logo
  • ঢাকা সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬

অধ্যক্ষের মুক্তি আন্দোলন ও রাফির হত্যাকাণ্ডে ব্যয় করতে

সিরাজের ব্যাংক হিসাব থেকে ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করেন স্ত্রী

ফেনী প্রতিনিধি
|  ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:২১ | আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৫৮
রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলায় ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, ছবি: সংগৃহীত
নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা যখন জেলে, তখন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (হিসাব) থেকে ১৮ লাখ টাকা তোলেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার। ২৭ মার্চ রাফির মা শিরিন আক্তারের করা ওই মামলায় সিরাজ জেলে যাওয়ার পরদিন ২৮ মার্চ জনতা ব্যাংকের সোনাগাজী শাখার সিরাজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে মোটা অঙ্কের এ অর্থ উত্তোলন করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ অর্থ অধ্যক্ষ মুক্তির আন্দোলন ও রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করতে খুনিদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের সোনাগাজী শাখার ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম শনিবার দুপুরে বলেন, ‘২৮ মার্চ সিরাজের স্ত্রী তার অ্যাকাউন্ট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করেন। টাকার পরিমাণটি এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

জেলে থাকার পরও সিরাজের অ্যাকাউন্ট থেকে কিভাবে ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলো- জানতে চাইলে একইদিন রাত ৮টার দিকে টেলিফোনে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা উত্তোলনের বিষয়টি আমি শুনেছি। টাকা চেকের মাধ্যমে তুলে থাকতে পারে। শনিবার ব্যাংক বন্ধ থাকার কারণে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না, কিভাবে টাকাটা তুলেছে। এমনও হতে পারে সিরাজের স্বাক্ষর করা চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করেছে। ব্যাংক খোলা হলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত বলতে পারব।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা ওই টাকা প্রথমে অধ্যক্ষ মুক্তির আন্দোলন, পরে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার কাজে ব্যয় করা হয়। আর সিরাজের নির্দেশেই এ টাকা তোলেন তার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার। পরে এর একটি অংশ স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন, ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীমকে দেন তিনি। এ টাকা পাওয়ার পরই তিনজনের নেতৃত্বে ‘সিরাজ-উদ-দৌলা সাহেব মুক্তি পরিষদ’ গঠন করা হয়।

তারা অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। এ কমিটিকে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন। তারা দলে টেনে নেয় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকেও। তারপরও অধ্যক্ষকে তারা মুক্ত করতে পারেনি।

এতে অধ্যক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এমনকি রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার আগের দিন (৫ এপ্রিল) বিকেলে অন্যতম পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীমসহ পাঁচজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ছবিও তোলে।

ওই ছবিতে দেখা গেছে, বাঁ থেকে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন হোনা, পাঞ্জাবি পরা ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীম, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনের কথিত দেহরক্ষী আবদুল হালিম সোহেল, ছাত্রলীগ কর্মী আরিফুল ইসলাম সাকিব, মোহাম্মদ জোবায়ের ও অজ্ঞাত একজন।

এর মধ্যে শাহাদাত হোসেন শামীম রাফি হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি ও হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী, জোবায়ের আহম্মেদ মামলার পাঁচ নম্বর আসামি। তারা দু’জন এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। নূর হোসেন হোনা মামলার আসামি না হলেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলায় ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তার মুক্তির দাবিতে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় নুরুদ্দিনকে। যুগ্ম-আহ্বায়ক করা হয় শাহাদাত হোসেন শামীমকে। তারাই রাফির সমর্থকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের পরিকল্পনায় রাফিকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

এদিকে রাফি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের পর শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার বলেন, অধ্যক্ষের নির্দেশে শাহাদাত হোসেনের পরিকল্পনায় রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অধ্যক্ষের স্ত্রী ফেরদৌস আরা জনতা ব্যাংক থেকে ১৮ লাখ টাকা তুলে অধ্যক্ষের সহযোগীদের হাতে তুলে দেন। তারপরই মূলত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনের প্রত্যক্ষ মদদে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির আন্দোলন শুরু হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, আমরা চেয়েছিলাম নিপীড়ক অধ্যক্ষের বিচার করতে। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর কাউন্সিলর মাকুসদ আলম আমাদের আন্দোলন করতে বাধা দিয়েছিলেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, আমি কাউকে মদদ দেইনি। আমিও চাই যারা অপরাধী তাদের যেন বিচার হয়।

পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়