউল হক ভূঁইয়া জানান, সিলেট আখাউড়া রেলওয়ে সেকশনের রেলে কোথাও ঝুঁকি নেই। যখন সমস্যা দেখা দেয় তখন দ্রুত মেরামত করা হয়।

দুর্ঘটনার তথ্য

সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে গেল ২৩ জুন রাতে। সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘উপবন এক্সপ্রেস’টি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল এলাকায় এসেই পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ছিটকে পরে আর একটি বগি ছিটকে গিয়ে খালে পরে যায়। এ ঘটনায় চারজন নিহত এবং শতাধিক যাত্রী আহত হন। 

চলতি বছরের ২ জুন সকালে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার রশিদপুরে ‘কুশিয়ারা’ ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এতে সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৬ ঘণ্টার দুর্ভোগ দিয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। 

এর আগে ৬ এপ্রিল সিলেটের মাইজগাঁওয়ে মালবাহী একটি ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। এসময় সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী ‘উপবন এক্সপ্রেস’ মোগলাবাজার স্টেশনে আটকা পড়ে। 

২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলের রেলওয়ের ১৪১ নম্বর সেতুর মাটি সরে মৌলভীবাজারের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। 

একই বছরের ২৯ মার্চ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ইটাখোলা এলাকার ৫৬ নম্বর ব্রিজে বৃষ্টির পর মাটি সরে যায়। পরদিন মেরামতের সময় একটি পিলার ধসে গেলে সারাদেশে সঙ্গে সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে চারদিন সারাদেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর স্বাভাবিক হয়। কিন্তু একদিন পর আবারও ফের বন্ধ হয়ে পড়ে যোগাযোগ। 

এর আগে একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ভাড়াউড়া এলাকায় ১৫৭ নম্বর সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে সেতুটি দেবে যায়। এতে রেল যোগাযোগ ১৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। 

২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়ায় ‘পারাবত এক্সপ্রেস’ ট্রেনের তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ইঞ্জিনে আগুন লেগে যায়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। 

এসব বড় দুর্ঘটনা ছাড়াও ঢাকা-সিলেট রেলপথে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। বৃহত্তর এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা চলাচল করলেও রেল কর্তৃপক্ষ লাইন সংস্কারের কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়